শাহজালালের থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে ৪ বিদেশি অপারেটরের নাম প্রস্তাব
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রস্তাব করেছে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়াম। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একচেটিয়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা চালুর লক্ষ্যে এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডানাটা এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন।
ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠান চারটির নিরাপত্তা ছাড়পত্র চেয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে তালিকা জমা দিয়েছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাওয়ার পর প্রস্তাবিত চার প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে একটি প্রতিষ্ঠানকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর হিসেবে নির্বাচন করবে কনসোর্টিয়াম। এরপর নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং লাইসেন্স দেবে বেবিচক।
বেবিচক সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম জমা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কোনো নিরাপত্তাজনিত, নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত বা অন্য কোনো আপত্তি রয়েছে কিনা তা যাচাই বাছাই করা হবে। নতুন অপারেটর নিয়োগের মধ্য দিয়ে তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ে বিমানের পাশাপাশি আরেকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করবে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব বিমানের হাতেই থাকছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতায় রয়েছে উড়োজাহাজের সেবা কার্যক্রম, যাত্রী ও লাগেজ ব্যবস্থাপনা, চেক-ইন, র্যাম্প অপারেশন এবং উড়োজাহাজের দ্রুত টার্নঅ্যারাউন্ড নিশ্চিত করা। এসব কার্যক্রমের দক্ষতার ওপর সরাসরি নির্ভর করে যাত্রীসেবার মান, ফ্লাইটের সময়ানুবর্তিতা ও সামগ্রিক যাত্রী-অভিজ্ঞতা।
বিমান চলাচল খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর নির্বাচনের বিষয়টি কেবল নতুন একটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্মাণকাজের পর আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনব্যবস্থা নিশ্চিত করার যে চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে, এ সিদ্ধান্ত তারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যাত্রীদের ক্ষেত্রে লাগেজ পেতে বিলম্ব, চেক-ইন কার্যক্রমের গতি, সহায়তা প্রদান এবং ফ্লাইট বিপর্যয়ের সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা হবে সেবার মান যাচাইয়ের প্রধান সূচক।
বেবিচকের ছাড়পত্রের জন্য তালিকায় থাকা চার প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক কার্যক্রমের পরিধি, কর্মীসংখ্যা ও পরিচালন সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। প্রস্তাবিত তুলনামূলক তথ্যে দেখা যায়, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট প্রায় ৪৪ থেকে ৪৯টি দেশে ৩১০টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা প্রায় ৪৩ হাজার এবং বছরে প্রায় ৪০ লাখ ফ্লাইট পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। কার্গো হ্যান্ডলিংয়েও প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে; বছরে প্রায় ৬২ লাখ টন কার্গো ব্যবস্থাপনা করে সুইসপোর্ট। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডানাটা ৩৫টি দেশে ১৪৬টি বিমানবন্দর বা স্থাপনায় কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ৫৫ হাজারের বেশি। বছরে ৮ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি প্রায় ৩২ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডলিং করে প্রতিষ্ঠানটি। তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং পাঁচটি দেশে ৬০টির বেশি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। তবে চার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের পরিধি ও সক্ষমতার এসব পরিসংখ্যান বিভিন্ন সময়ের হতে পারে।
আর যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশনের ৬৫টি দেশে ৩৪৭টি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ৬৫ হাজারের বেশি এবং বছরে প্রায় ৫৩ লাখ ফ্লাইটের গ্রাউন্ড সার্ভিস দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
তবে বৈশ্বিক কার্যক্রমের পাশাপাশি মেনজিস এভিয়েশনের সেবার মান নিয়েও অতীতে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের এডিনবরা বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। সে সময় কয়েক হাজার যাত্রীর লাগেজ আটকে পড়া, যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যর্থতা এবং অভিযোগের যথাযথ সমাধান না করার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য স্কটসম্যান। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক গ্রাহক পর্যালোচনা প্ল্যাটফর্ম ট্রাস্টপাইলটে মেনজিস এভিয়েশনের রেটিং ৫-এর মধ্যে ১ দশমিক ৫। সেখানে যাত্রীদের একাংশ কর্মীদের আচরণ, লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং গ্রাহকসেবার মান নিয়ে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তবে অনলাইন রিভিউ সামগ্রিক সেবার মানের চূড়ান্ত পরিমাপক নয়।
এ ছাড়া নিউজিল্যান্ডের প্রাথমিক শিল্প মন্ত্রণালয়ের (এমপিআই) তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বায়োসিকিউরিটি আইন মেনে চলার নির্দেশনা লঙ্ঘনের ঘটনায় ২০২৫ সালে মেনজিস এভিয়েশন লিমিটেডকে দেড় লাখ নিউজিল্যান্ড ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। অকল্যান্ড বিমানবন্দরে আমদানি করা পণ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ছয়টি চালান যথাযথভাবে মোড়কজাত না করা এবং পরিদর্শনকক্ষের স্বাস্থ্যবিধি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসংক্রান্ত ঘাটতির বিষয়টি আদালতের রায়ে উঠে আসে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, থার্ড টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলার নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক বা কর্মীসংখ্যা বিবেচনা করলেই হবে না। বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, লাগেজ সরবরাহের সময়, উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড, যাত্রীসেবার মান এবং অনিয়ম বা বিপর্যয় মোকাবিলায় সক্ষমতার মতো পরিমাপযোগ্য সূচককে গুরুত্ব দিতে হবে। এমনকি অতিত অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক, কর্মীসংখ্যা কিংবা অভিজ্ঞতা দেখলে হবে না। অতীতে তাদের সেবার মান কেমন ছিল, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর এবং লাগেজ ব্যবস্থাপনা ও উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ডে কতটা দক্ষতা রয়েছে, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে বড় প্রতিষ্ঠান হলেই যে তারা সব জায়গায় সমান মানের সেবা দেবে, তার নিশ্চয়তা নেই। তাই অপারেটর নির্বাচনের পাশাপাশি সেবার মান পরিমাপের সুনির্দিষ্ট সূচক নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।


