অভ্যাস নাকি মানসিক রোগ ‘ওসিডি’? মুক্তি পাবেন যেভাবে
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের মধ্যে কিছু বিশেষ আচরণ প্রায়ই দেখা যায়। হয়তো খেয়াল করেছেন—কেউ বারবার গিয়ে দরজার লক চেক করছেন, হাত ধোয়ার পরও কয়েকবার হাত ধুতে যাচ্ছেন, টেবিলের কলম বা বইগুলো একদম নিখুঁতভাবে সারিবদ্ধ না করা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছেন না, কিংবা নির্দিষ্ট কোনো জিনিস বারবার স্পর্শ করছেন।
প্রথম দেখায় এগুলোকে অতি-সচেতনতা, অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা কিংবা নেহাত কোনো অদ্ভুত অভ্যাস মনে হতে পারে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটাও সাধারণ নয়।
অনেকের জন্য এটি শুধু পছন্দের ব্যাপার বা সাধারণ অভ্যাস নয়, বরং এটি হতে পারে ‘অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার’ বা ওসিডি নামক এক ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থার লক্ষণ।
ওসিডি আসলে কী?
ওসিডি বিষয়টি বুঝতে হলে এর দুটি দিক সম্পর্কে জানা জরুরি- অবসেসন এবং কম্পালশন।
অবসেসন (অযাচিত চিন্তা বা ভয়): এগুলো হলো মনের মধ্যে বারবার ভেসে ওঠা অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা, ভয় বা অস্বস্তিকর অনুভূতি। যেমন—‘আমার হাত হয়তো এখনো অপরিষ্কার’, ‘আমি কি ঘরের দরজায় ঠিকমতো তালা লাগিয়েছি?’, কিংবা ‘খারাপ কিছু ঘটে যাবে না তো?’
কম্পালশন (পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ): মনের সেই তীব্র উদ্বেগ বা ভয় থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে ব্যক্তি যে কাজটি বারবার করতে বাধ্য হন। যেমন—বারবার হাত ধোয়া, বারবার লক বা গ্যাসের সুইচ পরীক্ষা করা, কিংবা মনে মনে নির্দিষ্ট কোনো কথা বলা।
মনের মধ্যে বারবার ভেসে ওঠা অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা বা ভীতি মানুষকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে ফেলে দেয়। সেই তীব্র উদ্বেগ থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে ব্যক্তি বাধ্য হয়ে বারবার একই কাজ করতে থাকেন। এর ফলে এক অদৃশ্য চক্র তৈরি হয়—অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা থেকে তীব্র উদ্বেগ, সেই উদ্বেগ কমাতে বারবার একই কাজ করা, আর তা থেকে সাময়িক স্বস্তি মেলা মাত্রই আবার সেই চিন্তা ফিরে আসা। সময়ের সাথে সাথে ব্যক্তির অজান্তেই এই চক্রটি গভীর হতে থাকে এবং একসময় তা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাধারণ অভ্যাস নাকি ওসিডি?
প্রতিটি অভ্যাস বা গোছানো ভাবই ওসিডি নয়। অনেকেই ঘর গুছিয়ে রাখতে ভালোবাসেন, কিংবা বের হওয়ার সময় দরজার লক একবারের জায়গায় দুবার নিশ্চিত হয়ে নেন। এটি একেবারেই স্বাভাবিক।
সমস্যা তখন, যখন এই চিন্তার ওপর মানুষের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কাজগুলো না করা পর্যন্ত মন প্রচণ্ড অস্থির থাকে এবং এগুলো দৈনন্দিন জীবনের প্রচুর সময় নষ্ট করে।
বিশেষ করে যখন এটি কারো কাজ, পড়াশোনা, পরিবার বা সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখনই এটি ওসিডির রূপ নেয়।
ওসিডির নানা রূপ
ওসিডি শুধু হাত ধোয়া বা পরিচ্ছন্নতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একেকজনের ক্ষেত্রে একেকভাবে দেখা দিতে পারে:
নিখুঁত করার তাড়না: জিনিসপত্র নির্দিষ্ট নিয়মে না সাজালে বা কোনো কিছু স্পর্শ করার সময় দুই পাশে সমানভাবে না ছুঁলে ভেতরে তীব্র অসম্পূর্ণতার অনুভূতি (যাকে ‘জাস্ট রাইট’ অনুভূতি বলা হয়) হওয়া।
অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভীতিজনক ভাবনা: হঠাৎ করে নিজের প্রিয় কোনো মানুষের ক্ষতি করার ভয়, কিংবা নিজের নৈতিকতা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো ভাবনা মাথায় আসা।
আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে এই চিন্তাগুলো মোটেও চান না, তাই এগুলো তাদের মনে গভীর অপরাধবোধ ও লজ্জা তৈরি করে।
ধর্মীয় ও নৈতিক উৎকণ্ঠা: ধর্মীয় কোনো নিয়ম বা আচার সঠিকভাবে পালন হয়েছে কিনা, তা নিয়ে অতিরিক্ত সন্দেহ তৈরি হওয়া এবং তা দূর করতে বারবার একই দোয়া বা কাজ রিপিট করা।
কেন হয় এমনটা?
ওসিডি হওয়ার পেছনে কোনো একক কারণ নেই। এটি হতে পারে—
- জিনগত বা বংশগত কারণ
- মস্তিষ্কের গঠন ও রাসায়নিক উপাদানের তারতম্য
- তীব্র মানসিক চাপ বা অতীতের কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা (ট্রমা)
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো মানসিক দুর্বলতা বা ‘খারাপ ইচ্ছে’ নয়। ওসিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও অনেক সময় বুঝতে পারেন যে তার এই আচরণগুলোর কোনো যুক্তি নেই, কিন্তু তীব্র উদ্বেগের কারণে তিনি নিজেকে থামাতে পারেন না।
ওসিডির কী চিকিৎসা রয়েছে?
স্বস্তির বিষয় হলো, এটি পুরোপুরি নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সাইকোথেরাপির বিশেষ পদ্ধতি ‘এক্সপোজার অ্যান্ড রেসপন্স প্রিভেনশন’ এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে মানুষ এই ওসিডির চক্র থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
পরিবার ও আশেপাশের মানুষের সহানুভূতি এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। কাউকে বারবার এমন করতে দেখলে ‘তুমি চাইলেই তো বন্ধ করতে পারো’ বলে চাপ দেওয়া বা ঠাট্টা করা একেবারেই অনুচিত। বরং আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক কষ্টকে গুরুত্ব দিয়ে এবং কোনো প্রকার লজ্জা না পেয়ে তাকে দ্রুত একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে উৎসাহিত করা উচিত।

