ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষ এ অঞ্চলে ছুটে আসতো
jugantor
ড. আকরাম নদভি
ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষ এ অঞ্চলে ছুটে আসতো

  অনলাইন ডেস্ক  

১৩ নভেম্বর ২০২২, ০৪:১৫:২৩  |  অনলাইন সংস্করণ

ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষ এই অঞ্চলে

ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভি বর্তমান বিশ্বের একজন প্রখ্যাত মুসলিম স্কলার। ক্যামব্রিজ ইসলামিক কলেজের ডিন, আসসালাম ইন্সটিটিউটের প্রিন্সিপাল এবং মার্কফিল্ড ইন্সটিটিউট অব হায়ার এডুকেশনের অনারারি ভিজিটিং ফেলো।

১৯৮৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো ছিলেন। তিনি মুসলিম নারী মুহাদ্দিসদের জীবনী নিয়ে ৪৩ খণ্ডে 'আল-ওয়াফা বি আসমাইন নিসা' নামক চরিত-কোষ রচনা করেছেন। যাতে প্রায় দশ হাজার নারী মুহাদ্দিসদের জীবনী স্থান পেয়েছে। এই কাজে তিনি ১৫ বছর ব্যয় করেছেন।

বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে গত ২৯ অক্টোবর ২০২২ তিনি ঢাকা বায়তুল মোকাররম ইসলামি মিলনায়তনে পুরুষদের উদ্দেশ্যে উর্দু ভাষায় বক্তব্য রাখেন। আজ ছাপা হচ্ছে তার প্রথম কিস্তি। অনুলিখন ও অনুবাদ করেছেন- মুহিম মাহফুজ


সকল প্রশংসাআল্লাহ তাআলার জন্য। দরুদ ও সালাম মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.), তার পরিবার ও সকল সাহাবির ওপর। আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রজিম। বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা। আল্লাহর বান্দারের মধ্যে আলেমরাই তাকে ভয় করে।

সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম ও প্রিয় ছাত্রবৃন্দ, আমার জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়, বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ মহিমান্বিত বায়তুল মোকাররমের এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছি।

আজ থেকে প্রায় ৩৭ বছর আগে ১৯৮৫ সালে আমি এই মসজিদে প্রথমবার আসার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি তখন দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে শিক্ষকতার প্রথম বছরে পদার্পণ করেছি মাত্র। সে বছর তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে বাংলাদেশে এসেছিলাম এবং এই মসজিদ পরিদর্শন করেছি। তখন থেকে এই মসজিদ আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এতদিন পরে আজ আবার এখানে আসার দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।

১৯৯১ সনে আমি যখন অক্সফোর্ডে ছিলাম, সে সময় ‘ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ’ বিষয়ক একটি প্রকল্পে কাজ করেছিলাম। ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ইসলাম প্রচারে কোন কোন মাদরাসা-মারকাজ-খানকা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে, কোন কোন সুফি-দরবেশ দাওয়াত প্রচার করেছেন, চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশাবন্দিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, ফেরদাউসিয়া, সাত্তারিয়াসহ ?

কোন কোন সুফি সিলসিলা ইসলাম প্রচার করেছে- এ বিষয়ে আমি প্রায় ২৩ বছর গবেষণা করেছি। সেজন্য আমাকে আরবি উর্দু ও ফার্সি ভাষার বহু বই ও পাণ্ডুলিপি পড়তে হয়েছে। তখন ইসলাম প্রচারে বঙ্গ অঞ্চলের উজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে আমি জেনেছি।

কোন কোন বিখ্যাত আলেম বাংলাদেশে আগমন করেছেন, কোন কোন যুগশ্রেষ্ঠ সূফী-দরবেশ বঙ্গ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছেন, তাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তখন থেকে আমার স্মৃতিতে সংরক্ষিত। হযরত শাহজালাল ইয়েমেনীসহ অন্যান্য মহান মনীষীদের কথা আমি জানি।

ভারত থেকে বহু মানুষ তাদের খানকায় এসে জ্ঞান শিক্ষা করেছে। শাইখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা ঢাকার সোনারগাঁয়ে মাদরাসা স্থাপন করেছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুহাদ্দিস এবং তিনিই সহিহ বুখারী শরীফ সর্বপ্রথম উপমহাদেশে নিয়ে আসেন। আপনাদের বাংলাদেশের এই গৌরবজনক ইতিহাস আমাকে সব সময় উদ্বুদ্ধ করেছে।

ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে এখানে বহু আলেম-ওলামার পদচারণা ছিল, সুফি-দরবেশদের প্রতিষ্ঠিত খানকা ছিল। হিন্দুস্তান-পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষ এই বঙ্গ অঞ্চলে ছুটে আসতো।

কারণ বঙ্গ অঞ্চলের অতীতের শাসক বা সুলতানগণ ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। তারা ইসলাম প্রচারক আলেম-ওলামা ও সুফি-দরবেশদের সম্মান করতেন, সহযোগিতা করতেন, পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

এমনকি এ অঞ্চলের একজন সুলতান পারস্যের মহান কবি সিরাজকে বঙ্গে আগমনের আহ্বান করেছিলেন। মহাকবি সিরাজ সম্পর্কে বলা হয়, ফারসি সাহিত্যে তার চেয়ে বড় কবি আর কেউ ছিল না।

সিরাজের সমকালে বাংলা অঞ্চলে যে শাসক ছিলেন, তিনি চিঠি মারফত মহাকবি সিরাজকে বঙ্গ ভ্রমণের দাওয়াত পেশ করেন। সিরাজ বঙ্গে বা বাংলায় আসতে পারেননি বটে। কিন্তু কবিতায় বাংলার নাম উল্লেখ করে তিনি না আসার কারণ জানিয়ে বলেছিলেন, সিরাজের ফুল-ফলের বাগ-বাগিচাগুলো আমাকে বাংলায় যাবার অনুমতি দিতে চায় না। কবিতায় তিনি বাংলা বা বাঙ্গালা শব্দ ব্যবহার করেন।

এ থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, বাংলার শাসকগণ কতটা দানশীল ছিলেন, অতিথিপরায়ন ছিলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পের প্রতি কেমন আগ্রহী ছিলেন। এ অঞ্চল থেকে পারস্য বা ইরানের সিরাজ বহুদূর। তবু জ্ঞানের প্রতি অদম্য আগ্রহ সিরাজের কবিকে বাংলায় নিয়ে আসার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল এবং সমৃদ্ধ।

এ অঞ্চলে যেমন জ্ঞান ছিল, তেমনি ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ছিল। সে কারণে বুখারা-সমরকন্দ-আরব-ইয়েমেনসহ দুরদুরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসতো। লক্ষ্য করার বিষয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? কারণ এটা ছিল সে সময়ের সবচেয়ে সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা। আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি দিয়েছেন। এই ভূমিকে, বাংলাদেশের মাটিকে উর্বর বানিয়েছেন।

বাংলাদেশে এসে আমি ভীষণ আনন্দিত হয়েছি। কারণ এ দেশের আলেমসমাজ অত্যন্ত ইতিবাচক পদ্ধতিতে সমাজে কাজ করে যাচ্ছেন। জ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত আছেন। আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিবেক দিয়েছেন। আর ওলামায়ে কেরামকে বিবেক দিয়ে কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছেন।

আলেমদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা তাদের শাগরিদদের তৈরি করবেন, নিজেরা কঠোরতা পরিহার করে চলবেন এবং মানুষের চিন্তা পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। কেননা মানুষের চিন্তা কোন দিকে পরিবর্তিত হয়ে গেলে সে সহজেই সেটা গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে। তখন আলেমদের শাগরেদরাও তাদের প্রভাবিত করতে পারবে।

যার অন্তরে একবার ঈমানের আগুন জ্বলে উঠেছে, তাকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করা হলেও সে ঈমান পরিত্যাগ করবে না। এটাই দাওয়াতের সবচেয়ে বড় শক্তি। আল্লাহ তাআলা এ বৈশিষ্ট্য দিয়েই মানুষ সৃষ্টি করেছেন।

জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাজ হল, সাধারণ মানুষের যে কোন প্রশ্নের উত্তরে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কোমলতার সঙ্গে জবাব দেওয়া।

মুসলিম ইতিহাসে এমন একটি সময় এসেছিল, যখন চিন্তাগতভাবে মুসলিমরা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। হাদিস বা সুন্নাহ বিষয়ে মুসলমানদের মধ্যে শৈথিল্য এসে পড়েছিল। তখন মুহাদ্দিসগণ এক অসাধারণ কাজের সূচনা করেছেন। মানুষের মনে হাদিসের গুরুত্ব এবং বড়ত্ব প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। হাদিসের বিরাট বিরাট কিতাব সংকলন করেছেন।

বুখারী, মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহর মত হাজার হাজার হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে।

ইতিহাসের আরেক কালে মুসলমানদের মধ্যে দর্শন চর্চার উদ্দীপনা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়ে। পৃথিবী বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইবনে সিনা অনবদ্য গ্রন্থ রচনা করেন 'আশশিফা'। যা মানব ইতিহাসে এক হাজার বছর পর্যন্ত অবশ্য পাঠ্য ছিল। এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ- পৃথিবীর সর্বত্র এই গ্রন্থ পঠিত হতো।

রোম সভ্যতার ওপর দর্শন শাস্ত্রের বিশেষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি দর্শন শাস্ত্রের দুর্বলতা তুলে ধরে রচনা করেন এক অসামান্য গ্রন্থ- ‘তোফাতুল ফালাসিফা’ বা দর্শনের উপহার। এই কিতাব রচনার মধ্য দিয়ে দর্শন শাস্ত্রের যে ব্যাপক প্রচার ও চর্চা ছিল, সেটা সংকুচিত হয়ে পড়ে।

সে সময় মাদরাসাগুলোতে মানতেক বা যুক্তিশাস্ত্র পড়ানো হতো। দর্শনশাস্ত্র পড়ানো হতো। ফলে মুসলমানদের মধ্যে দর্শনের প্রভাব প্রবল হয়ে উঠেছিল। তখন সাধারণ মানুষের কথাবার্তার মধ্যেও যুক্তি ও দর্শনের প্রভাব ছিল। সে সময় ইমাম ইবনে তাইমিয়া দর্শন শাস্ত্রের মোকাবেলায় একটি কিতাব রচনা করেন- ‘আররদ্দু আলাল মানতিকিয়্যিন’ বা দার্শনিকদের যুক্তি খণ্ডন।

এই কিতাবের মাধ্যমে তিনি যুক্তিবিদ্যার ভিত্তি নড়বড়ে করে দেন। তখন থেকে যুক্তিবিদ্যার প্রভাব মুসলমানদের মধ্যে হ্রাস পেতে থাকে।

এমনকি এর প্রভাব ইউরোপেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে নতুন করে যে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনশাস্ত্রের উদ্ভব ঘটে, সেটা ইবনে তাইমিয়া ও ইমাম গাজ্জালীর প্রস্তাব মেনে নিয়ে নতুন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। যেসব বিষয়ে তারা আপত্তি তুলেছেন, সেগুলোর সংশোধন ও বর্জন করা হয়েছে। আগের যুক্তিবিদ্যা আগের অবয়বে অবশিষ্ট থাকেনি। তারা প্রাচীন দর্শনশাস্ত্রের আমূল সংস্কার সাধন করেন।

সে সময় ইসলামি জ্ঞান নিয়ে আরেকটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়, যদি আল্লাহর বাণী, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস ও অন্যদের বক্তব্যের মধ্যে বৈচিত্র দেখা দেয় সেক্ষেত্রে কী করণীয়?

এই প্রশ্নের জবাবে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র.) আরেকটি কিতাব রচনা করেন- ‘দারুত তাআরুদি বাইনাল আকলি ওয়ান নাকলি’। যুক্তি ও বর্ণনার মধ্যে বৈপরিত্য খণ্ডন।

এই কিতাবে ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, নকল বা কালামুল্লাহ স্বয়ং আল্লাহর বাণী। আর আকল বা যুক্তি-বুদ্ধি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি মাত্র। সুতরাং উভয়ের মধ্যে বৈশাদৃশ্য বা সংঘর্ষ কখনোই সম্ভব হতে পারে না। যদি কখনো এমন বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়, তাহলে মনে করতে হবে এটা দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের দুর্বলতা ও নির্জ্ঞানতার প্রকাশ।

এই দুর্বলতা বিদূরিত হলে বৈশাদৃশ্যের বিষয়টিও মীমাংসিত হবে। আল্লাহর বাণী ও আল্লাহর সৃষ্টি মাখলুকের মধ্যে কখনো বৈসাদৃশ্যমূলক বক্তব্য থাকতে পারে না। তাই আমাদের এটা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে হবে, যার জ্ঞান বা যুক্তি আল্লাহর কালাম ও বিধানের মধ্যে দুর্বলতা, বৈপরীত্য বা নেতিবাচক কিছু আবিষ্কার করে, নিশ্চয়ই তার মধ্যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বোধের ঘাটতি রয়েছে। যদি সে কোরআন উপলব্ধি করে, নিশ্চয়ই সে সকল সংশয়ের সমাধান পাবে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার যুগে যুক্তিবাদী ও দার্শনিকরা যেসব আপত্তি উত্থাপন করেছেন, তিনি তার প্রতিটি প্রশ্নের সুন্দর সমাধান দিয়েছেন। একই পথ অবলম্বন করেছেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রা.। তিনি হিন্দুস্তানে রচনা করেছেন ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ নামক অনবদ্য এক গ্রন্থ।
শাহ ওয়ালিউল্লার যুগে বিশেষত হাদিস শাস্ত্রসহ ইসলামের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রের ওপর দালিলিকভাবে বহু আপত্তি উত্থাপিত হয়েছিল। সে গ্রন্থে তিনি যুক্তির নিরিখে সেসব আপত্তি নিরসন করেছেন। হাদিস শাস্ত্রের নিষ্কলুষতা প্রমাণিত করেছেন।

আমার সামনে সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম উপবিষ্ট আছেন। আপনারা জানেন, ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব মানুষকে দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া। মানুষের মধ্যকার দূরত্ব ও ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়া। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করা। এটা অত্যন্ত গুরুত্ববাহী কাজ।

আজ সারা বিশ্বে যে নতুন প্রশ্ন ও সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার সমাধান ইলমে কালাম বা যুক্তিবিদ্যায় নিহিত নেই। মাদরাসাগুলোতে আমরা প্রাচীন ইলমে কালাম পড়িয়ে থাকি। ইলমে কালাম এমন একটি বিদ্যা যা সৃষ্টি হয়েছিল আব্বাসী শাসনামল বা তার নিকটকালে।

কিন্তু পৃথিবী বদলে গেছে। নতুন অনেক সংকট ও সংশয় দেখা দিয়েছে। এখনো যদি আমরা মাদরাসাগুলোতে 'আল কুরআন আল্লাহর মাখলুক নাকি মাখলুক নয়' এই বিতর্ক পড়াতে থাকি, সেটা আমাদের জন্য বিশেষ উপকারী হবে না।

এসব প্রশ্ন এখন মানুষ উত্থাপন করে না। এই প্রশ্ন নিয়ে এ যুগে আর কোন বিতর্ক নেই। অথচ এই প্রশ্ন এক হাজার বছর পর্যন্ত মুসলমানদের ব্যতিব্যস্ত রেখেছিল।

ড. আকরাম নদভি

ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষ এ অঞ্চলে ছুটে আসতো

 অনলাইন ডেস্ক 
১৩ নভেম্বর ২০২২, ০৪:১৫ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষ এই অঞ্চলে
প্রতীকি ছবি

ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভি বর্তমান বিশ্বের একজন প্রখ্যাত মুসলিম স্কলার। ক্যামব্রিজ ইসলামিক কলেজের ডিন, আসসালাম ইন্সটিটিউটের প্রিন্সিপাল এবং মার্কফিল্ড ইন্সটিটিউট অব হায়ার এডুকেশনের অনারারি ভিজিটিং ফেলো। 

১৯৮৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো ছিলেন। তিনি মুসলিম নারী মুহাদ্দিসদের জীবনী নিয়ে ৪৩ খণ্ডে 'আল-ওয়াফা বি আসমাইন নিসা' নামক চরিত-কোষ রচনা করেছেন। যাতে প্রায় দশ হাজার নারী মুহাদ্দিসদের জীবনী স্থান পেয়েছে। এই কাজে তিনি ১৫ বছর ব্যয় করেছেন। 

বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে গত ২৯ অক্টোবর ২০২২ তিনি ঢাকা বায়তুল মোকাররম ইসলামি মিলনায়তনে পুরুষদের উদ্দেশ্যে উর্দু ভাষায় বক্তব্য রাখেন। আজ ছাপা হচ্ছে তার প্রথম কিস্তি। অনুলিখন ও অনুবাদ করেছেন- মুহিম মাহফুজ


সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। দরুদ ও সালাম মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.), তার পরিবার ও সকল সাহাবির ওপর। আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রজিম। বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা। আল্লাহর বান্দারের মধ্যে আলেমরাই তাকে ভয় করে। 

সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম ও প্রিয় ছাত্রবৃন্দ, আমার জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়, বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ মহিমান্বিত বায়তুল মোকাররমের এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছি। 

আজ থেকে প্রায় ৩৭ বছর আগে ১৯৮৫ সালে আমি এই মসজিদে প্রথমবার আসার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি তখন দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে শিক্ষকতার প্রথম বছরে পদার্পণ করেছি মাত্র। সে বছর তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে বাংলাদেশে এসেছিলাম এবং এই মসজিদ পরিদর্শন করেছি। তখন থেকে এই মসজিদ আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এতদিন পরে আজ আবার এখানে আসার দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।

১৯৯১ সনে আমি যখন অক্সফোর্ডে ছিলাম, সে সময় ‘ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ’ বিষয়ক একটি প্রকল্পে কাজ করেছিলাম। ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ইসলাম প্রচারে কোন কোন মাদরাসা-মারকাজ-খানকা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে, কোন কোন সুফি-দরবেশ দাওয়াত প্রচার করেছেন, চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশাবন্দিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, ফেরদাউসিয়া, সাত্তারিয়াসহ ? 

কোন কোন সুফি সিলসিলা ইসলাম প্রচার করেছে- এ বিষয়ে আমি প্রায় ২৩ বছর গবেষণা করেছি। সেজন্য আমাকে আরবি উর্দু ও ফার্সি ভাষার বহু বই ও পাণ্ডুলিপি পড়তে হয়েছে। তখন ইসলাম প্রচারে বঙ্গ অঞ্চলের উজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে আমি জেনেছি। 

কোন কোন বিখ্যাত আলেম বাংলাদেশে আগমন করেছেন, কোন কোন যুগশ্রেষ্ঠ সূফী-দরবেশ বঙ্গ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছেন, তাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তখন থেকে আমার স্মৃতিতে সংরক্ষিত। হযরত শাহজালাল ইয়েমেনীসহ অন্যান্য মহান মনীষীদের কথা আমি জানি। 

ভারত থেকে বহু মানুষ তাদের খানকায় এসে জ্ঞান শিক্ষা করেছে। শাইখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা ঢাকার সোনারগাঁয়ে মাদরাসা স্থাপন করেছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুহাদ্দিস এবং তিনিই সহিহ বুখারী শরীফ সর্বপ্রথম উপমহাদেশে নিয়ে আসেন। আপনাদের বাংলাদেশের এই গৌরবজনক ইতিহাস আমাকে সব সময় উদ্বুদ্ধ করেছে।

ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে এখানে বহু আলেম-ওলামার পদচারণা ছিল, সুফি-দরবেশদের প্রতিষ্ঠিত খানকা ছিল। হিন্দুস্তান-পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষ এই বঙ্গ অঞ্চলে ছুটে আসতো। 

কারণ বঙ্গ অঞ্চলের অতীতের শাসক বা সুলতানগণ ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। তারা ইসলাম প্রচারক আলেম-ওলামা ও সুফি-দরবেশদের সম্মান করতেন, সহযোগিতা করতেন, পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। 

এমনকি এ অঞ্চলের একজন সুলতান পারস্যের মহান কবি সিরাজকে বঙ্গে আগমনের আহ্বান করেছিলেন। মহাকবি সিরাজ সম্পর্কে বলা হয়, ফারসি সাহিত্যে তার চেয়ে বড় কবি আর কেউ ছিল না। 

সিরাজের সমকালে বাংলা অঞ্চলে যে শাসক ছিলেন, তিনি চিঠি মারফত মহাকবি সিরাজকে বঙ্গ ভ্রমণের দাওয়াত পেশ করেন। সিরাজ বঙ্গে বা বাংলায় আসতে পারেননি বটে। কিন্তু কবিতায় বাংলার নাম উল্লেখ করে তিনি না আসার কারণ জানিয়ে বলেছিলেন, সিরাজের ফুল-ফলের বাগ-বাগিচাগুলো আমাকে বাংলায় যাবার অনুমতি দিতে চায় না। কবিতায় তিনি বাংলা বা বাঙ্গালা শব্দ ব্যবহার করেন। 

এ থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, বাংলার শাসকগণ কতটা দানশীল ছিলেন, অতিথিপরায়ন ছিলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পের প্রতি কেমন আগ্রহী ছিলেন। এ অঞ্চল থেকে পারস্য বা ইরানের সিরাজ বহুদূর। তবু জ্ঞানের প্রতি অদম্য আগ্রহ সিরাজের কবিকে বাংলায় নিয়ে আসার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল এবং সমৃদ্ধ। 

এ অঞ্চলে যেমন জ্ঞান ছিল, তেমনি ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ছিল। সে কারণে বুখারা-সমরকন্দ-আরব-ইয়েমেনসহ দুরদুরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসতো। লক্ষ্য করার বিষয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? কারণ এটা ছিল সে সময়ের সবচেয়ে সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা। আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি দিয়েছেন। এই ভূমিকে, বাংলাদেশের মাটিকে উর্বর বানিয়েছেন। 

বাংলাদেশে এসে আমি ভীষণ আনন্দিত হয়েছি। কারণ এ দেশের আলেমসমাজ অত্যন্ত ইতিবাচক পদ্ধতিতে সমাজে কাজ করে যাচ্ছেন। জ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত আছেন। আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিবেক দিয়েছেন। আর ওলামায়ে কেরামকে বিবেক দিয়ে কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছেন। 

আলেমদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা তাদের শাগরিদদের তৈরি করবেন, নিজেরা কঠোরতা পরিহার করে চলবেন এবং মানুষের চিন্তা পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। কেননা মানুষের চিন্তা কোন দিকে পরিবর্তিত হয়ে গেলে সে সহজেই সেটা গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে। তখন আলেমদের শাগরেদরাও তাদের প্রভাবিত করতে পারবে। 

যার অন্তরে একবার ঈমানের আগুন জ্বলে উঠেছে, তাকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করা হলেও সে ঈমান পরিত্যাগ করবে না। এটাই দাওয়াতের সবচেয়ে বড় শক্তি। আল্লাহ তাআলা এ বৈশিষ্ট্য দিয়েই মানুষ সৃষ্টি করেছেন। 

জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাজ হল, সাধারণ মানুষের যে কোন প্রশ্নের উত্তরে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কোমলতার সঙ্গে জবাব দেওয়া।

মুসলিম ইতিহাসে এমন একটি সময় এসেছিল, যখন চিন্তাগতভাবে মুসলিমরা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। হাদিস বা সুন্নাহ বিষয়ে মুসলমানদের মধ্যে শৈথিল্য এসে পড়েছিল। তখন মুহাদ্দিসগণ এক অসাধারণ কাজের সূচনা করেছেন। মানুষের মনে হাদিসের গুরুত্ব এবং বড়ত্ব প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। হাদিসের বিরাট বিরাট কিতাব সংকলন করেছেন। 

বুখারী, মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহর মত হাজার হাজার হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে। 

ইতিহাসের আরেক কালে মুসলমানদের মধ্যে দর্শন চর্চার উদ্দীপনা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়ে। পৃথিবী বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইবনে সিনা অনবদ্য গ্রন্থ রচনা করেন 'আশশিফা'। যা মানব ইতিহাসে এক হাজার বছর পর্যন্ত অবশ্য পাঠ্য ছিল। এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ- পৃথিবীর সর্বত্র এই গ্রন্থ পঠিত হতো।

রোম সভ্যতার ওপর দর্শন শাস্ত্রের বিশেষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ইমাম গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি দর্শন শাস্ত্রের দুর্বলতা তুলে ধরে রচনা করেন এক অসামান্য গ্রন্থ- ‘তোফাতুল ফালাসিফা’ বা দর্শনের উপহার। এই কিতাব রচনার মধ্য দিয়ে দর্শন শাস্ত্রের যে ব্যাপক প্রচার ও চর্চা ছিল, সেটা সংকুচিত হয়ে পড়ে। 

সে সময় মাদরাসাগুলোতে মানতেক বা যুক্তিশাস্ত্র পড়ানো হতো। দর্শনশাস্ত্র পড়ানো হতো। ফলে মুসলমানদের মধ্যে দর্শনের প্রভাব প্রবল হয়ে উঠেছিল। তখন সাধারণ মানুষের কথাবার্তার মধ্যেও যুক্তি ও দর্শনের প্রভাব ছিল। সে সময় ইমাম ইবনে তাইমিয়া দর্শন শাস্ত্রের মোকাবেলায় একটি কিতাব রচনা করেন- ‘আররদ্দু আলাল মানতিকিয়্যিন’ বা দার্শনিকদের যুক্তি খণ্ডন। 

এই কিতাবের মাধ্যমে তিনি যুক্তিবিদ্যার ভিত্তি নড়বড়ে করে দেন। তখন থেকে যুক্তিবিদ্যার প্রভাব মুসলমানদের মধ্যে হ্রাস পেতে থাকে। 

এমনকি এর প্রভাব ইউরোপেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে নতুন করে যে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনশাস্ত্রের উদ্ভব ঘটে, সেটা ইবনে তাইমিয়া ও ইমাম গাজ্জালীর প্রস্তাব মেনে নিয়ে নতুন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। যেসব বিষয়ে তারা আপত্তি তুলেছেন, সেগুলোর সংশোধন ও বর্জন করা হয়েছে। আগের যুক্তিবিদ্যা আগের অবয়বে অবশিষ্ট থাকেনি। তারা প্রাচীন দর্শনশাস্ত্রের আমূল সংস্কার সাধন করেন। 

সে সময় ইসলামি জ্ঞান নিয়ে আরেকটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়, যদি আল্লাহর বাণী, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস ও অন্যদের বক্তব্যের মধ্যে বৈচিত্র দেখা দেয় সেক্ষেত্রে কী করণীয়? 

এই প্রশ্নের জবাবে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র.) আরেকটি কিতাব রচনা করেন- ‘দারুত তাআরুদি বাইনাল আকলি ওয়ান নাকলি’। যুক্তি ও বর্ণনার মধ্যে বৈপরিত্য খণ্ডন। 

এই কিতাবে ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, নকল বা কালামুল্লাহ স্বয়ং আল্লাহর বাণী। আর আকল বা যুক্তি-বুদ্ধি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি মাত্র। সুতরাং উভয়ের মধ্যে বৈশাদৃশ্য বা সংঘর্ষ কখনোই সম্ভব হতে পারে না। যদি কখনো এমন বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়, তাহলে মনে করতে হবে এটা দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের দুর্বলতা ও নির্জ্ঞানতার প্রকাশ। 

এই দুর্বলতা বিদূরিত হলে বৈশাদৃশ্যের বিষয়টিও মীমাংসিত হবে। আল্লাহর বাণী ও আল্লাহর সৃষ্টি মাখলুকের মধ্যে কখনো বৈসাদৃশ্যমূলক বক্তব্য থাকতে পারে না। তাই আমাদের এটা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে হবে, যার জ্ঞান বা যুক্তি আল্লাহর কালাম ও বিধানের মধ্যে দুর্বলতা, বৈপরীত্য বা নেতিবাচক কিছু আবিষ্কার করে, নিশ্চয়ই তার মধ্যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বোধের ঘাটতি রয়েছে। যদি সে কোরআন উপলব্ধি করে, নিশ্চয়ই সে সকল সংশয়ের সমাধান পাবে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার যুগে  যুক্তিবাদী ও দার্শনিকরা যেসব আপত্তি উত্থাপন করেছেন, তিনি তার প্রতিটি প্রশ্নের সুন্দর সমাধান দিয়েছেন। একই পথ অবলম্বন করেছেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রা.। তিনি হিন্দুস্তানে রচনা করেছেন ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ নামক অনবদ্য এক গ্রন্থ। 
শাহ ওয়ালিউল্লার যুগে বিশেষত হাদিস শাস্ত্রসহ ইসলামের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রের ওপর দালিলিকভাবে বহু আপত্তি উত্থাপিত হয়েছিল। সে গ্রন্থে তিনি যুক্তির নিরিখে সেসব আপত্তি নিরসন করেছেন। হাদিস শাস্ত্রের নিষ্কলুষতা প্রমাণিত করেছেন। 

আমার সামনে সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম উপবিষ্ট আছেন। আপনারা জানেন, ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব মানুষকে দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া। মানুষের মধ্যকার দূরত্ব ও ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়া। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করা। এটা অত্যন্ত গুরুত্ববাহী কাজ।

আজ সারা বিশ্বে যে নতুন প্রশ্ন ও সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার সমাধান ইলমে কালাম বা যুক্তিবিদ্যায় নিহিত নেই। মাদরাসাগুলোতে আমরা প্রাচীন ইলমে কালাম পড়িয়ে থাকি। ইলমে কালাম এমন একটি বিদ্যা যা সৃষ্টি হয়েছিল আব্বাসী শাসনামল বা তার নিকটকালে। 

কিন্তু পৃথিবী বদলে গেছে। নতুন অনেক সংকট ও সংশয় দেখা দিয়েছে। এখনো যদি আমরা মাদরাসাগুলোতে 'আল কুরআন আল্লাহর মাখলুক নাকি মাখলুক নয়' এই বিতর্ক পড়াতে থাকি, সেটা আমাদের জন্য বিশেষ উপকারী হবে না। 

এসব প্রশ্ন এখন মানুষ উত্থাপন করে না। এই প্রশ্ন নিয়ে এ যুগে আর কোন বিতর্ক নেই। অথচ এই প্রশ্ন এক হাজার বছর পর্যন্ত মুসলমানদের ব্যতিব্যস্ত রেখেছিল। 
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও খবর