আক্কেল দাঁত কেন ওঠে, এত ব্যথা কেন হয়?
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মুখের একেবারে পেছনে সবার শেষে যে দাঁতটি গজায়, সেটিই আক্কেল দাঁত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর নাম ‘থার্ড মোলার’ বা তৃতীয় পেষণ দাঁত। সাধারণত কৈশোর পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময়ে, অর্থাৎ মানুষের বিচারবুদ্ধি পরিণত হওয়ার বয়সে এটি ওঠে বলে বাংলায় এর নাম হয়েছে ‘আক্কেল দাঁত’; ইংরেজিতে বলা হয় ‘উইজডম টুথ’। কারও ক্ষেত্রে দাঁতটি কোনো সমস্যা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে গজালেও অনেকের জন্য এটি তীব্র ব্যথা, মাড়ির প্রদাহ ও নানা ধরনের জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন এবং যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস) বলছে, সাধারণত ১৭ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে আক্কেল দাঁত মাড়ি ভেদ করে বের হতে শুরু করে। তবে কখনো কখনো আরও পরিণত বয়সেও এটি উঠতে পারে।
একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ওপর ও নিচের চোয়ালের চার কোণে মোট চারটি আক্কেল দাঁত থাকার কথা থাকলেও সবার ক্ষেত্রে সবগুলো গজায় না। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০ জনের মধ্যে অন্তত আটজনের এক বা একাধিক আক্কেল দাঁত থাকে না।
মানবদেহের বিবর্তনের দৃষ্টিতে আক্কেল দাঁতকে অনেকটা অবশিষ্ট বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়। আদিম মানুষের খাদ্যতালিকায় শক্ত ফলমূল, বীজ ও কাঁচা মাংসের মতো খাবারের আধিক্য ছিল। এসব খাবার চিবিয়ে ছোট করতে অতিরিক্ত মোলার দাঁতের প্রয়োজন হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রান্নার প্রচলন ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে মানুষের চোয়ালের আকারও বিবর্তনের ধারায় ছোট হয়েছে। ফলে আধুনিক মানুষের চোয়ালে আক্কেল দাঁত স্বাভাবিকভাবে গজানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা অনেক সময় থাকে না।
এই জায়গার সংকটই আক্কেল দাঁতের নানা সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ। পর্যাপ্ত স্থান না পেলে দাঁতটি মাড়ি বা চোয়ালের হাড়ের মধ্যে আংশিক কিংবা পুরোপুরি আটকে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন দাঁতকে ‘ইমপ্যাক্টেড টুথ’ বলা হয়। আবার দাঁত আংশিক বের হয়ে এলে তার ওপরের মাড়ির ফাঁকে খাবারের কণা ও জীবাণু আটকে সংক্রমণ এবং প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এই অবস্থার নাম ‘পেরিকোরোনাইটিস’।
এর ফলে মাড়িতে প্রচণ্ড ব্যথা ও ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি দাঁতে ক্যাভিটি, দাঁতের গোড়ায় সিস্ট বা পুঁজ তৈরি হওয়া এবং পাশের সুস্থ দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। অর্থাৎ শুধু আক্কেল দাঁতটিই নয়, আশপাশের দাঁত ও মাড়ির জন্যও এটি সমস্যার কারণ হতে পারে।
দন্ত চিকিৎসকরা জানান, চোয়ালের গঠন ও দাঁতের অবস্থান অনুকূলে থাকলে আক্কেল দাঁত কোনো বড় ধরনের সমস্যা ছাড়াই উঠে আসতে পারে। কিন্তু জায়গার অভাবে দাঁত আটকে গেলে তীব্র ব্যথার পাশাপাশি মুখ পুরোপুরি খুলতে কিংবা খাবার গিলতেও রোগীর সমস্যা হতে পারে।
তিনি আরও জানান, মাড়ির এই সংক্রমণ দীর্ঘদিন চিকিৎসার বাইরে থাকলে বিরল ক্ষেত্রে মুখ ও গলার গভীর অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি ‘লুডউইগস অ্যাঞ্জাইনা’র মতো গুরুতর ও প্রাণঘাতী সংক্রমণও হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে সব আক্কেল দাঁতই যে তুলে ফেলতে হবে, এমন নয়। দাঁতটি যদি স্বাভাবিকভাবে ওঠে এবং কোনো ব্যথা, সংক্রমণ বা অন্য জটিলতা তৈরি না করে, তাহলে সাধারণত তা অপসারণের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বারবার সংক্রমণ হওয়া, তীব্র ব্যথা সৃষ্টি করা কিংবা পাশের দাঁতের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আক্কেল দাঁত তুলে ফেলার পরামর্শ দিতে পারেন।
সাধারণত স্থানীয়ভাবে অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করে মাড়ির ওই অংশ অবশ করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এই অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। তবে অপসারণের পর সম্পূর্ণ সুস্থ হতে ব্যক্তিভেদে কয়েক দিন থেকে প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এই সময়ে ক্ষত দ্রুত সারাতে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়ম মেনে খাওয়ার পাশাপাশি কুসুম গরম লবণপানি দিয়ে মুখ পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। শক্ত খাবারের পরিবর্তে নরম বা তরল খাবার খাওয়াও উপকারী। একই সঙ্গে ক্ষতস্থানে রক্ত জমাট বাঁধার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্য ধূমপান ও শক্ত খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি। তা না হলে ‘ড্রাই সকেট’ তৈরি হতে পারে—ক্ষতস্থানের রক্তের জমাট সরে গিয়ে যে অবস্থায় তীব্র ও যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা দেখা দেয়।

