সন্তান জন্মের পর ‘বাউন্স ব্যাক’, কেন তারকাদের শরীর নিয়ে এতো চাপ?
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সন্তান
জন্মের পর কে কত দ্রুত আগের শারীরিক গড়তে ফিরলেন সেটি নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় রীতিমতো হইচই
লেগে যায়। বিশেষ করে সেলিব্রেটিদের প্রায়ই বডি শেমিংয়ের শিকার হতে হয়। সন্তান জন্মের
কিছুদিন পরই আগের মতো ছিপছিপে চেহারায় ফিরে আসা যেন অনেকের কাছে ‘স্বাভাবিক বিষয়’।
কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত?
ভারতের
বিশিষ্ট গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. কিরণ কোয়েলহোর মতে, সন্তান জন্মের পর দ্রুত আগের শারীরিক
অবস্থায় ফিরে আসার এই ‘বাউন্স ব্যাক’ ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তার মতে, গর্ভাবস্থা ও
সন্তান প্রসবের পর শরীরকে সুস্থ হয়ে উঠতে যথেষ্ট সময় দেওয়া প্রয়োজন।
কেন তারকাদের ওপর চাপটা বেশি
তারকারা
সন্তান জন্মের পর শরীর নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্যের মুখে পড়েন বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
তাদের চেহারা ও ওজন নিয়ে মুহূর্তেই আলোচনা শুরু হয়ে যায়। অথচ গর্ভাবস্থায় শরীরে বড়
ধরনের শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে। ফলে সন্তান জন্মের পর আগের অবস্থায় ফিরতে
সময় লাগাটাই স্বাভাবিক।
ডা.
কোয়েলহোর ভাষায়, গর্ভাবস্থায় আগের ওজনে ফিরতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে। কারও ক্ষেত্রে
এর চেয়েও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।
প্রথম ছয় মাস সেরে ওঠার সময়
সন্তান
জন্মের পর প্রথম ছয় সপ্তাহ বা প্রায় ৪০ দিনকে শরীরের পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ সময়
হিসেবে দেখছেন এই বিশেষজ্ঞ। এ সময়ে শরীরে হরমোন পরিবর্তন, স্তন্যপান এবং প্রসব-পরবর্তী
বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
গর্ভাবস্থায়
বড় হয়ে যাওয়া জরায়ুকেও ধীরে ধীরে আগের আকারে ফিরতে হয়। তাই সন্তান জন্মের পরপরই শরীরকে
আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য চাপ দেওয়া ঠিক নয়।
পেটের পেশিও আগের মতো হতে
সময় নেয়
গর্ভাবস্থায়
শিশু বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পেটের দেয়ালের
পেশি প্রসারিত হয়। একই সময়ে পেলভিক-ফ্লোরের পেশির দৃঢ়তাও কমে যেতে পারে। সন্তান জন্মের
পর এসব পেশিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় প্রয়োজন। এ কারণেই অনেক নারীর সন্তান জন্মের
পরই পেটের অংশ আগের তুলনায় বড় মনে হতে পারে।
ছয় মাসে না কমলে অস্বাভাবিক?
ডা.
কোয়েলহোর মতে, সন্তান জন্মের পর বাড়তি ওজন থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারও গর্ভাবস্থার
আগের ওজনে ফিরতে ছয় মাসের বেশি সময়ও লাগতে পারে। এমনকি সন্তান জন্মের একবছর পরও কারও
শরীরে এক থেকে দুই কেজি বাড়তি ওজন থাকতে পারে।
এ
ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তন, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ এবং শারীরিক
কার্যকলাপ কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
স্তন্যপানেও বাড়তে পারে ক্ষুধা
সন্তানকে
বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের শরীরে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়। এ সময় ক্ষুধা বেড়ে
যেতে পারে। পাশাপাশি শিশুকে প্রতি দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর খাওয়ানোর কারণে ঘুমও ব্যাহত
হতে পারে।
ফলে
ঘুমের অভাব মানসিক চাপ ও কম শারীরিক কার্যকলাপ-সব মিলিয়ে সন্তান জন্মের পর ওজন কমানোর
প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ‘পারফেক্ট
বডি’ চাপ
আগে
সন্তান জন্মের পর নারীর শরীর নিয়ে প্রশ্ন করতেন মূলত কাচের মানুষজন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের
কারণে এই চাপ অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তারকাদের ক্ষেত্রে তাদের শরীর
নয়ে মন্তব্য ও তুলনা আরও বেশি চোখে পড়ে।
কিন্তু
গর্ভাবস্থার পর শরীর আগের মতো থাকবে-এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নরয়। তাই দ্রুত আগের
চেহারায় ফেরার চাপ নতুন মায়েদের জন্য বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ব্যায়াম শুরু ক্ষেত্রেও তাড়াহুড়ো
নয়
ডা.
কোয়েলহোর মতে, সন্তান জন্মের পর প্রথম ছয় সপ্তাহ মূলত শরীরের পুনরুদ্ধারের দিকে মনোযোগ
দেওয়া উচিত। এরপর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে ব্যায়াম শুরু
করা যেতে পারে।
তিন
থেকে ছয় মাসের মধ্যে অনেক নারী পর্যায়ক্রমে মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামে ফিরতে পারেন। তবে
কঠোর কোর এক্সারাইজ বা ভারোত্তোলন শুরু করা ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করাই ভালো।
শুধু ওজন নয়, নজর দিতে হবে
এসব বিষয়েও
সন্তান
জন্মের পর শুধু ওজন কমানোকে কেন্দ্র করে না থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্বাস্থ্যগত
বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা, থাইরয়েড সমস্যা,
রক্তস্বল্পতা এবং পেলভিক-ফ্লোরের সমস্যা।
গর্ভাবস্থায়
যাদের জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস ছিল, তাদেরও পরবর্তী সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণে
থাকা প্রয়োজন।
‘আগের চেহারায় ফেরার’ কোনো
ডেডলাইন নেই
ডা.
কোয়েলহোর মতে, সন্তান জন্মের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মায়ের শারীরিক পুনরুদ্ধার,
পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য, স্তন্যপান এবং সামগ্রিক সুস্থতা। গভৃাবস্থায় আগের চেহারায়
ফিরে আসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা থাকা উচিত নয়।
প্রতিটি
নারীর শরীর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া আলাদা। তাই সদ্য মা হওয়া একজন নারীর প্রয়োজন শরীরকে
সেরে ওঠার সুযোগ দেওয়া-নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আগের চেহারায় ফিরে আসার চাপ নয়।
তথ্যসূত্র:
এনডিটিভি।
