‘অন ক্যামেরা’ অভিযানে জেরা, আইন কী বলে?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অভিযান চালানো, জিজ্ঞাসাবাদ ও অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা থাকলেও ক্যামেরার সামনে কাউকে হেয় করা কিংবা বিচার শেষ হওয়ার আগেই অপরাধী হিসেবে উপস্থাপনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার বিবেচনায় অভিযান ও জেরার ভিডিও ধারণ এবং তা প্রচারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, বাসা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলাকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ক্যামেরার সামনে নানা প্রশ্ন করা হচ্ছে। তার বক্তব্য ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও প্রকাশ করা হচ্ছে পরিচয়ও। একইভাবে চেকপোস্টে যাত্রী ও মোটরসাইকেলচালকদের জিজ্ঞাসাবাদের দৃশ্য ধারণ করে অনলাইনে প্রচারের ঘটনাও দেখা যায়। এ ধরনের কার্যক্রমের আইনগত সীমা কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজ্ঞরা।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম আদালতের নিয়ম ও শিষ্টাচার মেনে পরিচালনা করতে হয়। সাধারণত আদালতের অনুমতি ছাড়া আদালতকক্ষে ভিডিও বা অডিও ধারণের সুযোগ নেই। কেউ অনুমতি ছাড়া এমন কাজ করলে তা আদালত অবমাননার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন।
অভিযান ও তল্লাশিতে আইনের বিধান
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৬৫ ধারায় তদন্তের প্রয়োজনে নির্দিষ্ট শর্তে পুলিশকে তল্লাশির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে তল্লাশির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যুক্তিসংগত ভিত্তি থাকতে হবে এবং আইন নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা থাকলেই তা যেকোনো পদ্ধতিতে পরিচালনা কিংবা অভিযানের দৃশ্য নির্বিচারে প্রচারের অধিকার তৈরি হয় না।
সংবিধানে গোপনীয়তার অধিকার
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকের গৃহ ও যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার স্বীকৃত। ফলে কোনো ব্যক্তির বাসা বা ব্যক্তিগত পরিসরে অভিযান পরিচালনা এবং সেই অভিযানের দৃশ্য ধারণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে আইনগত ভিত্তি ও ব্যক্তিগত অধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬২ ধারায় তদন্তের সময় পুলিশ কর্তৃক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং সেই বক্তব্য ব্যবহারের বিষয়ে বিধান রয়েছে। পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যের আইনি ব্যবহার সীমিত। ১৬৪ ধারায় নির্ধারিত শর্তে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তি বা বক্তব্য রেকর্ড করা যায়।
ভিডিও ধারণ ও প্রচার কি এক বিষয়?
তদন্তের প্রয়োজনে ভিডিও ধারণ করে প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা আলাদা বিষয়। প্রথমটির যৌক্তিকতা নির্ভর করে তদন্তের প্রয়োজন ও আইনগত ভিত্তির ওপর। অন্যদিকে, ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা, সম্মতি এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খায়ের মাহমুদ বলেন, আইন প্রয়োগের অংশ হিসেবে ভিডিও ধারণ করা হলেও তা গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া আইন প্রয়োগের অংশ হতে পারে না। প্রকাশ্য স্থানে ভিডিও ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশের আইনে স্পষ্টতার অভাব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো আসিফ বিন আলী বলেন, পুলিশের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার থাকলেও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে থাকা ব্যক্তির মুখ দেখানো সব সময় প্রয়োজনীয় নয়। জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ এবং ব্যক্তিগত কৌতূহল মেটানোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
অনুমতি ছাড়া ভিডিও করলে কী হবে?
ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন, কেউ মোবাইল কোর্টের অভিযানের ছবি তুলতে বা ভিডিও করতে চাইলে জেলা প্রশাসক কিংবা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণের মাধ্যমে ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে।
চেকপোস্টে জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও ধারণ ও প্রচারের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, বিভিন্ন ইউটিউবার ও গণমাধ্যমে চেকপোস্টে জিজ্ঞাসাবাদের দৃশ্য প্রচার করা হয়। যাত্রী বা মোটরসাইকেলচালকদের অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ করে তা প্রচার করা আইনগত প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিধানও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, একজন নাগরিককে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এর মুখোমুখি করা কোনোভাবেই সাংবিধানিক চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

