দেশের ভালোবাসা বুকে লালন করে রাজনীতি করি: একান্ত সাক্ষাৎকারে চরমোনাই পীর
jugantor
দেশের ভালোবাসা বুকে লালন করে রাজনীতি করি: একান্ত সাক্ষাৎকারে চরমোনাই পীর

  অনলাইন ডেস্ক  

২১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮:৪৫:৫৮  |  অনলাইন সংস্করণ

দেশের ভালোবাসা বুকে লালন করে রাজনীতি করি: একান্ত সাক্ষাৎকারে চরমোনাই পীর

সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১) পীর সাহেব চরমোনাই নামে অধিক পরিচিত। তিনি একজন আলেম, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় আলোচক।

বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দ্বিতীয় আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি ও বাংলাদেশ কোরআন শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি।

মুফতি রেজাউল করিম দুই মেয়াদে চরমোনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও ছিলেন। তার নেতৃত্বে জোট-মহাজোটের বাইরে স্বতন্ত্র ধারার তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে ধর্মভিত্তিক এ রাজনৈতিক দলটি।

ইসলামি রাজনীতি, হেফাজত আন্দোলনসহ দলীয় নানান বিষয় নিয়ে যুগান্তরের পক্ষ থেকে তার মুখোমুখী হয়েছিলেন- এহসান সিরাজমনযূরুল হক। গ্রন্থনা করেছেন- তানজিল আমির

যুগান্তর: সদ্যপ্রয়াত আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

সৈয়দ রেজাউল করিম: তিনি তো বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একজন আলেমে দীন এবং সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। হজরতের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি আমার জন্য সব সময় দোয়া করতেন।

যুগান্তর: হেফাজতে ইসলামে’র আন্দোলন নিয়ে আপনার মতামত কী?

সৈয়দ রেজাউল করিম: হেফাজতে ইসলাম হলো একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। আর আমরা যেহেতু রাজনৈতিক সংগঠন, তাই কিছুটা পার্থক্য তো থাকবেই। তারা অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তৎপর। এ-কারণে কোনও কোনও ইস্যুতে সব ধরনের দল তাদের ব্যানারে এসে কাজ করে।

যুগান্তর: কওমি ধারার প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তো হেফাজতে একীভূত হয়ে গেছে। এই দলগুলোর নেতারাই হেফাজতে ইসলামের নেতা। একমাত্র ইসলামী আন্দোলন এর বাইরে। কারণ কী?

সৈয়দ রেজাউল করিম: যতগুলো ইসলামী দল আছে, যারা এখন সমমনা নামে নিজেদের প্রকাশ করছে। বাস্তবতা হলো- তাদের অনেক দলই এমন আছে যারা, বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টিসহ যেসব দল চিন্তা-চেতনায় মানব রচিত আইন লালন করে, যা ইসলাম সমর্থিত নয়-রাজনৈতিকভাবে তাদের সঙ্গেও জোটবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

আর আমরা শুরু থেকেই একটা কথা বলে আসছি, একমাত্র আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) নীতি-আদর্শ নিয়েই আমরা রাজনীতি করব। মূলত পার্থক্যটা এখানেই।

যুগান্তর: কওমি ধারার যতগুলো জোট বিভিন্ন সময় থেকে আন্দোলন করে আসছে, বিশেষ করে চারদলীয় জোটের আন্দোলন, স্বীকৃতি নিয়ে শাইখুল হাদীসের (রহ.) মুক্তাঙ্গনের আন্দোলন, আর সর্বশেষ হেফাজতের আন্দোলন- এই তিন সময়েই আপনারা আলাদাভাবে আন্দোলন করেছেন, তাদের সঙ্গে নয়। কেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: সেই সময়গুলোতে আমি অতটা সক্রিয় ছিলাম না। তাই ভালো বলতে পারব না। তারপরও যতটুকু শুনেছি, প্রত্যেক দলই নিজ ব্যানারে থেকেই আন্দোলনে শরীক হয়েছিল, এটাই বাস্তবতা। আর হেফজত আন্দোলনের বিষয়ে তো বললামই।

যুগান্তর: হেফাজতের ১৩ দফা কি আপনি সমর্থন করেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: হেফাজতের ১৩ দফার মধ্যে কিছু কিছু বিষয় আমার কাছে খুবই অসম্ভব বলে মনে হয়েছে। এছাড়া সবগুলোই আমি সমর্থনযোগ্য বলে মনে করি।

যুগান্তর: অসম্ভব কোনগুলো? ধর্ম অবমাননায় সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নাকি নারী নীতিমালা কেন্দ্রীক দাবীগুলো?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, এগুলো ঠিক আছে।

যুগান্তর: গণতন্ত্রের প্রতি আপনাদের আস্থা কতটুকু?

সৈয়দ রেজাউল করিম: আসলে গণতন্ত্র একটি ব্যাপক ব্যাখ্যা সাপেক্ষ শব্দ। সাধারণ অর্থে বললে, সব মানুষের সমর্থনকে বুঝায়।

কিন্তু প্রচলিত গণতন্ত্রে সেটা পাওয়া যায় না। ইসলাম গণতন্ত্রের এ অংশটুকু কিছুটা সমর্থন করে। যেখানে গণমানুষের সমর্থন থাকবে, প্রত্যেকের বাকস্বাধীনতা থাকবে। এখনকার গণতন্ত্র তো শুধুই মুখে, বাস্তবে নেই।

যুগান্তর: আপনারাও তো প্রচলিত গণতন্ত্রে গা ভাসিয়েছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, না, আমাদের নীতি আদর্শ সম্পূর্ণ ইসলাম কেন্দ্রীক। আমরা সেটাই বাস্তবায়নের চেষ্টা করে যাচ্ছি।

যুগান্তর: কিন্তু আপনারা তো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী তাদের সব নিয়ম মেনে ভোট করছেন। এটা কি ইসলাম সমর্থন করে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: গণতন্ত্র আর নির্বাচন এক বিষয় নয়। বিশ্বে এমন অনেক অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও নির্বাচন হয়। আমাদের তো এবার বেফাকের সভাপতিও নির্বাচনের মাধ্যমে হয়েছে।

তাছাড়া আমাদের বাংলাদেশে আমরা যে কাপড় পরি, এটাও কিন্তু সুদভিত্তিক ব্যবসার মধ্য দিয়েই আসছে। আমরা আসলে পরিস্থিতির শিকার। এই পরিস্থিতি বদলানোর জন্যই তো আমাদের আন্দোলন।

যুগান্তর: তবে কি আপনারা ভাবছেন এই প্রচলিত ধারাতেই ক্ষমতায় যেতে পারবেন? এবং সবকিছু বদলাতে পারবেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: বাংলাদেশের ৯২ ভাগ মানুষ মুসলমান। প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব হলো ইসলামের পক্ষে থাকা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তো আমরা এতটুকু আশা করতেই পারি।

যুগান্তর: ইসলামী আন্দোলন তো একটা দল মাত্র। সবাই আপনাদের ভোট না-ও দিতে পারে। অন্য কোনও ইসলামী দলকেও দিতে পারে। তাহলে আপনারা কেন এককভাবে পারবেন বলে মনে করছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: আসলে অন্যান্য ইসলামী দলগুলো যখন বিএনপি-আওয়ামীলীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করে, তখন আর ইসলামের স্বকীয়তা বলতে কিছু থাকে না। আমরা মূলত সেই স্বকীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি৷

যুগান্তর: একটা সময় তো আপনারাও জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করেছেন ?

সৈয়দ রেজাউল করিম: হ্যাঁ, করেছি। তখন আমাদের আলাদা শর্ত ছিল। আমরা শর্ত অনুযায়ী কাজ করেছি। অন্যরা সেসব শর্ত মেনে আমাদের সঙ্গে কাজ করেছে।

যুগান্তর: হরতাল সম্পর্কে আপনার অবস্থান কী?

সৈয়দ রেজাউল করিম: ভাঙচুরের রাজনীতি ইসলাম সমর্থন করে না। আমরাও সবসময় এই বিষয়গুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি।

যুগান্তর: কখনও কখনও তো আপনাদেরও হরতাল করতে দেখা গেছে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: মূলত বাংলাদেশে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে হরতালের একটা প্রচলন আছে। সেই ধারাবাহিকতায় আমরাও কখনও কখনও হরতাল করেছি। তবে আমাদের হরতাল অন্যদের থেকে আলাদা, শান্তিপূর্ণ।

আমরা হয়তো বলি, সব বন্ধ থাকবে। কিন্তু ভাঙচুরের ইতিহাস আমাদের নেই, আমরা এটা পছন্দও করি না।

যুগান্তর: বিএনপি’র আমলে আপনাদের বিরুদ্ধে একবার রায় হয়েছিল, তখন আপনি জেলে ছিলেন। সে সময় আপনাদের কর্মীরা গাড়ি ভাঙচুর করেছিল, এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এমন কোন ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।

যুগান্তর: বর্তমান সময়ে সরকারের সমর্থনপুষ্ট দল ছাড়া কেউ আন্দোলন করতে পারছে না। আপনারা করছেন। অনেকেই তাই সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ আছে বলে আপনাদের দিকে আঙুল তুলছে...

সৈয়দ রেজাউল করিম: এটা সম্পূর্ণ অমূলক ও হিংসাত্মক একটি কথা। কিছু দিন আগেও তো হেফাজতে ইসলাম আন্দোলন করলো, অন্যান্য অনেক দলই করছে।

যুগান্তর: আপনাদের একটি সংগঠনের নাম মুজাহিদ কমিটি। এই কমিটির সদস্যদের মুজাহিদ বলা হয়। কিসের ভিত্তিতে তাদের মুজাহিদ বলা হচ্ছে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: মুজাহিদ কমিটি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। তাদের নির্দিষ্ট একটি নীতিমালা রয়েছে। সেটা হলো, নফস ও শয়তানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক জিহাদ করা।

যুগান্তর: ইসলামের পরিভাষায় তাদের কি মুজাহিদ বলা যাবে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: মেশকাত শরীফে উল্লেখিত একটি হাদিসে রাসূল (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘মুজাহিদ বলা হয়, যে তার নফসের বিরুদ্ধে আল্লাহর অনুসরণের মাধ্যমে জিহাদ করে।’

কাজেই যাদের কর্মসূচি হলো নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, তাদেরকে ‘মুজাহিদ’ বলতে কোন অসুবিধা নেই। তারা যেহেতু শয়তানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক জিহাদ করছে, এই দিক থেকে তাদেরকে মুজাহিদ বলা হয়।

যুগান্তর: মুজাহিদ কমিটি ছাড়াও অনেকেই তো এই কাজটি করছে, তবে কি তাদেরদেও মুজাহিদ বলা যায়?

সৈয়দ রেজাউল করিম: হ্যাঁ, বলা যেতে পারে।

যুগান্তর: বর্তমানে আপনারা বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান করছেন। পূর্বের কোনো ইসলামী দলে এমন প্রচলন খুব একটা দেখা যায় নি। এটা আপনারা কোন নীতির আলোকে করছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের কথা বলি তাহলে এটা নতুন কিছু না। আব্বাজানের (রহ.) সময় থেকেই আমরা এটা করে আসছি। যেহেতু আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক এবং দেশের ভালোবাসা বুকে লালন করে এদেশে রাজনীতি করি।

যুগান্তর: এটা কি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রতি আপনাদের সমর্থন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, এটা আমাদের স্বাধীন দেশের লাল-সবুজের পতাকার প্রতি আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ।

যুগান্তর: পহেলা মে মে-দিবস উপলক্ষে আপনারা অনেক বড় বড় প্রোগ্রাম করে থাকেন। এটা কেন করছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এটাতো শ্রমিক আন্দোলন। ওই তারিখে যেহেতু তাদের দাবি পূরণ করা হয়েছিল এবং তাদের অবস্থান মজবুত হয়েছিল, তাই তারা করে। আমরা সবসময় শ্রমিকদের পাশে থাকার চেষ্টা করি।

যুগান্তর: একটি ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চাই, ছোটবেলায় আপনি কী হতে চেয়েছিলেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: আল্লাহর খাস বান্দা এবং একজন হক্কানি আলেম হতে চেয়েছিলাম।

যুগান্তর: আপনি এখন একটিরাজনৈতিক দলের নেতা। এই আকাঙ্ক্ষা কি কখনও ছিল?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, ছিল না। পরামর্শক্রমেই এই দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে।

যুগান্তর: এটা কি এ-কারণে যে, আপনার আব্বা ওই দায়িত্বে ছিলেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, আব্বাজান জীবিত থাকা অবস্থায় এই দায়িত্ব কাউকে দিয়ে যান নি। পরবর্তীতে মজলিসে শুরার ভিত্তিতেই দায়িত্বটা আমাকে দেয়া হয়েছে।

যুগান্তর: আপনার পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে এটা কেমন হবে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: সেটা আমি জানি না, আল্লাহ ভালো জানেন। আর এসব তো মজলিশে শুরার ব্যাপার।

যুগান্তর: তাহলে চরমোনাইকেন্দ্রিক যতগুলো প্রতিষ্ঠান আছে- যেমন, চরমোনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, চরমোনাই আলীয়া মাদ্রাসা কিংবা কোরআন শিক্ষা বোর্ডে- সবগুলোতেই প্রধান দায়িত্বে আপনার ভাইয়েরা আছেন। এটা কীভাবে হলো?

সৈয়দ রেজাউল করিম: শুধু আমার ভাইয়েরাই আছে ব্যপারটা এমন না, অনেকেই আছে, কাজ করছে। আর ভাইদের যোগ্যতা থাকলে তাদের দায়িত্ব দেয়া হতেই পারে। সমস্যার কিছু দেখি না।

যুগান্তর: জামায়াতে ইসলামী’র ব্যাপারে আপনারা এত কঠোর কেন? তাদের সঙ্গে কি কখনও রাজনৈতিক ঐক্যের কোনো সম্ভাবনা আছে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: জামায়াতের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য স্পষ্ট। তাদের কার্যক্রমগুলো ইসলামী ধারা থেকে ব্যতিক্রম-ক্ষমতাকেন্দ্রিক। তাদের ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন।

যদি তারা এসব ভ্রান্ত আকিদা থেকে তওবা করে, কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ধারার পরিবর্তন ঘটায়, খাছভাবে ইসলামের জন্য কাজ করে এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অবস্থানের ব্যাপারে জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে তাদের সাথে ঐক্য হওয়া অসম্ভব কিছু না। অন্যান্য ইসলামী দলগুলোরও তখন ঐক্য হতে পারে।

যুগান্তর: আপনি ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বে আসার পর আপনার কি মনে হয়, আগের তুলনায় দলের গুণমানে পরিবর্তন হয়েছে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এটা তো আপনারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমার তো মনে হয় ভালোর দিকে যাচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ।

যুগান্তর: দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ?

সৈয়দ রেজাউল করিম: আলহামদুলিল্লাহ, ভালো৷

যুগান্তর: আপনি কি দেওবন্দে পড়াশোনা করেছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: দেওবন্দে পড়াশোনা করি নাই। তবে তার আদলে পড়েছি। যাত্রাবাড়ি মাদরাসায় পড়েছি। আমাদের মাদ্রাসার সিলেবাসও দেওবন্দের সিলেবাসের আদলে করা। সে-হিসেবে তো আমরা দেওবন্দের ধারারই।

দেওবন্দের প্রধান মুফতি হাবিবুর রহমান খায়রাবাদি সাহেব চরমোনাই মাহফিলে এসেছিলেন এবং আমাকে খেলাফতও দিয়েছেন।

যুগান্তর: কিন্তু আমরা তো চরমোনাই আলিয়া মাদ্রাসাও দেখতে পাই?

সৈয়দ রেজাউল করিম: আসলে আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে আমলের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। এজন্য আব্বাজান বলতেন, এই ছেলেদের যদি আমাদের সঙ্গে রাখা যায় তাহলে তাদের আমলি জিন্দেগী অনেক উন্নত হবে। সম্ভব হলে আমি কলেজও খুলব। মূলত এ কারণেই আলিয়া মাদরাসা রাখা।

যুগান্তর: বহু আগে একবার ‘কাবার পথে’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, মরহুম চরমোনাই পীর সাহেব বলেছেন- যে মুরিদ আমাকে ভোট দেয় না সে আমার মুরিদ না, আমি তার পীর না। এই ব্যাপারটা যদি একটু ব্যাখ্যা করতেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: হ্যাঁ, এটা আমার আব্বাজান রহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন। কারণ শরীয়ত-বিরোধী না হলে পীরের হুকুম মানা জরুরি। ছাত্র যদি কখনও শিক্ষকের অবাধ্য হয় তাহলে তো শিক্ষক ছাত্রকে আন্তরিক স্বীকৃতি না-ও দিতে পারেন। ব্যাপারটা আসলে ওরকম।

যুগান্তর: আপনাদের মাহফিলে লাফালাফি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়…

সৈয়দ রেজাউল করিম: (একটু হাসি) শুরু থেকেই এ ব্যাপারে আব্বাজান কঠোরভাবে বলে দিয়েছিলেন, কেউ যদি এই কাজগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করে তাহলে সে কবিরা গোনাহ করছে। আমরাও এ কথা বলি। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে যদি এমন কিছু প্রকাশ পায় তাহলে সেটা ভিন্ন কথা।

যুগান্তর: কিন্তু এটা শুধু আপনাদের কিংবা উজানি- অর্থাৎ, এই রকম মাহফিলগুলোতেই দেখা যায়?

সৈয়দ রেজাউল করিম: উজানির ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না।

যুগান্তর: আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসলামি আন্দোলনের মধ্যে তালেবান আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমীনের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এগুলো তো বিদেশি সংগঠন। ভালো করে পর্যালোচনা করার সুযোগ হয় নি। এখন সঠিক কিছু বলতে পারব না।

যুগান্তর: আমেরিকার নির্বাচন শেষ হলো। নতুন প্রেসিডেন্টের কারণে বড় কোনও প্রভাব পড়বে কি না?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এ ব্যাপারে তো আমরা আগেই বলেছি, আমেরিকার জনগণ যাকে সমর্থন দেবে, তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে আমাদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এটা তো রাষ্ট্রীয় ব্যাপার।

যুগান্তর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

সৈয়দ রেজাউল করিম: আপনারা অনেক কষ্ট করে এসেছেন। আপনাদেরও ধন্যবাদ।

দেশের ভালোবাসা বুকে লালন করে রাজনীতি করি: একান্ত সাক্ষাৎকারে চরমোনাই পীর

 অনলাইন ডেস্ক 
২১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৬:৪৫ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
দেশের ভালোবাসা বুকে লালন করে রাজনীতি করি: একান্ত সাক্ষাৎকারে চরমোনাই পীর
মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম।

সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১) পীর সাহেব চরমোনাই নামে অধিক পরিচিত। তিনি একজন আলেম, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় আলোচক। 

বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দ্বিতীয় আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি ও বাংলাদেশ কোরআন শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি। 

মুফতি রেজাউল করিম দুই মেয়াদে চরমোনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও ছিলেন। তার নেতৃত্বে জোট-মহাজোটের বাইরে স্বতন্ত্র ধারার তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে ধর্মভিত্তিক এ রাজনৈতিক দলটি। 

ইসলামি রাজনীতি, হেফাজত আন্দোলনসহ দলীয় নানান বিষয় নিয়ে যুগান্তরের পক্ষ থেকে তার মুখোমুখী হয়েছিলেন- এহসান সিরাজমনযূরুল হক। গ্রন্থনা করেছেন- তানজিল আমির।  

যুগান্তর: সদ্যপ্রয়াত আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

সৈয়দ রেজাউল করিম: তিনি তো বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একজন আলেমে দীন এবং সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। হজরতের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি আমার জন্য সব সময় দোয়া করতেন।
 
যুগান্তর: হেফাজতে ইসলামে’র আন্দোলন নিয়ে আপনার মতামত কী?

সৈয়দ রেজাউল করিম: হেফাজতে ইসলাম হলো একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। আর আমরা যেহেতু রাজনৈতিক সংগঠন, তাই কিছুটা পার্থক্য তো থাকবেই। তারা অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তৎপর। এ-কারণে কোনও কোনও ইস্যুতে সব ধরনের দল তাদের ব্যানারে এসে কাজ করে।
 
যুগান্তর: কওমি ধারার প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তো হেফাজতে একীভূত হয়ে গেছে। এই দলগুলোর নেতারাই হেফাজতে ইসলামের নেতা। একমাত্র ইসলামী আন্দোলন এর বাইরে। কারণ কী?

সৈয়দ রেজাউল করিম: যতগুলো ইসলামী দল আছে, যারা এখন সমমনা নামে নিজেদের প্রকাশ করছে। বাস্তবতা হলো- তাদের অনেক দলই এমন আছে যারা, বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টিসহ যেসব দল চিন্তা-চেতনায় মানব রচিত আইন লালন করে, যা ইসলাম সমর্থিত নয়-রাজনৈতিকভাবে তাদের সঙ্গেও জোটবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছে। 

আর আমরা শুরু থেকেই একটা কথা বলে আসছি, একমাত্র আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) নীতি-আদর্শ নিয়েই আমরা রাজনীতি করব। মূলত পার্থক্যটা এখানেই।
 
যুগান্তর: কওমি ধারার যতগুলো জোট বিভিন্ন সময় থেকে আন্দোলন করে আসছে, বিশেষ করে চারদলীয় জোটের আন্দোলন, স্বীকৃতি নিয়ে শাইখুল হাদীসের (রহ.) মুক্তাঙ্গনের আন্দোলন, আর সর্বশেষ হেফাজতের আন্দোলন- এই তিন সময়েই আপনারা আলাদাভাবে আন্দোলন করেছেন, তাদের সঙ্গে নয়। কেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: সেই সময়গুলোতে আমি অতটা সক্রিয় ছিলাম না। তাই ভালো বলতে পারব না। তারপরও যতটুকু শুনেছি, প্রত্যেক দলই নিজ ব্যানারে থেকেই আন্দোলনে শরীক হয়েছিল, এটাই বাস্তবতা। আর হেফজত আন্দোলনের বিষয়ে তো বললামই।
 
যুগান্তর: হেফাজতের ১৩ দফা কি আপনি সমর্থন করেন? 

সৈয়দ রেজাউল করিম: হেফাজতের ১৩ দফার মধ্যে কিছু কিছু বিষয় আমার কাছে খুবই অসম্ভব বলে মনে হয়েছে। এছাড়া সবগুলোই আমি সমর্থনযোগ্য বলে মনে করি।
 
যুগান্তর: অসম্ভব কোনগুলো? ধর্ম অবমাননায় সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নাকি নারী নীতিমালা কেন্দ্রীক দাবীগুলো?
 
সৈয়দ রেজাউল করিম: না, এগুলো ঠিক আছে।
 
যুগান্তর: গণতন্ত্রের প্রতি আপনাদের আস্থা কতটুকু?

সৈয়দ রেজাউল করিম: আসলে গণতন্ত্র একটি ব্যাপক ব্যাখ্যা সাপেক্ষ শব্দ। সাধারণ অর্থে বললে, সব মানুষের সমর্থনকে বুঝায়। 

কিন্তু প্রচলিত গণতন্ত্রে সেটা পাওয়া যায় না। ইসলাম গণতন্ত্রের এ অংশটুকু কিছুটা সমর্থন করে। যেখানে গণমানুষের সমর্থন থাকবে, প্রত্যেকের বাকস্বাধীনতা থাকবে। এখনকার গণতন্ত্র তো শুধুই মুখে, বাস্তবে নেই।
               
যুগান্তর: আপনারাও তো প্রচলিত গণতন্ত্রে গা ভাসিয়েছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, না, আমাদের নীতি আদর্শ সম্পূর্ণ ইসলাম কেন্দ্রীক। আমরা সেটাই বাস্তবায়নের চেষ্টা করে যাচ্ছি।
 
যুগান্তর: কিন্তু আপনারা তো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী তাদের সব নিয়ম মেনে ভোট করছেন। এটা কি ইসলাম সমর্থন করে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: গণতন্ত্র আর নির্বাচন এক বিষয় নয়। বিশ্বে এমন অনেক অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও নির্বাচন হয়। আমাদের তো এবার বেফাকের সভাপতিও নির্বাচনের মাধ্যমে হয়েছে।  

তাছাড়া আমাদের বাংলাদেশে আমরা যে কাপড় পরি, এটাও কিন্তু সুদভিত্তিক ব্যবসার মধ্য দিয়েই আসছে। আমরা আসলে পরিস্থিতির শিকার। এই পরিস্থিতি বদলানোর জন্যই তো আমাদের আন্দোলন।
 
যুগান্তর: তবে কি আপনারা ভাবছেন এই প্রচলিত ধারাতেই ক্ষমতায় যেতে পারবেন? এবং সবকিছু বদলাতে পারবেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: বাংলাদেশের ৯২ ভাগ মানুষ মুসলমান। প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব হলো ইসলামের পক্ষে থাকা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তো আমরা এতটুকু আশা করতেই পারি।
 
যুগান্তর: ইসলামী আন্দোলন তো একটা দল মাত্র। সবাই  আপনাদের ভোট না-ও দিতে পারে। অন্য কোনও ইসলামী দলকেও দিতে পারে। তাহলে আপনারা কেন এককভাবে পারবেন বলে মনে করছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: আসলে অন্যান্য ইসলামী দলগুলো যখন বিএনপি-আওয়ামীলীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করে, তখন আর ইসলামের স্বকীয়তা বলতে কিছু থাকে না। আমরা মূলত সেই স্বকীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি৷
 
যুগান্তর: একটা সময় তো আপনারাও জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করেছেন ?

সৈয়দ রেজাউল করিম: হ্যাঁ, করেছি। তখন আমাদের আলাদা শর্ত ছিল। আমরা শর্ত অনুযায়ী কাজ করেছি। অন্যরা সেসব শর্ত মেনে আমাদের সঙ্গে কাজ করেছে।
 
যুগান্তর: হরতাল সম্পর্কে আপনার অবস্থান কী?

সৈয়দ রেজাউল করিম: ভাঙচুরের রাজনীতি ইসলাম সমর্থন করে না। আমরাও সবসময় এই বিষয়গুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি।
 
যুগান্তর: কখনও কখনও তো আপনাদেরও হরতাল করতে দেখা গেছে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: মূলত বাংলাদেশে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে হরতালের একটা প্রচলন আছে। সেই ধারাবাহিকতায় আমরাও কখনও কখনও হরতাল করেছি। তবে আমাদের হরতাল অন্যদের থেকে আলাদা, শান্তিপূর্ণ। 

আমরা হয়তো বলি, সব বন্ধ থাকবে। কিন্তু ভাঙচুরের ইতিহাস আমাদের নেই, আমরা এটা পছন্দও করি না।
 
যুগান্তর: বিএনপি’র আমলে আপনাদের বিরুদ্ধে একবার রায় হয়েছিল, তখন আপনি জেলে ছিলেন। সে সময় আপনাদের কর্মীরা গাড়ি ভাঙচুর করেছিল, এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এমন কোন ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।
 
যুগান্তর: বর্তমান সময়ে সরকারের সমর্থনপুষ্ট দল ছাড়া কেউ আন্দোলন করতে পারছে না। আপনারা করছেন। অনেকেই তাই সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ আছে বলে আপনাদের দিকে আঙুল তুলছে...

সৈয়দ রেজাউল করিম: এটা সম্পূর্ণ অমূলক ও হিংসাত্মক একটি কথা। কিছু দিন আগেও তো হেফাজতে ইসলাম আন্দোলন করলো, অন্যান্য অনেক দলই করছে।
 
যুগান্তর: আপনাদের একটি সংগঠনের নাম মুজাহিদ কমিটি। এই কমিটির সদস্যদের মুজাহিদ বলা হয়। কিসের ভিত্তিতে তাদের মুজাহিদ বলা হচ্ছে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: মুজাহিদ কমিটি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। তাদের নির্দিষ্ট একটি নীতিমালা রয়েছে। সেটা হলো, নফস ও শয়তানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক জিহাদ করা।
 
যুগান্তর: ইসলামের পরিভাষায় তাদের কি মুজাহিদ বলা যাবে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: মেশকাত শরীফে উল্লেখিত একটি হাদিসে রাসূল (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘মুজাহিদ বলা হয়, যে তার নফসের বিরুদ্ধে আল্লাহর অনুসরণের মাধ্যমে জিহাদ করে।’ 

কাজেই যাদের কর্মসূচি হলো নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, তাদেরকে ‘মুজাহিদ’ বলতে কোন অসুবিধা নেই। তারা যেহেতু শয়তানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক জিহাদ করছে, এই দিক থেকে তাদেরকে মুজাহিদ বলা হয়। 
 
যুগান্তর: মুজাহিদ কমিটি ছাড়াও অনেকেই তো এই কাজটি করছে, তবে কি তাদেরদেও মুজাহিদ বলা যায়?

সৈয়দ রেজাউল করিম: হ্যাঁ, বলা যেতে পারে। 
 
যুগান্তর: বর্তমানে আপনারা বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান করছেন। পূর্বের কোনো ইসলামী দলে এমন  প্রচলন খুব একটা দেখা যায় নি। এটা আপনারা কোন নীতির আলোকে করছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের কথা বলি তাহলে এটা নতুন কিছু না। আব্বাজানের (রহ.) সময় থেকেই আমরা এটা করে আসছি। যেহেতু আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক এবং দেশের ভালোবাসা বুকে লালন করে এদেশে রাজনীতি করি।
 
যুগান্তর: এটা কি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রতি আপনাদের সমর্থন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, এটা আমাদের স্বাধীন দেশের লাল-সবুজের পতাকার প্রতি আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ।
 
যুগান্তর: পহেলা মে মে-দিবস উপলক্ষে আপনারা অনেক বড় বড় প্রোগ্রাম করে থাকেন। এটা কেন করছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এটাতো শ্রমিক আন্দোলন। ওই তারিখে যেহেতু তাদের দাবি পূরণ করা হয়েছিল এবং তাদের অবস্থান মজবুত হয়েছিল, তাই তারা করে। আমরা সবসময় শ্রমিকদের পাশে থাকার চেষ্টা করি।
 
যুগান্তর: একটি ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চাই, ছোটবেলায় আপনি কী হতে চেয়েছিলেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: আল্লাহর খাস বান্দা এবং একজন হক্কানি আলেম হতে চেয়েছিলাম।
 
যুগান্তর: আপনি এখন একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। এই আকাঙ্ক্ষা কি কখনও ছিল?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, ছিল না। পরামর্শক্রমেই এই দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে।
 
যুগান্তর: এটা কি এ-কারণে যে, আপনার আব্বা ওই দায়িত্বে ছিলেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: না, আব্বাজান জীবিত থাকা অবস্থায় এই দায়িত্ব কাউকে দিয়ে যান নি। পরবর্তীতে মজলিসে শুরার ভিত্তিতেই দায়িত্বটা আমাকে দেয়া হয়েছে।
 
যুগান্তর: আপনার পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে এটা কেমন হবে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: সেটা আমি জানি না, আল্লাহ ভালো জানেন। আর এসব তো মজলিশে শুরার ব্যাপার।
 
যুগান্তর: তাহলে চরমোনাইকেন্দ্রিক যতগুলো প্রতিষ্ঠান আছে- যেমন, চরমোনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, চরমোনাই আলীয়া মাদ্রাসা কিংবা কোরআন শিক্ষা বোর্ডে- সবগুলোতেই প্রধান দায়িত্বে আপনার ভাইয়েরা আছেন। এটা কীভাবে হলো?
 
সৈয়দ রেজাউল করিম: শুধু আমার ভাইয়েরাই আছে ব্যপারটা এমন না, অনেকেই আছে, কাজ করছে। আর ভাইদের যোগ্যতা থাকলে তাদের দায়িত্ব দেয়া হতেই পারে। সমস্যার কিছু দেখি না।
 
যুগান্তর: জামায়াতে ইসলামী’র ব্যাপারে আপনারা এত কঠোর কেন? তাদের সঙ্গে কি কখনও রাজনৈতিক ঐক্যের কোনো সম্ভাবনা আছে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: জামায়াতের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের বক্তব্য স্পষ্ট। তাদের কার্যক্রমগুলো ইসলামী ধারা থেকে ব্যতিক্রম-ক্ষমতাকেন্দ্রিক। তাদের ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। 

যদি তারা এসব ভ্রান্ত আকিদা থেকে তওবা করে, কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ধারার পরিবর্তন ঘটায়, খাছভাবে ইসলামের জন্য কাজ করে এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অবস্থানের ব্যাপারে জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে তাদের সাথে ঐক্য হওয়া অসম্ভব কিছু না। অন্যান্য ইসলামী দলগুলোরও তখন ঐক্য হতে পারে।
 
যুগান্তর: আপনি  ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বে আসার পর আপনার কি মনে হয়, আগের তুলনায় দলের গুণমানে পরিবর্তন হয়েছে?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এটা তো আপনারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমার তো মনে হয় ভালোর দিকে যাচ্ছে, আলহামদুলিল্লাহ।
 
যুগান্তর: দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ?
 
সৈয়দ রেজাউল করিম: আলহামদুলিল্লাহ, ভালো৷
 
যুগান্তর: আপনি কি দেওবন্দে পড়াশোনা করেছেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: দেওবন্দে পড়াশোনা করি নাই। তবে তার আদলে পড়েছি। যাত্রাবাড়ি মাদরাসায় পড়েছি। আমাদের মাদ্রাসার সিলেবাসও দেওবন্দের সিলেবাসের আদলে করা। সে-হিসেবে তো আমরা দেওবন্দের ধারারই। 

দেওবন্দের প্রধান মুফতি হাবিবুর রহমান খায়রাবাদি সাহেব চরমোনাই মাহফিলে এসেছিলেন এবং আমাকে খেলাফতও দিয়েছেন।
 
যুগান্তর: কিন্তু আমরা তো চরমোনাই আলিয়া মাদ্রাসাও দেখতে পাই?

সৈয়দ রেজাউল করিম: আসলে আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে আমলের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। এজন্য আব্বাজান বলতেন, এই ছেলেদের যদি আমাদের সঙ্গে রাখা যায় তাহলে তাদের আমলি জিন্দেগী অনেক উন্নত হবে। সম্ভব হলে আমি কলেজও খুলব। মূলত এ কারণেই আলিয়া মাদরাসা রাখা।
 
যুগান্তর: বহু আগে একবার ‘কাবার পথে’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, মরহুম চরমোনাই পীর সাহেব বলেছেন- যে মুরিদ আমাকে ভোট দেয় না সে আমার মুরিদ না, আমি তার পীর না। এই ব্যাপারটা যদি একটু ব্যাখ্যা করতেন?

সৈয়দ রেজাউল করিম: হ্যাঁ, এটা আমার আব্বাজান রহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন। কারণ শরীয়ত-বিরোধী না হলে পীরের হুকুম মানা জরুরি। ছাত্র যদি কখনও শিক্ষকের অবাধ্য হয় তাহলে তো শিক্ষক ছাত্রকে আন্তরিক স্বীকৃতি না-ও দিতে পারেন। ব্যাপারটা আসলে ওরকম।
 
যুগান্তর: আপনাদের মাহফিলে লাফালাফি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়…

সৈয়দ রেজাউল করিম: (একটু হাসি) শুরু থেকেই এ ব্যাপারে আব্বাজান কঠোরভাবে বলে দিয়েছিলেন, কেউ যদি এই কাজগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করে তাহলে সে কবিরা গোনাহ করছে। আমরাও এ কথা বলি। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে যদি এমন কিছু প্রকাশ পায় তাহলে সেটা ভিন্ন কথা।

যুগান্তর: কিন্তু এটা শুধু আপনাদের কিংবা উজানি- অর্থাৎ, এই রকম মাহফিলগুলোতেই দেখা যায়?

সৈয়দ রেজাউল করিম: উজানির ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। 
 
যুগান্তর: আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসলামি আন্দোলনের মধ্যে তালেবান আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমীনের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এগুলো তো বিদেশি সংগঠন। ভালো করে পর্যালোচনা করার সুযোগ হয় নি।  এখন সঠিক কিছু বলতে পারব না।
 
যুগান্তর: আমেরিকার নির্বাচন শেষ হলো। নতুন প্রেসিডেন্টের কারণে বড় কোনও প্রভাব পড়বে কি না?

সৈয়দ রেজাউল করিম: এ ব্যাপারে তো আমরা আগেই বলেছি, আমেরিকার জনগণ যাকে সমর্থন দেবে, তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে আমাদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এটা তো রাষ্ট্রীয় ব্যাপার।
 
যুগান্তর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

সৈয়দ রেজাউল করিম: আপনারা অনেক কষ্ট করে এসেছেন। আপনাদেরও ধন্যবাদ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন