ঝটিকা মিছিল থেকে অনলাইন তৎপরতা, পুলিশের ভেতরের যোগসাজশও খুঁজছে সরকার
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল, গোপন বৈঠক ও অনলাইন তৎপরতা নিয়ে নতুন করে সতর্ক হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে কয়েকশ নেতাকর্মীর ঝটিকা মিছিল এবং সেখানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে সংশ্লিষ্টদের। ঘটনার পর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ও থানার ওসি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
১১ সেপ্টেম্বর কূটনৈতিক জোন গুলশান-১ এলাকায় ওই মিছিলের ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ নেতাকর্মী একটি গলিতে জড়ো হয়ে মিছিলের চেষ্টা করেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি ককটেল উদ্ধার করা হয়। পরে এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। এ ঘটনায় ৭৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মিছিলটির বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আগাম তথ্য ছিল কি না এবং থাকলে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গুলশানের ওই ঘটনার মতো দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ঝটিকা মিছিল ও অনলাইন তৎপরতার মাধ্যমে নিজেদের সক্রিয়তা জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতাকর্মী। সীমান্তঘেঁষা জেলা এবং রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে কেন্দ্র করে কয়েক মিনিটের মিছিল করে এর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলেও সূত্রগুলো দাবি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গুলশান, উত্তরা, পিরোজপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, বরিশাল, বাগেরহাট ও নেত্রকোনায় এ ধরনের মিছিল বা মিছিলের প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপরও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো এলাকায় এমন কর্মসূচি হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। গুলশানের ঘটনার পর ডিসি ও ওসি প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে এর বাস্তব প্রয়োগও দেখা গেছে।
এদিকে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল হাসানের একটি কথোপকথন নিয়েও আলোচনা চলছে। ওই কথোপকথনে তাকে আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরবে এবং শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পরিস্থিতি বদলে যাবে—এমন বক্তব্য দিতে শোনা গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এ ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের একাংশের আশঙ্কা, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে যে দলীয়করণ হয়েছিল, তার প্রভাবের কিছু অংশ এখনো রয়ে যেতে পারে। এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিদেশে অবস্থানরত সাবেক কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে আলোচনা রয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান ও চাকরিচ্যুত অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম সম্প্রতি বিদেশে বসে পুলিশের বর্তমান ভূমিকা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্যে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে বিভ্রান্তি বা অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন।
মনিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগের মতো বড় জনসমর্থন থাকা একটি রাজনৈতিক দলকে শুধু নিষেধাজ্ঞা বা পুলিশি শক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের সহিংসতার তদন্ত, পুলিশ সদস্যদের হতাহত হওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও তিনি মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্য নিয়ে সমালোচকরা জানান, এ ধরনের মন্তব্য পুলিশ সদস্যদের একটি অংশকে প্রভাবিত করতে পারে।
এদিকে শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, পতিত সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে হাতকড়া দিয়ে গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে মানুষের ওপর যে মানবতাবিরোধী আচরণ হয়েছে, তার বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যানুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরকে ঘিরে মাঠপর্যায়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন, বিশেষ করে যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নিষ্ক্রিয় কিছু সদস্যকে অর্থায়নের মাধ্যমে আবার তৎপর করার চেষ্টা চলছে বলেও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভেতরে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অনলাইনেও তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অডিও ক্লিপ ও বিভিন্ন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সরকারের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নেতিবাচক দিক তুলে ধরে জনমনে অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা চলছে বলে তাদের দাবি। বড় কর্মসূচির বদলে ছোট ছোট গ্রুপের মাধ্যমে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা ও মনোবল পুনর্গঠন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আন্দোলনের সময় সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় বাহিনীর একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
পুলিশের সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। পেশাগত দায়িত্ব পালন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই পুলিশের মূল কাজ। রাজনৈতিক পক্ষপাত না করে পেশাদারত্বের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, বিগত সময়ে পুলিশে ব্যাপক দলীয়করণ হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না এবং অনিয়মের মাধ্যমে দলীয় লোককে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা স্থগিত রয়েছে। তাই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম করতে না দেওয়া এবং তা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। কোনো পুলিশ সদস্যের রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা উচিত নয়।
আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঠেকাতে সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের প্রবেশপথ ও স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে সতর্কতা জোরদার করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, কোনো পেশাদার বাহিনীর সদস্য হিসাবে কেউ যদি রাজনৈতিক আশ্রয় বা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে কথা বলেন, তবে তা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল বা সংগঠনের যে কোনো অপতৎপরতা রুখে দিতে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। মাঠপর্যায়ে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গুলশানের মিছিলের ঘটনায় ৭৪ জন গ্রেফতারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডিসি ও ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।



-6aa7715d1c5cd.webp)