রাতের ঘুমের ঘাটতি কি দিনে পূরণ হয়, জেনে নিন কার্যকারী উপায়
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৭ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অপর্যাপ্ত ঘুমের ফলে শরীরে যে ঘুমের ঘাটতি তৈরি হয়, তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্লিপ ডেট বলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের সুস্থতায় প্রতিনিয়ত আমাদের ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে রাতের ঘুম আমাদের শরীরে জন্য বেশ কার্যকরী। অনেকে মনে করেন, প্রতিদিন রাত জেগে কাজ করে সপ্তাহে ছুটির দিন বেশি করে ঘুমিয়ে নিলে ঘুমের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। তবে ঘুমের ঘাটতি কি এই প্রক্রিয়ায় আসলেই পূরণ সম্ভব?
ঘুম বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই ধারণা সম্পূর্ন ভুল। এই অভ্যাস মানুষের দেহের মেটাবলিজমকে মারাত্মকভাবে ওলটপালট করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, সারা সপ্তাহ কম ঘুমিয়ে ছুাটর দিনে বেশি ঘুমিয়ে নিলে সাময়িক আরাম লাগে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কে এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
মস্তিষ্ক স্লিপ টাইমার হিসেবে কাজ করে
মস্তিষ্কের স্লিপ টাইমার বলতে মূলত আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমকে বোঝায়। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত সুপ্রাকায়াজমেটিক নিউক্লিয়াস নামের একটি বিশেষ অংশ এই টাইমারটি নিয়ন্ত্রণ করে। এটি আমাদের কখন ঘুমাতে হবে এবং কখন জেগে উঠতে হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে।
মার্কিন গবেষক এ. এল. হেউডের মতে, মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই অভ্যান্তরীণ স্লিপ টাইমার বা ঘুম ঘড়ি হিসেবে কাজ করে। মানুষ যতক্ষণ জেগে থাকে, মগজের কোষ অনবরত অ্যাডোনোসিন নামক এক বিশেষ রাসায়নিক হরমোন জমা হতে থাকে। যা শরীরে স্লিপ প্রেসার বা ঘুমের চাপ তৈরি করে। এই প্রাকৃতিক স্লিপ টাইমারটি যেভাবে কাজ করে—
সন্ধ্যা বা রাতের দিকে যখন চারপাশ অন্ধকার হতে শুরু করে, তখন মস্তিষ্ক মেলাটোনিন নামের একটি হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। এই হরমোনটি শরীরকে সংকেত দেয় যে এখন ঘুমানোর সময় হয়েছে। আবার সকালের আলো ফুটলে এই হরমোনের ক্ষরণ কমে যায় এবং আমাদের ঘুম ভেঙে যায়।
আধুনিক জীবনে কিছু অভ্যাসের কারণে আমাদের মস্তিষ্কের এই প্রাকৃতিক টাইমারটি এলোমেলো হয়ে যায় যেমন—
১. স্ক্রিন টাইম: ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা টিভির নীল আলো (Blue light) মস্তিষ্ককে বিভ্রান্ত করে। মস্তিষ্ক তখন রাতকে দিন মনে করে মেলাটোনিন তৈরি বন্ধ করে দেয়।
২. অনিয়মিত ঘুমের সময়: প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠা।
৩. স্ট্রেস বা মানসিক চাপ: অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়, যা স্লিপ সাইকেলকে বাধাগ্রস্ত করে।
ঘুমের ঘাটতি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়
* ঘুম কম হলে শরীরে এন্ড্রোক্রাইন বা হরমোন প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। এটি ক্ষুধা বাড়োনোর হরমোন গ্রেলিন কে বাড়িয়ে দেয় এবং পেট ভরা থাকার হরমোন লেপটিনকে স্তব্ধ করে দেয়। ফলে শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমে।
* ২০২৪-২০২৬ সালের একাধিক জরিপে প্রমাণিত হয়েছে, ক্রনিক স্লিপ ডেট শরীরের কোষের সংবেদনশীলতা ধ্বংস করে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে, যা টাইপ-২ ডায়বেটিসের প্রধান কারণ।
* পর্যাপ্ত পরিমানে ঘুম না হলে আমাদের রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে ধমনীর ওপর চাপ বাড়ে, যা দীর্ঘস্থায়ী রক্তচাপ, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
* গভীর ঘুমের সময় মগজের কোষে সারাদিনে জমা হওয়া বর্জ্য ও ক্ষতিকর প্রোটিন প্রাকৃতিকভাবে ধুয়ে সাফ হয়ে যায়। তবে কারো যদি দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের ঘাটতি হয় তাহলে মস্তিষ্ক ক্ষতিকর প্রোটিন সাফ করার সুযোগ পায় না। ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়।
* ঘুমের ঘাটতি মেজাজকেও খিটখিটে করে তোলে।
ছুটির দিনে বেশি ঘুম কি ঘাটতি পূরণ করতে পারে
ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমালে সাময়িক ক্লান্তি দূর হয় এবং অল্প সময়ের ঘুমের ঘাটতি কিছুটা পূরণ হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়োদী ক্ষতি সম্পূর্ণ পোষায় না।
ছুটির দিনের ঘুমের প্রভাব
১. সাময়িক স্বস্তি: ছুটির দিনে অতিরিক্ত ১ থেকে ২ ঘণ্টা ঘুমালে শরীর ও মন কিছুটা বিশ্রাম পায়।
২ .রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: গবেষণায় দেখা গেছে, ছুটির দিনে বাড়তি ঘুম উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সাহায্য করে।
৩. পূর্ণ ঘাটতি পূরণ হয় না: কাজের ব্যস্ততার পুরো সপ্তাহের জমানো দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ঘাটতি ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমিয়ে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
সহজে ঘুমিয়ে পড়ার টিপস
১. প্রতিদিন রাতে হুট করেই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়বেন না। ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করুণ।
২. ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন, দেখবেন ঘুম আপনাআপনি চলে আসবে।
৩. রুম পর্যাপ্ত পরিমানে অন্ধকার আছে কিনা নিশ্চিত করুণ।
৪. ঘুমের সময় যেনো মস্তিষ্কের ওেকাষ পানিশূণ্য হয়ে না পড়ে সেজন্য সারাদিন বিশুদ্ধ পানি বেশি পরিমানে পান করুণ।
