জ্বর হলে কি গোসল করা যাবে? প্রচলিত ভুল ধারণা নিয়ে যা বলছেন চিকিৎসকরা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঋতু পরিবর্তন কিংবা যেকোনো ইনফেকশনের কারণে জ্বর হওয়া একটি সাধারণ বিষয়। আর জ্বর হলেই আমাদের চারপাশ থেকে নানা রকম পরামর্শ আসতে শুরু করে।
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা বা কুসংস্কার রয়েছে যে—জ্বর হলে কোনোভাবেই গোসল করা উচিত নয়, এতে নাকি জ্বর আরও বেড়ে যায়। আবার কেউ কেউ পরামর্শ দেন শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমাতে একদম ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে।
কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই দুটি ধারণার কোনোটিই পুরোপুরি সঠিক নয়।
ভারতের ফরিদাবাদের অমৃতা হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট ড. সঞ্জয় রায়না জানান, জ্বরের সময় গোসল করা সাধারণত সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে গোসলের পানির ধরন এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর এটি নির্ভর করে।
কুসুম গরম পানিই সবচেয়ে নিরাপদ
চিকিৎসকদের মতে, জ্বর হলে ঠান্ডা বা অতিরিক্ত গরম পানির বদলে হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে অল্প সময়ের জন্য গোসল করা উচিত। এটি শরীর থেকে ঘাম ও আঠালো ভাব দূর করে, রোগীকে সতেজ রাখে এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক নিয়মে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
মনে রাখতে হবে, গোসলের উদ্দেশ্য জ্বর ‘সেরে তোলা’ নয়, বরং রোগীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক অনুভূতি দেওয়া।
ঠান্ডা পানি কেন বিপজ্জনক?
সাধারণ যুক্তিতে মনে হতে পারে যে ঠান্ডা পানি শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে দেবে, কিন্তু চিকিৎসকেরা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। ড. সঞ্জয় রায়না বলেন, ‘অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি শরীরে কাঁপুনি তৈরি করতে পারে। কাঁপুনি দিলে শরীরের পেশিগুলো উল্টো আরও তাপ উৎপন্ন করে। এর ফলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা না কমে বরং আরও বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া জ্বরের সময় এমনিতেই শরীরে একটা ঠান্ডা ভাব বা কাঁপুনি থাকে, ঠান্ডা পানি সেই অস্বস্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।’
গরম পানিও কেন এড়িয়ে চলবেন?
ঠান্ডা পানির মতো অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করাও ঠিক নয়। তীব্র গরম পানি ব্যবহারের ফলে:
- শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম বের হয়ে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
- মাথা ঘোরার সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
- শরীরের তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে এবং চরম অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
তাই ঠান্ডা বা গরম পানির কোনোটিই নয়, বরং হালকা কুসুম গরম পানি শরীরের ওপর বাড়তি চাপ না ফেলে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, জ্বরের চিকিৎসা মানে কেবল শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলা নয়। জ্বর মূলত একটি সংকেত যে শরীর কোনো ইনফেকশন বা অন্য কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তাই জ্বর হলে তাপমাত্রা কমানোর পাশাপাশি নিচের বিষয়গুলোতে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত:
- শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার খাওয়া।
- পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম নেওয়া।
- সহজে হজম হয় এমন হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক নিয়মে জ্বর কমানোর ওষুধ সেবন করা।
- জ্বরের মূল কারণটি চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া।
কখন গোসল করা থেকে বিরত থাকবেন?
জ্বর অবস্থায় গোসল করা নিরাপদ হলেও রোগীর অবস্থা যদি নিচের মতো হয়, তবে গোসল না করিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত:
- রোগী যদি অতিরিক্ত দুর্বল বোধ করেন।
- মাথা ঘোরা বা জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হলে।
- অতিরিক্ত ঝিমুনি বা মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দিলে।
- রোগী নিজে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারলে।
- তীব্র অসুস্থতার সঙ্গে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার জ্বর থাকলে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি রোগীর মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসা সেবা নিতে হবে:
- জ্বর যদি টানা ২ থেকে ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হয়।
- শরীরের তাপমাত্রা যদি অত্যন্ত বেশি থাকে।
- শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে।
- তীব্র মাথাব্যথা কিংবা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে।
- অনবরত বমি হতে থাকলে।
- মানসিক বিভ্রান্তি, খিঁচুনি কিংবা অতিরিক্ত মাত্রায় ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিলে।
- আক্রান্ত ব্যক্তি যদি নবজাতক শিশু, বয়োবৃদ্ধ কিংবা কম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো রোগী হন।
উল্লেখ্য, শুধু জ্বর এসেছে বলেই গোসল বন্ধ করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে অল্প সময়ের গোসল রোগীর সুস্থতার প্রক্রিয়া ব্যাহত না করেই তাকে আরাম দেবে। তবে পানির তাপমাত্রা যেন ঠিক থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন এবং জ্বরের মূল কারণটি দূর করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র: এনডিটিভি

-6a483c98c3645.jpg)