Logo
Logo
×

Advertisement

জাতীয়

জমি কেনার আগে চিনে নিন CS, SA, RS ও BS খতিয়ানের পার্থক্য

Advertisement

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম

জমি কেনার আগে চিনে নিন CS, SA, RS ও BS খতিয়ানের পার্থক্য

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

জমি কেনা কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মালিকানা যাচাই করতে গিয়ে CS, SA, RS ও BS খতিয়ানের নাম সামনে আসে। কিন্তু কোন খতিয়ান কী কাজে লাগে, কোনটিতে জমির পুরোনো তথ্য পাওয়া যায় আর কোনটি দিয়ে হালনাগাদ রেকর্ড যাচাই করা যায়, তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। একই জমির বিভিন্ন খতিয়ানে মালিকের নাম, দাগ নম্বর বা জমির পরিমাণে পার্থক্য থাকলেও তৈরি হয় বিভ্রান্তি।

ভূমি জরিপের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রস্তুত করা এসব খতিয়ানে জমির পরিচয় ও স্বত্বসংশ্লিষ্ট তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে। তবে সব এলাকার জরিপ একই ধারায় সম্পন্ন হয়নি। তাই জমি কেনা বা মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু একটি খতিয়ানের ওপর নির্ভর না করে পুরোনো ও পরবর্তী রেকর্ড, দলিল, নামজারি এবং মৌজা নকশার তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।

খতিয়ান কী?

খতিয়ান হলো ভূমি জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুত করা সরকারি রেকর্ড। এতে জমির মালিক বা স্বত্বসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, শ্রেণি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য থাকে। একে স্বত্বলিপি বা ইংরেজিতে Record of Rights বলা হয়।

একই জমির একাধিক খতিয়ান থাকতে পারে। যেমন, কোনো জমির পুরোনো CS খতিয়ানের পাশাপাশি SA, RS কিংবা BS খতিয়ানও থাকতে পারে। এসব রেকর্ড তুলনা করলে জমির পরিচয় ও মালিকানার পরিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

তবে খতিয়ান ও জমির দলিল এক নয়। খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভূমি রেকর্ড হলেও বর্তমান মালিকানা যাচাই করতে দলিল, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি, নামজারি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।


CS, SA, RS ও BS খতিয়ান কী?

CS খতিয়ান: CS-এর পূর্ণরূপ Cadastral Survey। এটি বাংলাদেশের ভূমি জরিপের প্রাচীনতম প্রধান রেকর্ডগুলোর একটি। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৮ সালে কক্সবাজারের রামুতে এ জরিপের কাজ শুরু হয়। পরে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে জরিপ পরিচালনা করে জমির নকশা ও রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়।

CS খতিয়ানে তৎকালীন মালিক বা স্বত্বসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম, জমির দাগ নম্বর, পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। জমির পুরোনো পরিচয় ও মালিকানার ধারাবাহিকতা অনুসন্ধানে এ খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি পুরোনো রেকর্ড হওয়ায় বর্তমান মালিকানা যাচাই করতে পরবর্তী রেকর্ড ও দলিলও দেখতে হবে।

SA খতিয়ান: SA-এর পূর্ণরূপ State Acquisition। ১৯৫০ সালের State Acquisition and Tenancy Act-এর প্রেক্ষাপটে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি ও রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণের পর ভূমি রেকর্ড প্রস্তুতের সঙ্গে এ খতিয়ান সম্পর্কিত। অনেক ক্ষেত্রে SA খতিয়ানকে PS বা পাকিস্তান আমলের রেকর্ডও বলা হয়।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর ভূমি রেকর্ডে কী পরিবর্তন এসেছে, তা বুঝতে SA খতিয়ান সহায়তা করে। তবে এর তথ্য যাচাই করতে CS রেকর্ড, পরবর্তী জরিপ এবং মালিকানা পরিবর্তনের দলিলের সঙ্গে তুলনা করা প্রয়োজন।

RS খতিয়ান: RS-এর পূর্ণরূপ Revisional Survey। এটি সংশোধনী জরিপের রেকর্ড। আগের ভূমি রেকর্ড পর্যালোচনা, প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং জমির বিবরণ হালনাগাদ করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের জরিপ পরিচালিত হয়েছে।

RS খতিয়ানে আগের রেকর্ডের তুলনায় দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ কিংবা মালিকানাসংশ্লিষ্ট তথ্যে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। জমি ভাগ হওয়া, সীমানা পুনর্নির্ধারণ, পরিমাপের পার্থক্য কিংবা রেকর্ড সংশোধনের কারণে এমন পরিবর্তন হতে পারে।

BS খতিয়ান: BS-এর পূর্ণরূপ Bangladesh Survey। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত ভূমি জরিপের মাধ্যমে এ ধরনের রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে সব এলাকায় জরিপ একই সময়ে বা একই পর্যায়ে সম্পন্ন হয়নি।

কোনো এলাকায় BS খতিয়ান সর্বশেষ চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত জরিপের রেকর্ড হতে পারে। আবার অন্য এলাকায় RS বা অন্য কোনো জরিপের রেকর্ডই প্রযোজ্য সর্বশেষ রেকর্ড হতে পারে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় BS জরিপের চূড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশিত হয়ে থাকলে জমির হালনাগাদ তথ্য যাচাইয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু BS খতিয়ানে নাম থাকলেই সব পরিস্থিতিতে নিরঙ্কুশ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

কোন খতিয়ান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

CS, SA, RS ও BS খতিয়ানের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা নির্ভর করে জমির অবস্থান, সংশ্লিষ্ট এলাকার জরিপের অবস্থা এবং মালিকানার ইতিহাসের ওপর। সাধারণভাবে, কোনো এলাকার সর্বশেষ চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত জরিপের খতিয়ান হালনাগাদ রেকর্ড যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সর্বশেষ খতিয়ান থাকলেই আগের রেকর্ড অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না। কোনো জমির BS খতিয়ানে একজনের নাম থাকলেও পুরোনো CS খতিয়ানে অন্য ব্যক্তির নাম পাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু নামের পার্থক্য দেখে মালিকানা নির্ধারণ করা যাবে না। জমিটি কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে, উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা পরিবর্তিত হয়েছে কি না এবং পরবর্তী রেকর্ড কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা যাচাই করতে হবে।

আবার কোনো জমির BS খতিয়ান না থাকলেও জমিটি মালিকানাহীন বা অবৈধ হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট এলাকার জরিপের অবস্থা ও প্রযোজ্য রেকর্ড বিবেচনায় নিতে হবে।

বিভিন্ন খতিয়ানে দাগ নম্বর বা জমির পরিমাণ আলাদা কেন?

একই জমির বিভিন্ন খতিয়ানে দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ কিংবা মালিকের নামে পার্থক্য দেখা যেতে পারে। জরিপের সময় জমি ভাগ হওয়া, একাধিক দাগ একত্র হওয়া, সীমানা পুনর্নির্ধারণ, পরিমাপের পার্থক্য কিংবা রেকর্ড সংশোধনের কারণে এমনটি হতে পারে। মালিকানা হস্তান্তর বা উত্তরাধিকার পরিবর্তনের কারণেও নামের পার্থক্য দেখা যায়।

এ ধরনের অমিল যাচাই করতে পুরোনো ও নতুন খতিয়ানের নম্বর, মালিকের নাম, সংশ্লিষ্ট মৌজার নকশা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, হস্তান্তরের দলিল এবং উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি মিলিয়ে দেখা জরুরি।

রেকর্ডে অমিল থাকলেই জমি জাল বা অবৈধ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। আবার অমিলের কারণ যাচাই না করে জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ।

জমি কেনার আগে যেভাবে খতিয়ান যাচাই করবেন

জমি কেনার ক্ষেত্রে বিক্রেতার দেখানো একটি খতিয়ান দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। জমির পরিচয় ও মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

মৌজা ও দাগ নম্বর মিলিয়ে নিন: জমিটি সঠিক মৌজায় অবস্থিত কি না, জেএল নম্বর এবং দাগ নম্বর ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করুন।

মালিকানার ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করুন: বর্তমান বিক্রেতা কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন, তা দলিল, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি এবং পূর্ববর্তী রেকর্ডের মাধ্যমে যাচাই করুন।

জমির পরিমাণ ও মালিকের অংশ নিশ্চিত করুন: বিক্রেতা পুরো জমি বিক্রি করছেন, নাকি জমির একটি অংশ, তা স্পষ্টভাবে বুঝে নিন। যৌথ মালিকানা থাকলে বিক্রেতার প্রকৃত অংশ যাচাই করুন।

নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য দেখুন: নামজারির রেকর্ড এবং কর পরিশোধের তথ্য পরীক্ষা করুন। তবে এগুলোর কোনোটিই এককভাবে নিরঙ্কুশ মালিকানার প্রমাণ নয়।

প্রয়োজনে আইনগত পরামর্শ নিন: বিভিন্ন খতিয়ানে নাম, দাগ নম্বর বা জমির পরিমাণে অমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কিংবা অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবীর সহায়তা নিন।

অনলাইনে খতিয়ান দেখার নিয়ম

সরকারি ই-পর্চা পোর্টালের মাধ্যমে খতিয়ান অনুসন্ধান এবং রেকর্ডের কপির জন্য আবেদন করা যায়। এজন্য ই-পর্চা পোর্টালে প্রবেশ করে বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও মৌজা নির্বাচন করতে হবে। এরপর প্রযোজ্য জরিপের ধরন নির্বাচন করে খতিয়ান নম্বর বা দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করা যায়। রেকর্ড পাওয়া গেলে তথ্য যাচাই করে পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী কপির জন্য আবেদন করা যাবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও ভূমিসেবা-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। এ জন্য land.gov.bd ভিজিট করা যেতে পারে।

তবে সব এলাকার সব পুরোনো রেকর্ড অনলাইনে পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো রেকর্ড খুঁজে না পেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। অনলাইনে রেকর্ড না পাওয়া মানেই সেটি নেই বা জমির মালিকানা অবৈধ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

জমি কেনার আগে CS, SA, RS ও BS খতিয়ানের পার্থক্য জানা থাকলে জমির পুরোনো ইতিহাস, রেকর্ডের পরিবর্তন এবং হালনাগাদ তথ্য বুঝতে সুবিধা হয়। তবে মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু একটি খতিয়ান বা তাতে থাকা নামের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার সর্বশেষ চূড়ান্ত জরিপের রেকর্ডের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোনো খতিয়ান, দলিল, নামজারি ও মৌজা নকশা যাচাই করাই নিরাপদ সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

খতিয়ান, পর্চা নাকি দাগ নম্বর— কোনটির কাজ কী? জানুন সব কিছু

খতিয়ান, পর্চা নাকি দাগ নম্বর— কোনটির কাজ কী? জানুন সব কিছু

ঘরে বসেই অনলাইনে বের করুন জমির খতিয়ান, জানতে হবে যেসব নিয়ম

ঘরে বসেই অনলাইনে বের করুন জমির খতিয়ান, জানতে হবে যেসব নিয়ম

জমির পর্চা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? অনলাইনে বের করার নির্দেশিকা

জমির পর্চা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? অনলাইনে বের করার নির্দেশিকা

অনলাইনে জমির পর্চা তুলবেন যেভাবে, জেনে নিন প্রয়োজনীয় তথ্য

অনলাইনে জমির পর্চা তুলবেন যেভাবে, জেনে নিন প্রয়োজনীয় তথ্য

জমির খতিয়ানে ভুল হলে আইনগত প্রতিকার কী?

জমির খতিয়ানে ভুল হলে আইনগত প্রতিকার কী?

অনলাইনে জমির মালিকানা বের করবেন যেভাবে

অনলাইনে জমির মালিকানা বের করবেন যেভাবে

আরও পড়ুন

যেভাবে টিন সনদের ভুল সংশোধন করবেন

যেভাবে টিন সনদের ভুল সংশোধন করবেন

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আলালের সাক্ষাৎ

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আলালের সাক্ষাৎ

জমি রেজিস্ট্রির পর মূল দলিল পেতে কত দিন লাগে

জমি রেজিস্ট্রির পর মূল দলিল পেতে কত দিন লাগে

জামায়াত নেতা মেজর আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর

জামায়াত নেতা মেজর আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম