Logo
Logo
×
   

Advertisement

লাইফ স্টাইল

শিশুদের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সতর্কবার্তা

Advertisement

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

শিশুদের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সতর্কবার্তা

Advertisement

দুই বছরের কম বয়সী শিশু ও নবজাতকদের স্ক্রিন টাইমের (পর্দায় চোখ রাখার সময়) সঙ্গে স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবের সম্পর্ক রয়েছে এবং এটি অবশ্যই এড়িয়ে চলা উচিত।

ব্রিটেনের এক যুগান্তকারী গবেষণায় গবেষকরা এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন।খবর দ্য গার্ডিয়ান।

গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, এ বয়সে স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের বিকাশে বড় ধরনের উদ্বেগজনক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস শিশুদের জন্য যে ঝুঁকি তৈরি করে, তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আরও তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।

যখন কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল অভ্যাস এবং ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সরকারি পরিকল্পনার ওপর সবার মনোযোগ, তখন গবেষকেরা নীতিমালার একটি 'বেবি ব্লাইন্ড স্পট’ বা শিশুদের প্রতি অন্ধত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন শিশুদের লালনপালনের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের ব্যবহার প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লিডস ইউনিভার্সিটির মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক এবং এ গবেষণার সহ-নেতৃত্বদানকারী রাফ ক্লেটন বলেন, মা-বাবার নিজেদেরই স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে সঠিক নির্দেশনার অভাব রয়েছে। ফলে তারা ‘অজান্তেই শিশু এবং নবজাতকদের স্ক্রিনযুক্ত ডিভাইসের প্রতি অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও সম্পর্ক গড়ে তুলতে শেখাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন’।

এ বিষয়ে বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত হওয়া সব গবেষণার সবচেয়ে বিশদ পর্যালোচনা হিসেবে আখ্যায়িত এ গবেষণায়, পাঁচ বছরের কম বয়সীদের স্ক্রিন টাইমের বিষয়ে সরকারের সম্প্রতি প্রকাশিত নির্দেশনাটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ওই সরকারি নির্দেশনায় দুই বছরের কম বয়সীদের স্ক্রিন টাইম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হলেও একটি শর্ত জুড়ে দিয়ে বলা হয়েছে, ‘যৌথ কার্যকলাপ, যা পারস্পরিক বন্ধন, মিথস্ক্রিয়া এবং কথোপকথনকে উৎসাহিত করে, সেগুলো এর আওতার বাইরে থাকবে’।

তবে নতুন এ গবেষণা শিশুদের স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য নানা ক্ষতির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে মা-বাবা এবং যত্নদানকারীদের সঙ্গে বন্ধন তৈরির সুযোগ কমে যাওয়া, অন্য শিশুদের সঙ্গে শারীরিক খেলাধুলার সময় হ্রাস এবং ভাষাগত বিকাশের সীমাবদ্ধতা।

এতে বলা হয়েছে, এত কম বয়সে স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে অতিরিক্ত উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা চোখের স্বাস্থ্য ও শিশুদের স্থূলতার ওপর প্রভাব ফেলে। আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুরা এখন সান্ত্বনা ও প্রশান্তির জন্য মা-বাবার কাছে না গিয়ে ডিজিটাল ডিভাইসের দিকে ঝুঁকছে।

যুক্তরাজ্যের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যাকশন অন ডিজিটাল ডিভাইস ইমার্সিভ কন্ডিশনস টিম’ পরিচালিত এ পর্যালোচনায় স্ক্রিন ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট কিছু বিকাশজনিত সমস্যার মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। তবে এতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, ‘দুই বছরের কম বয়সী কোনো শিশুরই নিয়মিত ইচ্ছাকৃতভাবে স্ক্রিন টাইম পাওয়া উচিত নয়। সামাজিকভাবে পরোক্ষ স্ক্রিন টাইম এড়ানো অসম্ভব, তাই এর সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ব্যবহার যুক্ত হলে তা কোনো অর্থবহ সুবিধা ছাড়াই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়’।

গবেষণায় সুপারিশ করা হয়েছে, দুই বছরের কম বয়সীদের জন্য নিয়মিত ‘যৌথ স্ক্রিন টাইম, শিক্ষার জন্য স্ক্রিন টাইম, যোগাযোগের জন্য স্ক্রিন টাইম অথবা শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম-এর মতো সরকারি নির্দেশনাগুলো পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কারণ মা-বাবা এবং যত্নদানকারীরা এটিকে নিরাপদ অথবা উৎসাহব্যঞ্জক হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করতে পারেন।

‘এর ফলে যত্নদানকারীরা ভাবতে পারেন যে, দুই বছরের কম বয়সীদের জন্য স্ক্রিন টাইম বিকাশের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর নয়। অথচ এর ফলে যারা আগে থেকেই ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের বিকাশে আরও বিলম্ব হতে পারে এবং তারা আরও বেশি একাকী আচরণ করতে পারে’।

এ ফলাফলের ভিত্তিতে লিডস, লিডস ট্রিনিটি, লাফবরো এবং অ্যাস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গবেষক দল একটি ‘বেবি স্ক্রিন-টাইম রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ বা শিশুদের স্ক্রিন টাইমের ঝুঁকি মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছে। এর লক্ষ্য হলো, যেসব পরিবারে শিশুদের বিকাশে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে, তাদের সুনির্দিষ্ট সহায়তা প্রদানে সংশ্লিষ্ট পরিষেবাগুলোকে সাহায্য করা।

লিডস ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটির ফ্যামিলি অ্যান্ড কালচারাল ডাইনামিকসের অধ্যাপক এবং এ গবেষণার সহ-নেতৃত্বদানকারী কারমেন ক্লেটন বলেন, ‘সমস্যাযুক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়ে কীভাবে পরিবারগুলোর সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত হওয়া যায়, সরকারকে অবশ্যই তা বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে, এমন বিষয়গুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে গিয়ে অনেক মা-বাবা যে সমালোচিত হওয়ার ভয়ে ভোগেন, সে বিষয়েও সংবেদনশীল হতে হবে’।

কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক মন্ত্রী এবং ‘১,০০১ ক্রিটিক্যাল ডেজ ফাউন্ডেশন'-এর প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রেয়া লিডসম বলেন, ‘এ যুগান্তকারী পর্যালোচনাটি একটি সতর্কবার্তা। ক্রমাগতভাবে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, স্ক্রিন শিশুদের জন্য খুব সামান্যই সুবিধা বয়ে আনে। মানুষের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়—অর্থাৎ জীবনের প্রথম ১,০০১ দিনে এটি উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে’।

তিনি বলেন, ‘যে সমস্যা মা-বাবারা তৈরি করেননি, তার জন্য তাদের দোষারোপ করা উচিত নয়। এর দায়ভার কেবল তাদের কাঁধে চাপানো যায় না। এ কারণেই প্রতিটি পরিবারের ‘বেস্ট স্টার্ট ফ্যামিলি হাব’-এ প্রবেশাধিকার থাকা উচিত, যেখানে তারা তাদের সন্তানের জীবনের প্রথম বছরগুলোতে বিশ্বস্ত পরামর্শ এবং বাস্তবভিত্তিক সহায়তা পেতে পারেন’।

লিডসম আরও বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রমাণ যেখানে উলটো কথা বলছে, সেখানে মা-বাবাদের সামনে এমন কোনো কনটেন্ট তুলে ধরা উচিত নয়, যেগুলোকে শিশুদের জন্য উপযুক্ত হিসেবে প্রচার করা হয়’।

ইংল্যান্ডের চিলড্রেনস কমিশনার র‍্যাচেল ডি সুজা, যিনি সরকারি নির্দেশনাটি তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন, তিনি বলেন, এ নির্দেশনার উদ্দেশ্য ছিল মা-বাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা, এর বিকল্প হওয়া নয়।

‘দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম এড়িয়ে চলার সুপারিশটি স্পষ্ট। তবে আমাদের আজকের বিশ্বের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে এবং আত্মীয়দের সঙ্গে ভিডিও কল বা সহায়তামূলক শিক্ষার মতো সীমিত কিছু ক্ষেত্রে যৌথভাবে স্ক্রিন ব্যবহার একেবারেই স্বাভাবিক’।

যুক্তরাজ্যের শিক্ষা বিভাগের এক মুখপাত্র বলেন, ‘পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মা-বাবাদের জন্য প্রথমবারের মতো তৈরি করা আমাদের স্ক্রিন টাইম নির্দেশিকা নিয়ে আমরা গর্বিত। এটি এমন একটি বিষয়ে স্পষ্ট ও বিশ্বস্ত সহায়তা প্রদান করে, যা আমরা জানি যে পরিবারগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে’।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম