Logo
Logo
×
   

Advertisement

লাইফ স্টাইল

যেসব কারণে নারীদের আগে পুরুষরা বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন

Advertisement

Icon

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০২:২৬ পিএম

যেসব কারণে নারীদের আগে পুরুষরা বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন

প্রতীকী ছবি।

Advertisement

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি সত্ত্বেও পুরুষদের অকাল মৃত্যু, চিকিৎসায় অবহেলা এবং গুরুতর উপসর্গগুলোকে সাধারণ মনে করে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পুরুষদের স্বাস্থ্যের প্রতি এই উদাসীনতা ও নীরবতা নীরবেই কেড়ে নিচ্ছে বহু প্রাণ। 

শৈশব থেকেই ছেলেদের শেখানো হয়—‘অভিযোগ করতে নেই, কষ্ট সহ্য করাই পুরুষের কাজ।’ 

বড় হয়ে তারা যখন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে ওঠেন, তখন দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মানসিক চাপের বোঝা একাই বহন করেন। 

কোনো শারীরিক দুর্বলতা বা অসুস্থতা প্রকাশ করলে সমাজে নিজের পুরুষত্ব বা যোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হবে—এমন এক কাল্পনিক ভয়ে তারা ভুগতে থাকেন। এর ফলে প্রতিনিয়ত দেখা দেওয়া ক্লান্তি, বুকে অস্বস্তি বা তীব্র মানসিক চাপকে তারা অবহেলা করেন, যা পরবর্তীতে হঠাৎ বড় কোনো জরুরি স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করে। 

এক্ষেত্রে ভারতের দীপক সেথিয়ার গল্পটা সকলের জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ। 

দীপকের বয়স যখন ৪০-এর কোঠাও ছোঁয়নি, তখনই তার হার্টে দুটি স্টেন্ট বসাতে হয়। বছরের পর বছর ধরে দৈনিক ১৪ ঘণ্টা কাজ, কাজের প্রবল চাপ এবং শরীরের দেওয়া প্রাথমিক সতর্কবার্তাগুলোকে ক্রমাগত অবহেলা করার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল এটি। দীপক বলেন, ‘আমার শরীর আমাকে ইঙ্গিত দিচ্ছিল, কিন্তু আমি তা শুনিনি।’ 

আজ দীপক অন্ধের মতো পরিশ্রমের চেয়ে নিজের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। একজন কেবল অর্থ জোগানদাতার চেয়েও বড় কথা, তিনি তার সন্তানের জন্য সুস্থ বাবা হিসেবে বেঁচে থাকতে চান। 

তার এই গল্প মনে করিয়ে দেয়—উপসর্গ উপেক্ষা করা কোনো বীরত্ব বা শক্তি নয়, এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ এক বোকামি। 

এক দশক আগেই হানা দিচ্ছে হৃদরোগ

ভারতের গুরুগ্রামের ফোর্টিস হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি ও অ্যাডভান্সড কার্ডিয়াক ইমেজিং বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর ও প্রধান, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. বিনায়ক আগরওয়াল সতর্ক করে বলেন, নারীদের তুলনায় পুরুষদের হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ প্রায় এক দশক (১০ বছর) আগেই আঘাত হানছে। 

ড. আগরওয়াল বলেন, ‘আমরা আজকাল ৪০ বছরের শুরুর দিকের তরুণ পুরুষদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাক দেখতে পাচ্ছি। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিদ্রা বা ঘুমের অভাব এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এর পেছনে নীরব অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।’ 

তিনি আরও জানান, পুরুষরা প্রায়ই বড় বড় উপসর্গগুলোকে ছোটখাটো সমস্যা ভেবে ভুল করেন। ‘অতিরিক্ত ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট বা বুকে অস্বস্তি হওয়া মানেই তা কেবল বয়সের দোষ বা এসিডিটি নয়। এগুলো আসলে বড় বিপদের পূর্বাভাস। এগুলো এড়িয়ে যাওয়া ডেকে আনতে পারে অকাল মৃত্যু।’ 

ফিটনেস নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ভ্রান্ত ধারণা 

অনেক পুরুষ ভাবেন নিয়মিত ব্যায়াম করলেই শরীর পুরোপুরি সুরক্ষিত। ড. আগরওয়াল এই ভুল ধারণার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ব্যায়াম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি কখনো ধূমপান, অপর্যাপ্ত ঘুম কিংবা অনিয়ন্ত্রিত মানসিক চাপের ক্ষতিকে পুষিয়ে দিতে পারে না। নিয়মিত জিম করা মানেই হৃদরোগের বিরুদ্ধে কোনো চিরস্থায়ী ইমিউনিটি বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পেয়ে যাওয়া নয়।’ 

পুরুষদের যেসব উপসর্গ কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়:

  • দীর্ঘস্থায়ী বা অনবরত ক্লান্তি
  • বুকে অস্বস্তি বা হঠাৎ শ্বাসকষ্ট
  • পেটের মেদ বা কোমরের মাপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়া
  • ঘুমের সমস্যা বা অনিদ্রা 

হৃদরোগের পাশাপাশি পুরুষদের আরেকটি বড় ভীতি ও নীরব সংকট হলো প্রোস্টেটের সমস্যা। ফোর্টিস হাসপাতালের ইউরোলজি ও রোবোটিক ইউরোলজিক্যাল সার্জারি বিভাগের প্রধান ড. বিক্রম শর্মা জানান, পুরুষরা চিকিৎসকদের কাছেও মূত্রনালি বা যৌন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা নিয়ে কথা বলতে তীব্র দ্বিধাবোধ করেন। এই লজ্জাই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাকে অনেক পিছিয়ে দেয়। 

তিনি ব্যাখ্যা করেন, রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া, প্রস্রাবের দুর্বল ধারা বা যৌন অক্ষমতা-কে অনেকে ‘বয়স বাড়ার স্বাভাবিক লক্ষণ’ মনে করে ভুল করেন। কিন্তু বাস্তবে এগুলো প্রোস্টেট ক্যানসারসহ মারাত্মক সব রোগের লক্ষণ হতে পারে। 

ক্যানসার, স্থায়ী অক্ষমতা বা অস্ত্রোপচারের ভয় পুরুষদের স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করা থেকে দূরে রাখে। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে জীবন বাঁচানো সম্ভব। 

ড. শর্মা জোর দিয়ে বলেন, প্রোস্টেট পরীক্ষা করার জন্য উপসর্গ দেখা দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। বিশেষ করে ৪৫ বছর পার হওয়া পুরুষদের, যাদের পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস আছে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পিএসএ টেস্ট করানো উচিত। এক্ষেত্রে লজ্জাজনিত নীরবতাই সঠিক চিকিৎসার সবচেয়ে বড় বাধা। 

প্রোস্টেটের যেসব সতর্কবার্তা কখনোই অবহেলা করা উচিত না: 

  • রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া
  • প্রস্রাবের গতি বা ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া
  • ইরেক্টাইল ডিসফাংশন বা যৌন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা 

সুস্থ জীবনের প্রেসক্রিপশন: প্রতিরোধই আসল শক্তি

সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। শরীর ঠিক রাখতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। পুরুষদের নিয়মিতভাবে যেসব পরীক্ষা করা উচিত: 

  • রক্তচাপ ও রক্তের শর্করা 
  • লিপিড প্রোফাইল (কোলেস্টেরল) এবং কোমরের মাপ
  • লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা 
  • ভিটামিন ডি এবং ভিটামিন বি১২ 
  • ৪৫ বছরের পর প্রোস্টেট স্ক্রিনিং বা পিএসএ টেস্ট।

এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। রাতে ৬ ঘণ্টার কম ঘুমালে হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আর বুকে যেকোনো ধরনের অস্বাভাবিক ব্যথা বা শ্বাসকষ্টকে ভুলেও কেবল ‘গ্যাসের সমস্যা’ বলে অবহেলা করবেন না। 

সবশেষে, পুরুষরা স্বাস্থ্যের যত্ন নেন না—তা নয়; বরং ছোটবেলা থেকেই তাদের শেখানো হয়েছে সব কষ্ট নীরবে সহ্য করতে। কিন্তু মনে রাখবেন, সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করার নাম শক্তি নয়। 

শরীরের ভাষা বোঝা, নিজের স্বাস্থ্যের প্যারামিটার বা সংখ্যাগুলো (রক্তচাপ, সুগার ইত্যাদি) জানা এবং সময় থাকতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হলো প্রকৃত সচেতনতা ও শক্তির লক্ষণ। পুরুষদের স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ, এবং এই বিষয়ে আপনার ‘নীরবতা’-ই হতে পারে আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু। 

সূত্র: এনডিটিভি 

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম