প্রতিদিন হাঁটলে কি ফ্যাটি লিভার কমবে? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমান বিশ্বে নিঃশব্দে বাসা বাঁধা অন্যতম ব্যাধিগুলোর একটি হলো ‘ফ্যাটি লিভার’, যার আধুনিক নাম ‘মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় একজন এই সমস্যায় আক্রান্ত।
সাধারণত স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং কায়িক পরিশ্রমহীন অলস জীবনযাত্রার কারণে এ রোগের বিকাশ ঘটে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—কেবল হাঁটার মতো সহজ অভ্যাস কি ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যা পুরোপুরি নিরাময় বা রিভার্স (অতীত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা) করতে পারে? ভারতের শালিমার বাগের ফোর্টিস হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান ড. রমেশ গর্গের মতে, উত্তরটি ‘হ্যাঁ’। তবে হাঁটার আসল সুফল পাওয়া যায় তখনই, যখন এটি একটি সার্বিক সুস্থ জীবনযাত্রার অংশ হয়ে ওঠে।
কেন এবং কীভাবে হাঁটা ফ্যাটি লিভার কমায়?
হাঁটা একটি মাঝারি মানের অ্যারোবিক ব্যায়াম। এটি শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ না ফেলেই লিভারের চর্বি কমাতে সাহায্য করে:
ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি: নিয়মিত হাঁটার ফলে পেশি বেশি পরিমাণ গ্লুকোজ ও শক্তি ব্যবহার করে। এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে, যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে এবং লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হতে বাধা দেয়।
জমা চর্বি ও প্রদাহ হ্রাস: জোরে হাঁটা বা ‘ব্রিস্ক ওয়াকিং’ শরীরের সামগ্রিক ক্যালোরি খরচ বাড়ায়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমে থাকা চর্বি গলাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি মেটাবলিক জটিলতা ও প্রদাহ কমায়।
সবার জন্য সহজ ও নিরাপদ: অন্যান্য কঠিন ব্যায়ামের তুলনায় হাঁটা সহজ ও সাশ্রয়ী। যেকোনো ব্যক্তি তার সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে শুরু করে হাঁটার গতি বাড়াতে পারেন।
প্রতিদিন ঠিক কতটা হাঁটা উচিত?
লিভার সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কসরত বা ব্যায়ামের পরামর্শ দেন।
দৈনিক লক্ষ্য: সপ্তাহের অধিকাংশ দিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট জোরে হাঁটা অত্যন্ত কার্যকরী।
নতুনদের জন্য পরামর্শ: যারা একেবারেই হাঁটেন না, তারা প্রথম দিনেই দীর্ঘ পথ না হেঁটে অল্প সময় দিয়ে শুরু করতে পারেন। পরে ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ানো ভালো।
ছোট পরিবর্তন: লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার, কাজের ফাঁকে হেঁটে নেওয়া বা খাবারের পর কিছুক্ষণ হাঁটার মতো অভ্যাসগুলো দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে।
কেবল হাঁটলেই কি ফ্যাটি লিভার পুরোপুরি ভালো হয়?
হাঁটা লিভারের চর্বি ও মেটাবলিক সমস্যা কমায় সত্য, তবে এটিকে একক কোনো ‘জাদুকরী চিকিৎসা’ বলা যাবে না। এটি কতটা কাজ করবে তা নির্ভর করে শরীরের ওজন, খাদ্যাভ্যাস এবং লিভারের বর্তমান শারীরিক অবস্থার ওপর।
ওজন কমানোর ভূমিকা: শরীরের ওজনের প্রায় ৫ শতাংশ কমালে লিভারের চর্বি কমতে শুরু করে। আর ৭ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমাতে পারলে লিভারের প্রদাহ কমে এবং শুরুর দিকের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।
ওজন না কমলেও লিভারের লাভ: সবচেয়ে আশার কথা হলো—স্কেলে ওজন কমুক বা না কমুক, নিয়মিত হাঁটা কিন্তু ভেতর থেকে লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। তাই ওজন না কমলেও হাঁটার অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত নয়।
জীবনযাত্রায় আনুন পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তন
ফ্যাটি লিভার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হাঁটার পাশাপাশি দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা আবশ্যক:
১. সুষম খাদ্যাভ্যাস: প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, হোল গ্রেইন (আটা, লাল চাল) এবং চর্বিহীন প্রোটিন গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলুন।
২. পেশি গঠনের ব্যায়াম: হাঁটার পাশাপাশি সপ্তাহে ২-৩ দিন হালকা অ্যারোবিক্স বা রেজিস্ট্যান্স এক্সারসাইজ করলে পেশি গঠন হয় এবং গ্লুকোজ ব্যবহারের ক্ষমতা বাড়ে।
৩. অন্যান্য শারীরিক সমস্যা নিয়ন্ত্রণ: ভালো ঘুম নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
নিরব ঘাতক
ফ্যাটি লিভারের প্রারম্ভিক অবস্থায় অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ বা অসুস্থতা বোধ হয় না। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় এটি ভেতরে ভেতরে লিভারের ক্ষতি করতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা না করালে এটি লিভারে ক্ষত বা ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং একপর্যায়ে লিভার ফেইলিউর কিংবা লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার (রক্ত পরীক্ষা বা আল্ট্রাসনোগ্রাম) মাধ্যমে লিভারের স্বাস্থ্যের তদারকি করা উচিত। ড. রমেশ গর্গ আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, ‘বার্তাটি খুব সহজ: আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ মূল্যবান। প্রতিদিনের ব্রিস্ক ওয়াকিং লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় বিনিয়োগ।’
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন

