মুসতাক আহমদ    |    
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
এবারের বন্যা ‘ভয়াবহ’ থেকে ‘অতি ভয়াবহ’
দক্ষিণ এশিয়াও বড় বন্যায় আক্রান্ত * ৩২ জেলায় ৭৯ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

বাংলাদেশে এলাকাভেদে এবার ‘ভয়াবহ’ এবং ‘অতি ভয়াবহ’- দুই ধরনের বন্যাই আঘাত হেনেছে। শুধু ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানির তোড়ে বিধ্বস্ত হয় উত্তরের জনপদ। এছাড়া মেঘনা অববাহিকার পানি ওলটপালট করে দেয় বৃহত্তর সিলেটের বিস্তীর্ণ এলাকা। কিছু দিন আগে বয়ে যাওয়া এ বন্যার পানির তোড়ে সড়ক, মহাসড়ক, ভেড়িবাঁধ, রেললাইন বিধ্বস্ত হয়। একই মাত্রার বন্যা হয় এবার ভারত, নেপাল এবং ভুটানে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে অতিবৃষ্টির কারণেই এ মাত্রার বন্যা। আর ভুল পরিকল্পনায় রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণ, নদী-জলাভূমি দখল এবং পলিতে নদনদী ভরাট হওয়ায় বন্যার পানি ধ্বংসাত্মক আকার ধারণ করে।

কথা হয় বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক রেজাউর রহমানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের তুলনায় এবারের বন্যাকে সারা দেশের জন্য ভয়াবহ বলা যাবে না। পানিপ্রবাহ ও ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় বন্যাকে এলাকাভিত্তিক ভয়াবহ থেকে অতি ভয়াবহ বলা যায়। বিশেষ করে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারী এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট ও সুনামগঞ্জ অতি ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে। এসব জেলায় জানমালের ক্ষয়ক্ষতিও অনেক।’

একই ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, এবারের বন্যাকে ভয়াবহ বলার বহু কারণ আছে। এজন্য প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড সমানভাবে দায়ী। এবার ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা এবং যমুনেশ্বরীতে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীতীর ও জলাভূমি বেদখল, নদীর নাব্য হ্রাস, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় কাটা এবং বন নিধন। সবকিছু মিলিয়ে বন্যা ভয়াবহরূপ ধারণ করে। মৃত্যু, আক্রান্তের সংখ্যা, ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকেও ভয়াবহ বলা যায়। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও এবারের বন্যা ছিল ভয়াবহ। এ অঞ্চলের বড় নদী গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্রের কারণে ভারতের একাধিক রাজ্য, নেপাল, ভুটান এবং চীন বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। চীন, ভুটান, ভারতের কয়েকটি রাজ্য এবং বাংলাদেশ ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অন্তর্গত। গঙ্গার কারণে বিহারে বন্যা হয়। বন্যাকবলিত হয় উত্তরপ্রদেশও। তিনি বলেন, সব মেলালে দক্ষিণ এশিয়ায়ও বড় বন্যা হয়েছে। তবে আমাদের ভাগ্য ভালো, গঙ্গার পানি নামতে নামতে বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রের পানি মধ্যাঞ্চল পার করে ফেলেছে। এ কারণে ১৯৮৮ বা ১৯৯৮’র মতো বিস্তৃত-দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হয়নি।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এবারের বন্যাকে ‘ভয়াবহ’ বলেছে। ২৫ আগস্ট রয়টার্স বন্যা নিয়ে প্রতিবেদন করে। দ্য গার্ডিয়ানের ২২ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ব্যাপক বন্যায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশের বন্যাকে শতবর্ষের সবচেয়ে গুরুতর উল্লেখ করা হয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনেও একই ধরনের তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, বন্যাকবলিতরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। আক্রান্ত এলাকায় খাবার ফুরিয়ে আসছে। বিবিসির ১৮ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের দক্ষিণ এশিয়ার বন্যা কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে আঞ্চলিক মানবিক সংকট তৈরি করেছে। এতে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ বন্যায় আক্রান্ত বলে উল্লেখ করা হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের (ডিডিএম) সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট পর্যন্ত বন্যায় ৩২ জেলার ২১০ উপজেলা, ৫৮ পৌরসভা, ১ হাজার ২৯০ ইউনিয়ন এবং ৯ হাজার ২৭৫ গ্রাম আক্রান্ত হয়েছে। ৮৬ হাজার ৪৮ পরিবার সম্পূর্ণ এবং ১৬ লাখ ১৭ হাজার ২৫১ পরিবার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৪১ জন মারা গেছেন। ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ এবং প্রায় ৭৯ লাখ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮২ হাজার ৩০০ ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ও ৬ লাখ ২৭ হাজার ৩৮৬টি ঘরবাড়ি আংশিক নষ্ট হয়েছে। ৪৩ হাজার ৪৩৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ এবং প্রায় ৬ লাখ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ এবং ৪ হাজার ৬৪৫টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ডিডিএমের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ভায়াবহতার দিক থেকে ১৯৮৮ বা ’৯৮ সাল এবং এবারের বন্যা আলাদা। ১৯৯৮ সালে দেশের ৬৮ শতাংশ এলাকা প্রায় দুই মাস পানির নিচে ছিল। ১৯৮৮ সালে প্রায় ৩ সপ্তাহ দেশের ৬০ ভাগ এলাকা বন্যাকবলিত থাকে। এ বছর বন্যার স্থায়িত্ব বেশি না হলেও ক্ষয়ক্ষতি বেশি। অল্পসময়ে এবং কম এলাকার অনেক সড়ক, ভেরিবাঁধ, রেললাইন, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যাও বেশি।

এ নিয়ে কথা হয় বিশিষ্ট পানি ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাতের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, প্রাণহানি এবং তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বিবেচনা নিয়ে বন্যার ভয়াবহতা নিরূপণ হয়। এবার প্রাণহানি কিছু হয়েছে। রাস্তা-অবকাঠামো, ভেড়িবাঁধ, রেললাইন ভেঙেছে। নদীভাঙনও ছিল। লেখাপড়ার ক্ষতি হয়েছে। অনেক আশ্রয় কেন্দ্র খালি হতে ৩ মাস লাগবে। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় রোগীকে হাসপাতালে নেয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে বন্যার তিনটি ক্ষতিই হয়েছে। তারপরও আমি এটাকে স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচুমাত্রার বন্যা বলব। তিনি বলেন, বন্যাপরবর্তী সংস্কার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলছে। এর সঙ্গে আরেকটি কাজ করতে হবে। ভাবতে হবে রেললাইন, মহাসড়ক, উঁচু বাঁধ ডুবল বা ভাঙল কেন? আমার মতে, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, রাস্তা করা হয়েছে। রেললাইনে কিছুদূর পরপর প্রবহমান খালের ওপর কালভার্ট বা ব্রিজ আছে। ওই খাল দিয়ে পানি নদীতে যাওয়ার কথা। কিন্তু রেললাইন আর নদীর মাঝখানে বিভিন্ন ‘ডিরেকশনে’ রাস্তা হয়েছে। রাস্তায় পর্যাপ্ত ওপেনিং নেই। ফলে বৃষ্টির পানি খাল-নদীতে না গিয়ে রেললাইনের দিকে গেছে। তাই ডুবেছে রেললাইন। যথাযথ সমীক্ষা চালিয়ে ক্ষতির কারণ বের করে পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণ করতে হবে। নইলে ৩-৪ বছর পর পর এমনই হবে।

বাংলাপিডিয়া বলছে, মৌসুমি, আকস্মিক এবং জোয়ারসৃষ্ট বন্যা হয়ে থাকে বাংলাদেশে। এর মধ্যে এবার প্রথম দুটি বন্যা আঘাত হানে। ১৯৭৪ সালে প্রথম বড় বন্যার কবলে পড়ে বাংলাদেশ। ওই বছর ময়মনসিংহে ১০ হাজার ৩৬০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল বন্যাকবলিত হয়। মানুষ ও গবাদি পশুর ব্যাপক ক্ষতি ছাড়াও লাখ লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ২০০০ সাল পর্যন্ত ৭টি বড় বন্যা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যা বড় হিসেবে চিহ্নিত। তবে ১৯৮৭ সালের বন্যায়ও ৪০ ভাগের বেশি এলাকা প্লাবিত হয়। প্রতিটি বন্যার প্রধান কারণ দেশের ভেতর ও বাইরের অতি বৃষ্টি। ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের বন্যা হয় ব্রহ্মপুত্র এবং গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকা একসঙ্গে সক্রিয় হওয়ায়। ৮৭ সালে দেশের ৪০ শতাংশের বেশি আর ৮৮ সালে ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা প্লাবিত হয় বন্যায়। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা প্লাবিত হয় ১৯৯৮ সালের বন্যায়। তিন দিনের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা-পদ্মা এবং মেঘনা অববাহিকার প্রবাহ ঘটে যায়। ফলে বন্যার ব্যাপ্তি ও ব্যাসার্ধ বেড়ে যায়। এতে বলা হয়, দেশের বাইরে ও ভেতরে ভারি বৃষ্টিপাত, হিমালয়ের পর্বতে তুষার গলা ও হিমবাহের স্থানান্তর, প্রধান নদীগুলোয় একসঙ্গে পানি বৃদ্ধি, এক নদীর ওপর আরেকটির প্রভাব বিস্তার, নদীর তলদেশ ভরাট, তীরভাঙন-দখল, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জোয়ার-ভাটাসহ নদীর সমুদ্রমুখী প্রবাহে ধীরগতিসহ বন্যার ১০টি কারণ আছে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত