Logo
Logo
×
   

লাইফ স্টাইল

যেভাবে আপনার ক্ষতি করছে এআই

Icon

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

যেভাবে আপনার ক্ষতি করছে এআই

গভীর রাতে মনে জেগে ওঠা একটি ছোট সন্দেহ বা এমন কোনো প্রশ্ন যা অন্য কাউকেই বলা যায় না—ঠিক সেখান থেকেই গল্পটার শুরু। ‘আমার কি সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া উচিত?’ কিংবা ‘আমার কি ডিভোর্স নেওয়া উচিত?’—কথাগুলো চ্যাটজিপিটি-তে লিখে টাইপ করতেই চোখের পলকে ভেসে ওঠে একটি সুন্দর ও গুছানো উত্তর। 

মনে হয়, এই মুহূর্তে আপনার ভেতরের মানসিক অবস্থাটা অন্তত কেউ একজন সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছে। কিন্তু এই আরামদায়ক অনুভূতিটাই যদি মূল সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়? 

সম্প্রতি বেশ কিছু প্রতিবেদন ও গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ব্যক্তিগত বিষয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দেওয়া পরামর্শ যতটা নির্ভরযোগ্য মনে হয়, বাস্তবে তা নাও হতে পারে। এমনকি অনেক সময় আপনার অজান্তেই এটি আপনাকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। 

কেন এমনটা ঘটছে তা বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে এআই তার উত্তরগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করে। ২০২৫ সালে ‘সেমরাশ’-এর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এআই-এর তৈরি উত্তরের জন্য সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠেছে ‘রেডিট’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন উত্তরের তথ্যসূত্রের ৪০ শতাংশেরই বেশি আসে এই প্ল্যাটফর্মটি থেকে, যা উইকিপিডিয়া, ইউটিউব বা গুগল সার্চের চেয়েও অনেক এগিয়ে। 

রেডিট মূলত কেমন জায়গা, তা একটু ভেবে দেখুন। এটি কোনো যাচাইকৃত তথ্যের ভান্ডার নয় বরং মানুষের মতামত, অভিজ্ঞতা ও ক্ষণিকের আবেগের জায়গা। মানুষ এখানে প্রায়ই ক্ষোভ, হতাশা কিংবা বিভ্রান্তির মুহূর্তে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে। 

জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির দৃষ্টি আকর্ষণ করা রেডিটের একটি সম্পর্কভিত্তিক ফোরামের বিশ্লেষণ দেখায় যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এআইয়ের আলোচনাগুলো পরামর্শ হিসেবে ‘যোগাযোগ বৃদ্ধি’ বা ‘থেরাপি’ নেওয়ার চেয়ে ‘সম্পর্ক বিচ্ছেদ’-এর মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। 

এআই যদি এই ধরনের অনলাইন কথাবার্তা থেকে শেখে, তবে সমস্যাটা বোঝা কঠিন নয়। আপনি কেবল একটি উত্তর পাচ্ছেন না, বরং বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা আবেগপ্রধান ইন্টারনেট আলোচনার একটি নির্যাস পাচ্ছেন। 

যা শুনতে চান, এআই ঠিক তা-ই বলে 

এই সমস্যার আরেকটি গভীর দিক রয়েছে। এমনকি যখন এআই-এর কাছে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির তথ্য থাকে, তখনো এটি ব্যবহারকারীর মতের সঙ্গেই একমত হতে পছন্দ করে। 

করনেল ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের তুলনায় চ্যাটবটগুলো ব্যবহারকারীদের কথায় অনেক বেশি সায় দেয়। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পরামর্শমূলক প্রশ্নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের তুলনায় এলএলএম বা এআই চ্যাটবটগুলো ব্যবহারকারীকে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি সমর্থন করে (৭২ শতাংশ বনাম ২২ শতাংশ)। 

সহজ কথায়, এআই এমনভাবে তৈরি যা তর্ক বা সংঘাত এড়িয়ে চলে। এটি আপনাকে অসন্তুষ্ট করতে চায় না। ফলে আপনার চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ না করে, এটি সেটিকে আরও সত্যি বলে মেনে নেয়। 

সাময়িকভাবে এটি শুনতে ভালো লাগলেও, এর ফলে অপ্রিয় সত্য বা ভিন্ন কোনো নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি জানার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এই পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য এবং তোষামোদপূর্ণ উত্তরের মিশ্রণ মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। 

‘ফিউচারিজম’-এর একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে চ্যাটবট মানুষের বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোতে প্রভাব ফেলছে। এআই-এর কাছ থেকে মানসিক সমর্থন নিতে গিয়ে মানুষ বাস্তব জগতের মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে ফেলছে। এমনকি এআই-এর তৈরি করা কাল্পনিক বা বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে অনেকে জীবনসঙ্গীর সাথে মারাত্মক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন, যা ক্ষেত্রবিশেষে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়িয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, মানুষ প্রায়ই অনুধাবন করতে পারে না যে তারা একটি যন্ত্রের মাধ্যমে চালিত হচ্ছে।

কিছু চরম ক্ষেত্রে এর ফলাফল কেবল ভুল বোঝাবুঝির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর একটি প্রতিবেদনে ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার বিবরণ প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, এক ব্যক্তি চ্যাটজিপিটির সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের পর মারাত্মক মানসিক বিভ্রান্তি ও প্যারাণয়েড ধারণায় ভুগতে শুরু করেন। 

চ্যাটবটটি তার ভুল ধারণাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে বরং সেগুলোকে আরও উস্কে দেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এক করুণ হত্যাকাণ্ডে। নিহতের পরিবার অভিযোগ করে যে, বিপজ্জনক চিন্তাগুলোকে থামানোর বদলে এআই সেগুলোকে সমর্থন জুগিয়ে গেছে। 

ঘটনার পর ওপেনএআই জানায় যে, তারা তাদের এআই মডেলগুলোকে ব্যবহারকারীর মানসিক চাপ শনাক্ত করা এবং বাস্তব সহায়তার দিকে পরিচালিত করার বিষয়ে আরও উন্নত করছে। তবে এই ঘটনাটি একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—মানুষ যখন চারপাশের সত্যিকারের মানুষদের চেয়ে যন্ত্রকে বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করবে, তখন পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে? 

এর অর্থ এই নয় যে এআই সম্পূর্ণ অনর্থক। কোনো বিষয় বোঝা, নতুন কাজ শেখা কিংবা শেয়ার বাজারের বিনিয়োগ বিশ্লেষণ করার মতো সাধারণ কাজের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি দুর্দান্ত ও দরকারী টুল। এটি খুব অল্প সময়ে জটিল বিষয়কে সহজে বুঝিয়ে দিতে পারে।

তবে প্রশ্ন যখন ব্যক্তিগত ও আবেগজনিত হয়, তখনই তৈরি হয় আসল ঝুঁকি। 

আবেগপূর্ণ বিষয়ে উত্তর দেওয়ার সময় এআই প্রায়ই আপনার ভেতরের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেয়। এটি আপনাকে সহজে প্রশ্ন করে না বা ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শক্তভাবে আটকায় না, যা আপনার মধ্যে একটি মিথ্যা আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো এআই-কে তথ্যের জন্য ব্যবহার করা, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নয়। ব্যক্তিগত ও আবেগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, বাস্তব জীবনের মানুষের সঙ্গে কথা বলাই শ্রেয়। 

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে 

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম