টাকা চাই না, তোর সঙ্গে রাখ বাবা
Advertisement
সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছেলের ঘরে ঠাঁই চেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা। বৃহস্পতিবার পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়। এক বৃদ্ধা যুবক ছেলের মুখে-মাথায় বুলিয়ে দিচ্ছেন হাত। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি। বুকে জড়িয়ে ধরে করুণ আকুতি তার-‘আমাকে ছেড়ে দিস না বাবা। আমার টাকাপয়সা লাগবে না। ভালো খাবার লাগবে না। আমি তোর সঙ্গেই বাকি কয়টা দিন থাকতে চাই।’ বৃহস্পতিবার বিকালের এ দৃশ্যে উপস্থিত লোকজনের চোখে পানি এসে গেলেও সেই যুবক যেন ইস্পাত-কঠিন। মাকে সঙ্গে রাখবেনই না।
অসুস্থ এ বৃদ্ধাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি নন নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রামপুলিশ সাগর হোসেন। বিপরীতে ছেলের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন মা মুন্নি খাতুন। এ নিয়ে শুনানি চলাকালে ইউএনও সেলিম আহমেদের সামনে সাগর বলেন, ‘মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব।’
সাগর হোসেন উপজেলার সোনাতলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলাম ও মুন্নি খাতুন দম্পতির ছেলে। স্থানীয় সূত্র জানায়, মুন্নি খাতুনের স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বৃদ্ধ বয়সে তার একমাত্র অবলম্বন ছেলে সাগর। তবে ছেলের বিয়ের পর থেকেই মা-ছেলের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে মাকে নিয়মিত ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন সাগর। তাকে নিজের সঙ্গে রাখতেও অনীহা প্রকাশ করেন।
মুন্নির অভিযোগ, ছেলের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ পাওয়ার আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার ধরনা দিয়েছেন তিনি। স্থানীয়ভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সাগরকে মায়ের দেখাশোনা করার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন। তবে নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন সাগর। পরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার বিষয়ে সমাধানে পৌঁছাতে তাকে কয়েকদিনের সময় দেওয়া হয়।
মুন্নি বলেন, ‘আমি অসুস্থ মানুষ, হার্টের রোগী। আমার এখন ছেলেকে ছাড়া আর কে আছে? আমি ছেলের কাছে টাকাপয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়েও যদি ছেলের সঙ্গে থাকতে পারি, তাহলে বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, মায়ের অধিকার নিয়ে ছেলের ঘরে থাকতে চান তিনি। জীবনের শেষ সময়ে সন্তানের কাছে একটু আশ্রয়ই তার একমাত্র চাওয়া।
নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, মা-ছেলের বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু সাগর রাজি না হওয়ায় স্থানীয়ভাবে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়নি। পরে তার মা ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেন।
ইউএনও সেলিম আহমেদ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়েছে। ছেলেকে বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার জন্য বোঝানো হয়েছে এবং কয়েকদিনের সময় দেওয়া হয়েছে। পরিবারের বিরোধ জটিল না করে বৃদ্ধ মায়ের কষ্ট লাঘবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
