যেসব উপসর্গ দেখলে বুঝবেন কৃমি, কী করবেন?
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অনেক প্রাপ্তবয়স্কের কাছে অন্ত্রের কৃমি যেন শৈশবের সমস্যা। অনেকেই মনে করেন অপরিচ্ছন্নতা, অনিরাপদ খাবার বা গ্রামীণ জীবনের কারণে কৃমি হয় এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বা ঘরে তৈরি খাবার খেলে কৃমির সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা যায়। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এই ধারণা ভিত্তিহীন।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলোতে পরিবেশের কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। খবর এনডিটিভির।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শাকসবজি, পানি, মাটি, এমনকি হাতেও থাকা অতি ক্ষুদ্র ডিম ও লার্ভার মাধ্যমে অন্ত্রে কৃমির সংক্রমণ ঘটে। এসব পরজীবী মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর শরীরে থাকতে পারে। এর ফলে হজমের সমস্যা, ক্লান্তি, রক্তস্বল্পতা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ভারতের অ্যাস্টার হোয়াইটফিল্ড হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিভাগের পরামর্শক ডা. ঐশ্বরিয়া আর বলেন, অনেক প্রাপ্তবয়স্কের শরীরে কম মাত্রার কৃমির সংক্রমণ থাকলেও স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবে সময়ের সঙ্গে এসব পরজীবী হজম, পুষ্টি শোষণ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলেন, কৃমিনাশক ওষুধ সেবন বা ডিওয়ার্মিং শুধু শিশুদের জন্য কিংবা বাইরে খাবার খান এমন ব্যক্তিদের জন্য নয়, বরং সব বয়সি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
পরিষ্কার খাবার থেকেও কৃমি ছড়ায়
অনেকেই মনে করেন, ঘরে রান্না করা খাবার মানেই তা পরজীবীমুক্ত। কিন্তু ডা. ঐশ্বরিয়ার মতে, কৃমির সংক্রমণের পথ শুধু খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অপরিষ্কার খাবার বলতে শুধু দৃশ্যত নোংরা বা অনিরাপদ খাবার বোঝায় না। ঠিকমতো না ধোয়া শাকসবজি, অপরিশোধিত পানি, মাটির সংস্পর্শ, পোষা প্রাণীর সংস্পর্শ, একই বাথরুম ব্যবহার এবং অপরিষ্কার হাত— সবকিছু থেকেই কৃমির সংক্রমণ হতে পারে।
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে পরিবেশের সংস্পর্শ কৃমি সংক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। পরজীবীর ডিম মাটি ও পানিতে টিকে থাকতে পারে। এদেরকে খালি চোখে দেখা যায় না। কাঁচা বা আংশিকভাবে ধোয়া খাবার, বিশেষ করে পাতাযুক্ত শাকসবজি খাওয়ার সময় অজান্তেই এসব ডিম শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
কাঁচা সবজি দিয়ে তৈরি সালাদ ভালোভাবে রান্না করা মাংসের তুলনায় ঝুঁকি বেশি হতে পারে। কারণ তাপ পরজীবী ধ্বংস করতে কার্যকর। ডা. ঐশ্বরিয়া বলেন, কৃমির সংক্রমণ ঘটে অতি ক্ষুদ্র ডিম বা লার্ভা খাওয়ার মাধ্যমে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
শিশুরাই কৃমির সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এর অন্যতম কারণ হলো তারা প্রায়ই মাটির সংস্পর্শে আসে। ফলে,অপরিষ্কার হাত মুখে দেওয়ার প্রবণতা থাকে।
ডা. ঐশ্বরিয়া বলেন, একটি পরিবারের মধ্যে ভাইবোন, মা-বাবা ও আক্রান্ত শিশুর পরিচর্যাকারীদের মধ্যে একসঙ্গে কৃমির সংক্রমণ দেখা যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। একই টয়লেট ব্যবহার বা অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
তবে শহরের মানুষও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। দূষিত পানি, অপরিষ্কার গণশৌচাগার, ডে-কেয়ার সেন্টার ও পোষা প্রাণীর সংস্পর্শ কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডা. ঐশ্বরিয়া সতর্ক করে বলেন, কৃমি শুধু গ্রামীণ এলাকার সমস্যা এমন ধারণার কারণে শহরের শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার দেরিতে হয়।
যেসব উপসর্গ মানুষ প্রায়ই অবহেলা করেন
অন্ত্রের কৃমির অন্যতম বড় সমস্যা হলো, দীর্ঘ সময় এটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে থাকতে পারে। ডা. ঐশ্বরিয়ার মতে, উপসর্গ দেখা দিলেও তা সাধারণত মৃদু হয় এবং প্রায়ই দৈনন্দিন হজমের সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়।
সাধারণ সতর্কতামূলক লক্ষণগুলো হলো—
• দীর্ঘদিন পেট ফাঁপা বা পেটে অস্বস্তি;
• অকারণে ক্লান্তি;
• ক্ষুধা কমে যাওয়া;
• রক্তস্বল্পতা;
• অনিয়মিত পায়খানা;
• পায়ুপথে চুলকানি।
এছাড়া কারও কারও চুল পড়া, ত্বকের সমস্যা বা পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরও ওজন বাড়াতে না পারার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ মানসিক চাপজনিত হজমের সমস্যা বা অপুষ্টির সঙ্গে মিলে যাওয়ায় অনেক সময় বছরের পর বছর কৃমির সংক্রমণ শনাক্ত হয় না।
ওষুধ নাকি পরিচ্ছন্নতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃমির চিকিৎসা ও প্রতিরোধ দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। ডা. ঐশ্বরিয়া বলেন, কৃমিনাশক ওষুধ শরীরে থাকা পরজীবী দূর করে। তবে সঠিক পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলে আবারও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষার জন্য নিরাপদ পানি পান, শাকসবজি ও ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া, নিয়মিত হাত পরিষ্কার করা, বাইরে গেলে জুতা ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্ত্রের কৃমি শুধু অপরিচ্ছন্ন খাবার, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস বা গ্রামীণ জীবনের সমস্যা নয়। পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বয়স বা খাদ্যাভ্যাস নির্বিশেষে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন।
নিরাপদ ও যথাযথভাবে কৃমিনাশক ওষুধ সেবন অন্ত্রের স্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও পুষ্টি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
ডা. ঐশ্বরিয়ার ভাষায়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা একসঙ্গে চললেই সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। শুধু খাবারের ব্যাপারে সতর্ক থাকাই যথেষ্ট নয়।
