পাকিস্তানের ‘থান্ডার’ ফাইটার জেট কিনতে কেন এত আগ্রহী বিভিন্ন দেশ?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তখন থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ইসলামাবাদের কাছ থেকে রিয়াদ মূলত কী ধরনের সামরিক সক্ষমতা প্রত্যাশা করছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের প্রতিই সৌদির আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
সৌদি আরব ছাড়াও বাংলাদেশ, ইরাক, ইন্দোনেশিয়া এবং লিবিয়ার ন্যাশনাল আর্মি এই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিছু দেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, আবার কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
কম খরচে কার্যকর যুদ্ধক্ষমতা—এই দুটি কারণেই জেএফ-১৭-এর আন্তর্জাতিক চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। গত মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতের সময় এই যুদ্ধবিমান বাস্তব যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানের বিপক্ষে জেএফ-১৭ কার্যকর পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। ওই ঘটনার পরই বিভিন্ন দেশ এই যুদ্ধবিমান কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
কোথায় তৈরি ও কী সক্ষমতা
হালকা ও বহুমুখী এই যুদ্ধবিমানটি পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে (পিএসি) উৎপাদিত হয়, যার কারখানা ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে অবস্থিত।
বর্তমানে জেএফ-১৭-এর ব্লক-টু সংস্করণটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, যেখানে আধুনিক এভিওনিক্স, উন্নত রাডার এবং দৃষ্টিসীমার বাইরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে। আকাশযুদ্ধ ও ভূমিতে হামলা—দুই ক্ষেত্রেই এটি কার্যকর। এতে ব্যবহৃত হয় চীনের তৈরি শক্তিশালী পিএল-১০ই ক্ষেপণাস্ত্র।
এফ-১৬ বা এসইউ-২৭ যেখানে মূলত আকাশযুদ্ধের জন্য তৈরি, সেখানে জেএফ-১৭ বহুমুখী ব্যবহারের সুবিধা দেয়। এতে রয়েছে ‘অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে’ (AESA) রাডার ও আধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থা। মাঝারি ও নিচু উচ্চতায় এটি দ্রুতগতিতে চলাচল করতে পারে এবং তুলনামূলকভাবে টিকে থাকার সক্ষমতাও বেশি।
এই রাডারের মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত করা সম্ভব। যদিও এতে স্টেলথ প্রযুক্তি নেই, তবুও প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি গ্রিপেন, রাফাল, ইউরোফাইটার টাইফুন ও চীনের জে-১০-এর কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর দাম। একটি জেএফ-১৭-এর মূল্য আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে, যা একই শ্রেণির অন্যান্য যুদ্ধবিমানের তুলনায় অনেক কম।
যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত
দামের ব্যবধান স্পষ্ট—রাফালের দাম ৯ কোটির বেশি, গ্রিপেনের ১০ কোটির ওপরে, ইউরোফাইটার টাইফুন প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ, জে-১০ প্রায় ৫ কোটি এবং এফ-৩৫-এর দাম প্রায় ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, ২০১৯ ও ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে সংঘাতে জেএফ-১৭ তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। ২০১৯ সালে এক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় পাইলট অভিনন্দন বর্তমান আটক হন, যাকে পরে মুক্তি দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাতে পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতের ছয়টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে তিনটি রাফাল। ভারত ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও নির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি। পাকিস্তান আরও দাবি করেছে, জেএফ-১৭ ব্যবহার করে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ভারতের এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আঘাত হানা হয়, যদিও ভারত তা অস্বীকার করেছে।
বাড়ছে আন্তর্জাতিক আগ্রহ
২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো মিয়ানমার জেএফ-১৭ কেনে। নিষেধাজ্ঞার কারণে এখনো সব বিমান সরবরাহ সম্পন্ন হয়নি। ২০২১ সালে নাইজেরিয়া তিনটি বিমান কেনে। ২০২৪ সালে আজারবাইজান ১৬টি বিমান কেনার চুক্তি করে এবং পরে সেগুলো কুচকাওয়াজে প্রদর্শনও করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর জেএফ-১৭-এর গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে রাফাল ভূপাতিত হওয়ার দাবি এই আগ্রহে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ছয় দেশের সঙ্গে আলোচনায় পাকিস্তান
চলতি জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধানদের বৈঠকে জেএফ-১৭ কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাকিস্তানের আইএসপিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
রয়টার্স জানায়, ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীও ইসলামাবাদে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং দেশটি ৪০টির বেশি বিমান কিনতে পারে। ইরাকও গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। লিবিয়ার ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে সম্প্রতি প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় এক ডজনের বেশি যুদ্ধবিমান কেনা হবে।
সৌদি ঋণ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
পাকিস্তান ও সৌদি আরব আলোচনা করছে, যাতে সৌদির দেওয়া প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ঋণ জেএফ-১৭ কেনার চুক্তিতে রূপান্তর করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, জেএফ-১৭ রপ্তানি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হবে।
বর্তমানে পাকিস্তান আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলারের কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের দাবি, জেএফ-১৭-এর বিপুল অর্ডার দেশটির অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে এবং ছয় মাসের মধ্যে আইএমএফের ওপর নির্ভরতা কমে যেতে পারে।
সূত্র- দ্য টেলিগ্রাফ

