ওজেম্পিক কি ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে? গবেষণা যা বলছে
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ ওজেম্পিক ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে—সম্প্রতি এমন দাবি ঘিরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে চিকিৎসা গবেষণার বর্তমান প্রমাণ বলছে, এসব ওষুধ ক্যানসার প্রতিরোধ করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।
আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির ২০২৬ সালের বার্ষিক সভাকে ঘিরে জিএলপি-১ ওষুধ এবং ক্যানসার নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা সামনে আসে। লাখ লাখ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা এসব গবেষণার কয়েকটিতে জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কম দেখা গেছে।
ক্যানসার নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল। কারণ ক্যানসার শুধু একটি রোগ নয়; এর শতাধিক ধরন রয়েছে। স্তন, ফুসফুস বা রক্তের ক্যানসারের কারণ, জীববৈশিষ্ট্য ও ঝুঁকি এক নয়। ফলে কোনো একটি ওষুধ সব ধরনের ক্যানসারের ওপর একই প্রভাব ফেলবে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
শুরুতে ছিল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা
জিএলপি-১ ওষুধ ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে—এমন আলোচনার আগে উলটো আশঙ্কাই ছিল। গবেষকদের উদ্বেগ ছিল, এসব ওষুধ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে কিনা।
বিশেষ করে থাইরয়েড ক্যানসার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ইঁদুরের ওপর গবেষণায় ওজেম্পিকের কারণে থাইরয়েডের সি-সেল টিউমার দেখা যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওষুধটির ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করে। তবে ইঁদুরের ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। মানুষের থাইরয়েডের সি-সেলে জিএলপি-১ রিসেপ্টরের সংখ্যা ইঁদুরের তুলনায় অনেক কম।
২০২৫ সালে ৯৩টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় নির্দিষ্ট কিছু জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারের সঙ্গে থাইরয়েড ক্যানসারের স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছায় ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাও।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ ছিল। তবে ২০২৫ সালে ৬২টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারের সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার কোনো ধারাবাহিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমার ইঙ্গিত
পরবর্তী সময়ে গবেষণার ফলাফল কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ২০২৪ সালে ১৬ লাখের বেশি টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীর ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের তুলনায় জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্থূলতাসংশ্লিষ্ট ১৩ ধরনের ক্যানসারের মধ্যে ১০টির হার কম।
২০২৫ সালের প্রায় ৮৭ হাজার প্রাপ্তবয়স্কের ওপর করা আরেক গবেষণায় জিএলপি-১ ওষুধ গ্রহণকারীদের সামগ্রিক ক্যানসারের হার প্রায় ১৭ শতাংশ কম পাওয়া যায়। বিশেষ করে জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার এবং মেনিনজিওমা নামের এক ধরনের মস্তিষ্কের টিউমারের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে একই গবেষণায় জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারীদের কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি ৩৮ শতাংশ বেশি দেখা যায়। এ ফল নিশ্চিত করতে আরও বড় গবেষণা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের আরেক গবেষণায় স্তন পরীক্ষা করানো ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।

শুধু ক্যানসারের ঝুঁকি নয়, ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর রোগীদের বেঁচে থাকার ওপরও জিএলপি-১ ওষুধের প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় ৬ হাজার ৮০০-এর বেশি কোলন ক্যানসার রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে পাঁচ বছরের মধ্যে মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ছয় ধরনের ক্যান্সারে জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারীদের মৃত্যুঝুঁকি ৩৪ শতাংশ কম পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
গবেষণার ফল এত সহজে ভুল বোঝার কারণ
গবেষকদের মতে, জিএলপি-১ ওষুধ ও ক্যানসার নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও এগুলো ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রথম কারণ হলো ‘হেলদি ইউজার বায়াস’। যারা জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহার করেন, তারা অনেক সময় তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসচেতন, চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ নেন এবং ওষুধ কেনার সামর্থ্য রাখেন। ফলে তাদের ক্যানসারের ঝুঁকি কম হওয়ার পেছনে ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাপন, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বা আর্থিক সক্ষমতার মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিতীয় বিষয় হলো তুলনার জন্য কোন ওষুধ বা রোগীদের দলকে বেছে নেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের তুলনায় জিএলপি-১ ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্যানসারের ঝুঁকি কম দেখা যায়। কিন্তু একই তথ্য মেটফরমিন ব্যবহারকারীদের সঙ্গে তুলনা করলে ক্যানসারের ঝুঁকি কমার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এর কারণ হিসেবে গবেষকরা বলছেন, ইনসুলিন সাধারণত অপেক্ষাকৃত জটিল বা অগ্রসর ডায়াবেটিসের রোগীদের দেওয়া হয় এবং ডায়াবেটিস নিজেই ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে শুরুতেই বেশি ঝুঁকিতে থাকা একটি দলের সঙ্গে তুলনা করলে অন্য ওষুধকে ক্যানসার প্রতিরোধী বলে মনে হতে পারে।
তৃতীয় বিষয় হলো সময়। ক্যানসার তৈরি হতে অনেক বছর, এমনকি কয়েক দশকও লাগতে পারে। অথচ জিএলপি-১ ওষুধ নিয়ে অধিকাংশ গবেষণায় রোগীদের কয়েক বছর বা তারও কম সময় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিছু গবেষণায় ওষুধ শুরু করার পরপরই ক্যানসারের ঝুঁকি কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কোনো ওষুধ ক্যানসার প্রতিরোধ করলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে প্রকাশ পাওয়ার কথা।
ট্রায়ালে কী দেখা গেছে?
গবেষণার বিভিন্ন পক্ষপাত এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো র্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। এতে শুরু থেকেই রোগীদের বিভিন্ন দলে এলোমেলোভাবে ভাগ করা হয়, ফলে তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য ফল পাওয়া যায়।
২০২৫ সালে প্রকাশিত দুটি মেটা-বিশ্লেষণে যথাক্রমে ৫০টি ও ৪৮টি ট্রায়ালের তথ্য একত্র করা হয়। এসব বিশ্লেষণে জিএলপি-১ ওষুধ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় বা কমায়—এমন শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে এসব গবেষণারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বেশির ভাগ ট্রায়ালে রোগীদের এক থেকে দুই বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং ক্যানসারের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে ক্যানসারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই।
গবেষকদের মতে, জিএলপি-১ ওষুধ ক্যানসারের ঝুঁকিতে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা নিশ্চিত করতে কয়েক দশক ধরে কয়েক হাজার নয়, বরং কয়েক দশ হাজার মানুষকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি র্যান্ডমাইজড গবেষণা প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য কী?
বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে সবচেয়ে আশ্বস্ত হওয়ার মতো বিষয় হলো—জিএলপি-১ ওষুধ সামগ্রিকভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় বলে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তবে এসব ওষুধ ক্যানসার প্রতিরোধ করে বা ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়—এমন দাবি এখনো প্রমাণিত নয়।
জিএলপি-১ ওষুধের কোনো ক্যানসার-প্রতিরোধী প্রভাব থাকলেও সেটি ওজন কমার কারণে, বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতির কারণে, নাকি প্রদাহ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা টিউমারের ওপর সরাসরি প্রভাবের কারণে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তাই ওজেম্পিক বা অন্য কোনো জিএলপি-১ ওষুধকে ক্যানসার প্রতিরোধের ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করার মতো পর্যায়ে গবেষণা এখনো পৌঁছায়নি। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা আশাব্যঞ্জক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী প্রমাণ প্রয়োজন।
