Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

বিধর্মীর স্পর্শে কি ওজু ভেঙে যায়?

Icon

জাহেদুল ইসলাম আল-রাইয়ান

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১২:১৭ পিএম

বিধর্মীর স্পর্শে কি ওজু ভেঙে যায়?

Advertisement

আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি ধারণা হলো—অমুসলিমদের সঙ্গে হাত মেলালে বা তাদের ছোঁয়ায় কি ওজু ভেঙে যায়? 

অনেকেই মনে করেন, বিধর্মীরা শারীরিকভাবে অপবিত্র, তাই তাদের স্পর্শে মুসলমানের ওজু নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

কুরআন ও সহিহ হাদিসে ওজু ভাঙার যেসব কারণ উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে প্রস্রাব-পায়খানা, গভীর নিদ্রা, গ্যাস নির্গমন, রক্ত বা পুঁজ বের হওয়া ইত্যাদি। কিন্তু কোথাও অমুসলিমকে স্পর্শ করা বা তাদের সঙ্গে হাত মেলানোকে ওজু ভাঙার কারণ বলা হয়নি (সহিহ বুখারি: ১৩৫, সহিহ মুসলিম: ৩৬২)।

কুরআনের সুরা তাওবার একটি আয়াতে বলা হয়েছে: “হে মুমিনগণ! মুশরিকরা তো নাপাক (নাজিস)...” (তাওবা ৯:২৮)। 

এখানে অনেকের ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিধর্মীরা শারীরিকভাবে নাপাক। অথচ ইবনে কাসির, তাবারী, কুরতুবী প্রমুখ মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন—এখানে নাপাক বলতে বিশ্বাসগত বা আকিদাগত অপবিত্রতা বোঝানো হয়েছে, শারীরিক নয়। তাই তাদের শরীর, পোশাক বা ছোঁয়া কোনোভাবেই মুসলমানকে অপবিত্র করে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে এর বাস্তব দৃষ্টান্ত অসংখ্য। তিনি ইহুদিদের সঙ্গে লেনদেন করেছেন, এমনকি মৃত্যুর সময় তার বর্মটি একটি ইহুদির কাছে বন্ধক রাখা ছিল (সহিহ বুখারি: ২৯১৬)। 

তিনি অসুস্থ এক ইহুদিকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং তাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন (সহিহ বুখারি: ১৩৫৬)। 

তিনি ইহুদি প্রতিবেশীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন (সহিহ মুসলিম: ২০৫৫)। যদি বিধর্মীদের স্পর্শে ওজু ভেঙে যেত, তবে এ সবকিছু সম্ভব হতো না।

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) জেরুজালেম বিজয়ের সময় খ্রিস্টানদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন, যেখানে তাদের উপাসনালয় ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। এটি ইসলামের সহাবস্থান ও সহনশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-ও অমুসলিমদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশ নিতেন। কোনো ফকিহ কখনো বলেননি যে তাদের ছোঁয়ায় ওজু ভেঙে যায়।

কুরআন স্পষ্টভাবে বলে: “আল্লাহ তোমাদেরকে সেই সব লোকের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে নিষেধ করেন না, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না এবং তোমাদের দেশ থেকে বের করে দেয়নি। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনা ৬০:৮)। 

অর্থাৎ ধর্মের প্রশ্নে আপস নয়, কিন্তু মানবিক সম্পর্ক ও সামাজিক সহাবস্থান বৈধ এবং প্রশংসনীয়।

সমাজে যে ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানো হয়েছে—অমুসলিমরা স্পর্শ করলে ওজু ভেঙে যায়—তা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইসলাম কখনো মানুষকে বিভক্ত করতে চায় না, বরং সত্য বিশ্বাসের সীমারেখা বজায় রেখে পারস্পরিক সহাবস্থানের পথ দেখায়। 

আজকের বিশ্বে মুসলমানরা অমুসলিমদের সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও কর্মক্ষেত্রে পাশাপাশি কাজ করছে। যদি তাদের স্পর্শেই ওজু ভেঙে যেত, তবে তা বাস্তব জীবনকে প্রায় অসম্ভব করে তুলত।

অতএব, শরীয়তের নির্ভুল বক্তব্য হলো—বিধর্মীর স্পর্শে ওজু ভাঙে না। ইসলাম মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তাই আমাদের উচিত কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবন করা এবং সহনশীল মানবিক সমাজ গড়ে তোলা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর

Advertisement

ইসলাম ওজু

Advertisement

আরও পড়ুন

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

নারীরা কি জিন্স বা টাইট প্যান্ট পরতে পারবে? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

নারীরা কি জিন্স বা টাইট প্যান্ট পরতে পারবে? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

মেসেজে তালাক দিলে কার্যকর হবে?

মেসেজে তালাক দিলে কার্যকর হবে?

আজকের নামাজের সময়সূচি: ৫ নভেম্বর ২০২৬

আজকের নামাজের সময়সূচি: ৫ নভেম্বর ২০২৬

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম