রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর ঐক্যবদ্ধ ও অব্যাহত কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান
Advertisement
নেসারুল হক খোকন, নিউইর্য়ক থেকে
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম
ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর ঐক্যবদ্ধ ও অব্যাহত কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় সমর্থন অব্যাহত রাখার জন্য ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ওআইসির রোহিঙ্গাবিষয়ক কন্টাক্ট গ্রুপের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলা হয়।
বক্তব্যে বলা হয়, প্রায় এক দশক ধরে নিজেদের সীমিত সম্পদের মধ্যেও বাংলাদেশ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (এফডিএমএন) আশ্রয় দিয়ে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।
এতে আরও বলা হয়, প্রতিবছর রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট এখন শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ছে।
বাংলাদেশের বক্তব্যে সতর্ক করে বলা হয়, অনিয়মিত সমুদ্রপথে যাতায়াত, মানব পাচার, মাদক পাচারসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে। সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, এসব ঝুঁকিও তত বাড়বে। আজকের নিষ্ক্রিয়তা আগামী দিনের হুমকিকে আরও তীব্র করতে পারে।
বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকটের সূত্রপাত মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই। তাই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এ জন্য মিয়ানমারে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
ওআইসির ২০২৬-২০৩৫ সালের ১০ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। তবে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বোঝা ও দায়িত্ব ভাগাভাগি আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বক্তব্যে বলা হয়, ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীসহ সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৫ সালের তুলনায় এবারের আবেদন ২৬ শতাংশ কমানো হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, এর অর্থ প্রয়োজন কমে যাওয়া নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ব্যবস্থার বাস্তবে কতটা অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব—তার প্রতিফলন।
এ অবস্থায় রোহিঙ্গা সংকটে জরুরি, পূর্বানুমেয় ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা দিতে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। প্রায় এক দশক ধরে এই সংকটের ভার বহন করে আসা বাংলাদেশের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকেও সহায়তার আওতায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ একা এই বোঝা বহন করতে পারবে না: বক্তব্যে এ বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।
রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) করা মামলায় ওআইসি সদস্য দেশগুলোর কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তার প্রশংসা করে বাংলাদেশ।
বক্তব্যে জানানো হয়, বাংলাদেশ সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের জন্য ওআইসি তহবিলে প্রায় ১৩ লাখ মার্কিন ডলার দিয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তায় ব্যবহারের কথা। একই সঙ্গে বাগদাদে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাউন্সিলের বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রত্যাশা জানানো হয়।
বাংলাদেশের বক্তব্যে বলা হয়, জবাবদিহি শুধু অতীতের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয় নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা যাতে পুনরায় না ঘটে, তা প্রতিরোধের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির ব্যবস্থাগুলোতে ওআইসির সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তিনটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—জাতিসংঘ ও আসিয়ানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা, ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের জন্য জরুরি ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করা।
শেষে বলা হয়, প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংহতি, মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকারের পরীক্ষা নিয়েছে। সময়ের সঙ্গে এই সংকটকে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করা যাবে না। মানবিক ক্লান্তি যেন রাজনৈতিক উদাসীনতায় পরিণত না হয়।
রোহিঙ্গাদের শুধু সাময়িকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ নয়, তাদের নিজ ভূমিতে একটি ভবিষ্যৎ প্রয়োজন বক্তব্যে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে ওআইসিকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
