দুধ বা চিনি নয়, কফি খাওয়ার অভ্যাসে বিপদ বাড়াচ্ছে অন্য যে উপাদান
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সকালের রুটিনে এক কাপ কফি ঘুম জড়ানো ভাব কাটিয়ে চনমনে করে তুলতে জাদুকরি কাজ করে। অতিরিক্ত কোনো কিছু না মিশিয়ে পরিমিত কফি পান করলে তা সুষম ডায়েটেরও অংশ হতে পারে। তবে কফির কাপে চুমুক দেওয়ার আগে তাতে কী মিশিয়ে খাচ্ছেন, তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
সাধারণত অতিরিক্ত ক্যালোরির জন্য চিনি ও দুধকে দায়ী করা হলেও, নতুন একটি গবেষণায় এমন এক উপাদানের নাম উঠে এসেছে যা মানুষের ধারণার চেয়েও বেশি ক্যালোরি যোগ করছে।
আমেরিকান একাডেমি অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটিকস-এর জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় প্রায় ৩০ হাজার আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এতে দেখা গেছে, ২০০৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কফি থেকে মানুষের ক্যালোরি গ্রহণের মাত্রা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এই সময়ে মানুষের গড়ে কফি খাওয়ার পরিমাণ প্রায় একই ছিল। গবেষকদের মতে, কফিতে নন-ডেইরি ক্রিমার বা দুধের বিকল্প উপকরণের ব্যবহার বেড়ে যাওয়াই এর মূল কারণ।
গবেষণায় কী উঠে এসেছে?
টফটস ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ২০০৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইউএস ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভের আটটি ধাপের ডাটা বিশ্লেষণ করেছেন। এতে ২০ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের খাবারের তালিকা খতিয়ে দেখা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, সে সময় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৮০ মিলিলিটার কফি পান করতেন। অথচ কফি থেকে প্রতিদিন গড়ে ক্যালোরি গ্রহণের মাত্রা ৪৩ থেকে বেড়ে ৬০-এ দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি।
২০১৮ সালের মধ্যে নন-ডেইরি ক্রিমার কফিতে ক্যালোরি যোগ করার ক্ষেত্রে চিনি ও গরুর দুধকে ছাড়িয়ে শীর্ষে চলে আসে। চিনি ও দুধকে পেছনে ফেলে নন-ডেইরি ক্রিমার থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৮.৫ ক্যালোরি যোগ হচ্ছিল, যেখানে চিনি থেকে ১৬ ক্যালোরি এবং ডেইরি মিল্ক থেকে ১১ ক্যালোরি আসত।
গবেষকরা বলছেন, এই পরিবর্তনের কারণ মানুষ বেশি কফি পান করা শুরু করেছে তা নয়, বরং কফিতে যে উপকরণগুলো মেশানো হচ্ছে তার ধরন বদলে গেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং ফ্রিডম্যান স্কুলের পিএইচডি গবেষক ইয়ংয়ি পান বলেন, ‘আমরা দেখতে পেয়েছি যে কফিতে নন-ডেইরি ক্রিমার ব্যবহারের পরিমাণ এখন চিনি ও দুধ উভয়কেই ছাড়িয়ে গেছে। নন-ডেইরি ক্রিমারে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা সম্পৃক্ত চর্বি থাকতে পারে, যা ক্যালোরিতে ভরপুর। এটিই কফিতে ক্যালোরি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। ১৯৫০-এর দশক থেকে বাজারে থাকলেও, উদ্ভিদভিত্তিক বা ডেইরি-মুক্ত বিকল্প খোঁজার প্রবণতা বাড়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে।’
নন-ডেইরি ক্রিমারে কেন ক্যালোরি বেশি থাকে?
নন-ডেইরি ক্রিমার এমন কিছু পণ্য যা গরুর দুধ ব্যবহার না করেই কফিকে আরও ক্রিমি বা ক্রিমিভাবযুক্ত এবং অনেক সময় মিষ্টি করে তোলে। তবে ‘ডেইরি-মুক্ত’ মানেই যে তা কম ক্যালোরিযুক্ত বা বেশি স্বাস্থ্যকর, এমনটি নয়। পণ্যের ধরন অনুযায়ী এতে উদ্ভিজ্জ তেল, অতিরিক্ত চিনি, স্টেবিলাইজার এবং পুষ্টির মান কমিয়ে দেয় এমন নানা উপাদান থাকতে পারে।
এগুলোর মধ্যে কিছু ক্রিমারে ক্ষতিকর চর্বি থাকে, যা প্রোটিন বা কার্বোহাইড্রেটের তুলনায় প্রতি গ্রামে বেশি ক্যালোরি সরবরাহ করে। তাই প্রতিদিন কফিতে কয়েক চামচ ক্রিমার মেশালে ক্যালোরি গ্রহণের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৩ সালে প্রতিদিন গড়ে নন-ডেইরি ক্রিমার খাওয়ার পরিমাণ ছিল ৩.৪ গ্রাম, যা ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৮ গ্রামে। এ কারণেই কফিতে ক্রিমার ক্যালোরির একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে।
নন-ডেইরি ক্রিমার কি দুধ বা চিনির চেয়েও ক্ষতিকর?
গবেষণায় কেবল আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্কদের কফিতে বিভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে ক্যালোরি যুক্ত হওয়ার গড়ের তুলনা করা হয়েছে। এর মানে এই নয় যে প্রতিটি নন-ডেইরি ক্রিমারই অস্বাস্থ্যকর কিংবা দুধ ও চিনি সব সময়ই ভালো বিকল্প।
সাধারণ দুধে প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও নানা পুষ্টি উপাদান থাকে। পক্ষান্তরে চিনি মূলত উল্লেখযোগ্য কোনো পুষ্টিগুণ ছাড়াই শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করে। নন-ডেইরি ক্রিমারগুলোর উপাদান একেক রকম হতে পারে—কখনো এতে অতিরিক্ত চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, আবার কোনো কোনোটিতে ভিন্ন পুষ্টিগুণ থাকে।
এখানে মূল বিষয় হলো পণ্যের উপাদান তালিকা, পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য এবং ব্যবহারের পরিমাণ। একটি ক্রিমার অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলে অন্যটির বেশি পরিমাণের চেয়ে কম ক্যালোরি যোগ করতে পারে।
সকালে আপনার কফিকে কীভাবে আরও স্বাস্থ্যকর করবেন?
সকালের পছন্দের পানীয়টি একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিছু সহজ ও বাস্তবসম্মত অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি কফিতে ক্যালোরির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন:
লেবেল চেক করুন: বিভিন্ন ক্রিমারের ক্যালোরি, অতিরিক্ত চিনি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ মিলিয়ে দেখুন। সেই সঙ্গে পরিবেশন বা পরিমাপের বিষয়টিও লক্ষ্য রাখুন।
পরিমাপ করে ব্যবহার করুন: সরাসরি কন্টেইনার থেকে কাপে ক্রিমার ঢাললে ঠিক কতটুকু ব্যবহার হচ্ছে তা বোঝা কঠিন হয়। তাই প্রথমে অল্প ও পরিমাপ করা পরিমাণ দিয়ে ব্যবহার শুরু করুন।
ধীরে ধীরে পরিমাণ কমিয়ে আনুন: আপনি যদি ক্রিমি কফি পছন্দ করেন, তবে হঠাৎ করে অভ্যাস না বদলে ক্রমান্বয়ে ক্রিমারের পরিমাণ কমিয়ে আনুন।
মিষ্টি ছাড়া বিকল্প বেছে নিন: চিনি ছাড়া উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প বা সাধারণ দুধ আপনার পছন্দের সঙ্গে মানানসই হতে পারে।
ফ্লেভারযুক্ত উপাদান সীমিত করুন: মিষ্টি করা ক্রিমার এবং বিভিন্ন ফ্লেভারযুক্ত সিরাপ কফিতে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালোরি বাড়িয়ে দেয়।

