জন্মের প্রথম ৭২ ঘণ্টায় শিশুর থাইরয়েড পরীক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ও মেধার বিকাশ নিশ্চিত করতে জন্মের পরপরই থাইরয়েড পরীক্ষা করা জরুরি। জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণে নবজাতকের শরীরে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি দেখা দিলে তার শারীরিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু না করলে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে জন্মের পর দ্রুত পরীক্ষা ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা সম্ভব।
চিকিৎসকদের মতে, জন্মের পর প্রথম কয়েক বছরে শিশুর মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে। এ ক্ষেত্রে থাইরয়েড হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। থাইরয়েড গ্রন্থি যথাযথভাবে গঠিত না হলে কিংবা হরমোন উৎপাদনে সমস্যা থাকলে জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে। এ ছাড়া আয়োডিনের ঘাটতি, কিছু ওষুধের প্রভাব এবং জিনগত কারণেও থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, শিশুদের থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি হলে স্বাভাবিক বৃদ্ধি, উচ্চতা, বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্নায়বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ঘুম, খেতে অনীহা, ওজন বৃদ্ধিতে অস্বাভাবিকতা, দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস, কোষ্ঠকাঠিন্য, ত্বকের সমস্যা ও পেট ফুলে যাওয়া। কিছু শিশুর বয়ঃসন্ধি আসতেও দেরি হতে পারে।
তিনি জানান, থাইরয়েডের সমস্যা প্রধানত দুই ধরনের—হাইপোথাইরয়েডিজম, অর্থাৎ হরমোনের ঘাটতি এবং হাইপারথাইরয়েডিজম, অর্থাৎ অতিরিক্ত হরমোন নিঃসরণ। শিশুদের ক্ষেত্রে হরমোনের ঘাটতিজনিত সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মস্তিষ্কের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চিকিৎসা না হলে পরবর্তী সময়ে ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব নবজাতকের থাইরয়েড স্ক্রিনিং করা উচিত। সাধারণত জন্মের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রক্তে থাইরয়েড-উদ্দীপক হরমোন (টিএসএইচ) পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্রি থাইরক্সিন (এফটি৪) পরীক্ষাও করা হয়। অকালজাত, কম ওজনের কিংবা গুরুতর অসুস্থ নবজাতকের ক্ষেত্রে প্রথম পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক হলেও চিকিৎসকের পরামর্শে পুনরায় পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
মায়ের থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে, পরিবারে জন্মগত থাইরয়েড রোগের ইতিহাস থাকলে, নবজাতকের জন্ডিস দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে কিংবা শিশুর মধ্যে সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি। তবে শুধু উপসর্গের অপেক্ষায় না থেকে সব নবজাতকের স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাজহারুল হক তানিম জানান, হাইপোথাইরয়েডিজমে থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না। এই হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃদস্পন্দন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে।
জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লেভোথাইরক্সিন ওষুধ দিতে হয়। শিশুর ওজন, বয়স ও পরীক্ষার ফল অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শে মাত্রা সমন্বয় করতে হয়। অনেক শিশুর দীর্ঘমেয়াদি, এমনকি আজীবন চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নবজাতকের থাইরয়েড পরীক্ষা সহজলভ্য করা এবং এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। জন্মের পরপরই রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি, মেধার বিকাশ ও সুস্থ জীবনযাপনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

