Logo
Logo
×

Advertisement

জাতীয়

বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল

হাসিনার ইচ্ছা পূরণে অপচয় ৪৪ কোটি টাকা

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম

হাসিনার ইচ্ছা পূরণে অপচয় ৪৪ কোটি টাকা

ফাইল ছবি।

Advertisement

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আংশিক উদ্বোধনের ইচ্ছা পূরণে শুধু ফিতা কাটা ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। একই প্রকল্পে অনুমোদনহীন ব্যয়, অতিমূল্যে গাছ কেনা, ভুয়া ভেরিয়েশনসহ হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের এই ব্যয়ের ধরন ২০১৯ সালের বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘বালিশ-কাণ্ডের’ কথা মনে করিয়ে দেয়। ওই প্রকল্পে প্রতিটি বালিশের দাম ৫ হাজার থেকে ৮৯ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘চিহ্নিত অনিয়মগুলো যদি পোস্ট-ফ্যাক্টো (পরবর্তী সময়ে) অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়, তাহলে সেটি হবে আরেকটি দুর্নীতির শামিল। এখন এসব অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে বিষয়টি এমন দাঁড়াবে যে অনিয়ম করেছি, এখন সেটিকে সেটেলমেন্ট কমিটির মাধ্যমে সেটেল করে নিই।’

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের পরিবর্তে স্বাধীন তদন্ত করে অনিয়মের দায় নির্ধারণ, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় সরকারি প্রকল্পে এ ধরনের পুকুরচুরি বন্ধ হবে না।

বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কারা ভুয়া ভেরিয়েশন করেছে, কত টাকা অনিয়ম বা আত্মসাৎ হয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত-সব খতিয়ে দেখা হবে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য একটি অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে দুর্নীতির বিষয় নিয়ে অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট করা যাবে না। যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্রমতে, থার্ড টার্মিনালের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন গাছ লাগানো হয়েছে। প্রকল্প নথিতে এসব গাছের একেকটির মূল্য ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। অথচ বিমানবন্দরের আশপাশের বিভিন্ন নার্সারিতে একই ধরনের গাছ ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। আবার এ গাছ কেনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে পরিচর্যার জন্য আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা যোগ করা হয়েছে।

বিমানবন্দরসংলগ্ন নার্সারি মালিক রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এই গাছগুলোর দাম ২০০-৫০০ টাকার বেশি নয়। লাখ টাকার গাছ এগুলো নয়।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরে একাধিক দফায় সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত বিল, অনুমোদনহীন ভেরিয়েশন এবং প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়ের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এখন সেই ব্যয়কে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, থার্ড টার্মিনালে পুকুর নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে গুগল আর্থের পুরোনো স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় আগে থেকেই একটি জলাশয় ছিল। সেটিকে কিছুটা সংস্কার করে পুকুরে রূপ দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প এলাকা থেকে মাটি প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে ফেলার কথা ছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ মাটি দুই কিলোমিটারের মধ্যেই ফেলা হয়েছে। তবুও ঠিকাদারকে দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহণের বিল দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হয় ৮৩ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই চুক্তির বাইরে শেখ হাসিনার ইচ্ছা পূরণ করতে সীমিত পরিসরে উদ্বোধন (সফট ওপেনিং) করার জন্য অর্থ দেওয়া হয়। থার্ড টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে শুধু ফিতা কাটা এবং সংশ্লিষ্ট আয়োজনের জন্য ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ এ ধরনের ব্যয়ের কোনো উল্লেখ মূল চুক্তিতে ছিল না।

এছাড়া ডিজেল পাম্প সরবরাহে প্রায় ১২ কোটি টাকা, ইউপিএস সরবরাহে ৪৮ কোটি টাকার বেশি, জ্বালানি তেলে ৪১ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ডিজাইন না করা ভবনের জন্য অর্থ প্রদান, অনিশ্চিত খাত (কনটিনজেন্সি) ও মূল্য বৃদ্ধিজনিত ব্যয় (প্রাইস এসকেলেশন) থেকে প্রাপ্যতাবহির্ভূতভাবে পরামর্শকদের ওভারটাইম বিল প্রদান, অপসারণযোগ্য মাটি বিক্রি করে সরকারের কোষাগারে জমা না দেওয়ার মতো অনিয়মের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। চুক্তির বাইরে আগাম কাজের খরচ (মুভ ফরোয়ার্ড কস্ট) হিসাবে বিল পরিশোধ ও নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর নামে ঠিকাদারকে ২১৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত কাজের জন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ব্যয় করার সুযোগ থাকলেও এই প্রকল্পে প্রায় ২৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ৬৩০টি আইটেম পরিবর্তন করে (ভেরিয়েশন) প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা কোনো যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই পরিশোধ করা হয়েছে।

২০১৭ সালে গ্রহণ করা থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) ছিল এ প্রকল্পের ঠিকাদার। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশ জাইকার অর্থায়ন।

অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর গত বছর সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ডিসপিউট বোর্ড ও অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করে। তবে অভিযোগ উঠেছে, যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তাদেরই কয়েকজনকে এসব কমিটিতে রাখা হয়েছে। ফলে সরষের মধ্যে ভূত থাকায় এ তদন্ত সঠিকভাবে হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এ প্রকল্পের নকশা, ব্যয়ের প্রাক্কলন, ভেরিয়েশন এবং মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের। এসব ব্যয় ও ভেরিয়েশন তাদের সুপারিশ এবং জাইকার অনুমোদনের ভিত্তিতেই হওয়ার কথা। তাই নিরীক্ষায় উত্থাপিত প্রতিটি বিষয় প্রকল্পের নথি ও চুক্তির আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন। 

তিনি বলেন, যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে তবে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তের নামে প্রকল্প বাস্তবায়ন বা পরিচালনায় অযথা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। কারণ, দীর্ঘসূত্রতায় রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যাশিত রাজস্ব থেকেও দেশ বঞ্চিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন
চালুর আগেই ঋণের ধাক্কা

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, যথাযথ তদন্ত হলে পর্দাল আড়ালে থাকা অনেক রাঘববোয়ালের নাম বেরিয়ে আসবে। এজন্য কেউ কেউ বলতে চান, বিষয়টি নিয়ে অহেতুক টানাহেঁচড়া করলে টার্মিনালের বাকি কাজ শেষ করতে বিলম্ব হবে। 

তিনি মনে করেন, বাকি কাজ শেষ করার সঙ্গে তদন্তের কোনো সম্পর্ক নেই। কাজ তার আপন গতিতে এগিয়ে যাবে; কিন্তু নিরপক্ষে তদন্তের মাধ্যমে এই লুটপাটের মহোৎসবের সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালদের শাস্তির আওতায় আনতেই হবে। তবে দুর্ভাগ্য হলো-আমাদের দেশে কেন জানি শেষ পর্যন্ত আসল রাঘববোয়ালরা পার পেয়ে যায়।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

পায়ুপথে আমিরাত থেকে বয়ে আনল ৩ সোনার ডিম

পায়ুপথে আমিরাত থেকে বয়ে আনল ৩ সোনার ডিম

বিমানবন্দরে ‘ফায়ার-২০২৬’ জরুরি মহড়া

বিমানবন্দরে ‘ফায়ার-২০২৬’ জরুরি মহড়া

শাহজালালে জমজমের পানি নিয়ে তুলকালাম, নেপথ্যে কী

শাহজালালে জমজমের পানি নিয়ে তুলকালাম, নেপথ্যে কী

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আখতারুজ্জামানকে কারাগারে রাখার আবেদন

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আখতারুজ্জামানকে কারাগারে রাখার আবেদন

শাহজালালে বিমানকর্মীর কাছ থেকে এক কেজি স্বর্ণ উদ্ধার, আটক ২

শাহজালালে বিমানকর্মীর কাছ থেকে এক কেজি স্বর্ণ উদ্ধার, আটক ২

বিমানবন্দরে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে মারধর, মেজর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা

বিমানবন্দরে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে মারধর, মেজর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা

আরও পড়ুন

এক পয়সাও নয়ছয় সহ্য করা হবে না: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

এক পয়সাও নয়ছয় সহ্য করা হবে না: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

দেশের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকার নিশ্চিতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ: রাষ্ট্রপতি

দেশের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমঅধিকার নিশ্চিতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ: রাষ্ট্রপতি

২৪ ঘণ্টায় তিন বিভাগে বৃষ্টির আভাস

২৪ ঘণ্টায় তিন বিভাগে বৃষ্টির আভাস

দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন আইনমন্ত্রী

দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন আইনমন্ত্রী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম