Logo
Logo
×

Advertisement

রাজনীতি

হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আ.লীগের যে পরিকল্পনা

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম

হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আ.লীগের যে পরিকল্পনা

শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

Advertisement

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে নতুন করে সরব হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গন। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে তার পক্ষ থেকে আসা নানা বক্তব্যকে ঘিরে একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে এটি বাস্তব প্রস্তুতি নাকি রাজনৈতিক কৌশল—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ দেশে ফিরলে তাকে একদিকে আইনি জটিলতা ও মামলার মুখোমুখি হতে হবে, অন্যদিকে না ফিরলে দলের নেতৃত্ব ও তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। এমন বাস্তবতায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে ঘিরে আওয়ামী লীগের ভেতরে কী পরিকল্পনা চলছে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিছক কোনো বক্তব্য নয়; এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। এর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘোষণার মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো-৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে না পারলে ১ জানুয়ারি থেকেই তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে। দলের নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি এরপর তিনি দেশে ফেরার বিষয়ে যে কোনো ঘোষণা দিলে সেটি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে আগের মতো বিশ্বাসযোগ্যতা নাও পেতে পারে।

তাছাড়া সরকার যেখানে তাকে আইনের মুখোমুখি করতে দেশে ফিরিয়ে আনতে অনড় অবস্থানে রয়েছে, সেখানে তিনি অন্য কোনো অজুহাত হাজির করতে পারবেন না। তাছাড়া তিনিও তো বিচারের মুখোমুখি হতে চান বলে ঘোষণা দিয়েছেন। 

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা মাঝে-মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা মূলত রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’। দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার কৌশল। 

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমান বয়স ও পরিস্থিতিতে তিনি সেই আইনি লড়াই এবং দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা মোকাবিলা করবেন কিনা, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক স্লোগান ছাড়া আর কিছু নয়’ বলেও মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।

তিনি বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনা দেশে না ফিরলে এর রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তখন তিনি হয়তো দেশে না ফেরার কারণ হিসাবে নতুন কোনো ব্যাখ্যা বা পরিস্থিতিকে সামনে আনবেন। যেমন-ট্রাভেল পাশ বা বিমান অবতরণের অনুমতিসহ নানা বিষয় হয়তো সামনে আনতে পারেন। কিন্তু এসব ব্যাখ্যা তার রাজনৈতিক অবস্থানের যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণ করতে পারবে না বলেও মনে করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম।

রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা না ফেরার বিষয়টি এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত। তাদের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে-এমনটা মনে করার যথেষ্ট কারণ নেই। তার মতে, শেখ হাসিনা দেশে আসবেন কিনা, সেটি মূলত তার নিজের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে এটুকু বলা যায়, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হবে। তার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙাভাব তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার রায় ও এর বাস্তবায়ন নিয়েও নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা ও উত্তেজনা তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মতো বাস্তব পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ইতোমধ্যে একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। একই সঙ্গে তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় তিনি দেশে ফিরলে তাকে এসব চ্যালেঞ্জ ফেস করতে হবে। 

এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও শেখ হাসিনার প্রশ্নে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য রয়েছে। অর্থাৎ তিনি দেশে ফিরে এলে তাকে সরকার ও বিরোধী দলসহ জুলাইয়ের সব শক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে। ফলে এমন রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিন্দুমাত্র নৈতিক অবস্থান নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। যুগান্তরকে তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রাণহানির ঘটনায় তার প্রথম দায়িত্ব ছিল মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও অনুশোচনা করা। কিন্তু তার বক্তব্যে এখনো বলপ্রয়োগ ও জেদের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এই অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনা আবার দেশে ফিরে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করবেন-এটি ‘অমাবস্যার দিনে পূর্ণিমার চাঁদ দেখার মতো একটা স্বপ্ন’।

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা নিজেই এখন তার উত্তরাধিকার হিসাবে শেখ সেলিমকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। শেখ সেলিমের যদি সেই সৎ সাহস থাকে, তাহলে তিনি দেশে ফিরে আসুক; তাকে তো কেউ বাধা দিচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ। সেই নিষেধাজ্ঞার গেজেট চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিটও হয়েছে। বিষয়টি এখন বিচার বিভাগের এখতিয়ারাধীন হওয়ায় এ মুহূর্তে এ নিয়ে মন্তব্য করা কঠিন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অনেক মামলা বিচারাধীন, ট্রাইব্যুনালে একটি মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত। ফলে আমরা চাই ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে এলে বিমানবন্দরেই গ্রেফতার হবেন। এরপর তার রায় কার্যকর হবে। এর বাইরে আর কোনো সুযোগ নেই। 

তিনি আরও বলেন, কারণ ট্রাইব্যুনাল আইনে বলা আছে, রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিন পর আর কোনো আপিল করা যাবে না। অনেক আগেই ৩০ দিন অতিবাহিত হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার আপিল করার আর কোনো সুযোগ নেই। 

এদিকে, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একাংশ মনে করছেন, তাদের দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে দলটি নতুন করে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে। আর তিনি না ফিরলে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ফলে সব ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ঘোষিত সময়েই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন বলে আশা করছেন তারা। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক বৈঠকেও এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব আলোচনার অংশ হিসাবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি তার সঙ্গে আরও অনেক নেতাকর্মী দেশে ফিরবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন কে, জানালেন শফিকুল আলম

হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন কে, জানালেন শফিকুল আলম

সিআরআইয়ের আয়কর নথি জব্দের আদেশ

সিআরআইয়ের আয়কর নথি জব্দের আদেশ

হাসিনা-কামালসহ ৮ জনের অভিযোগ গঠনের শুনানি ফের পেছাল

জঙ্গি নাটকে ৯ হত্যা হাসিনা-কামালসহ ৮ জনের অভিযোগ গঠনের শুনানি ফের পেছাল

উন্নয়নের আড়ালে ২৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি

আওয়ামী আমলের আমলনামা উন্নয়নের আড়ালে ২৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি

দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে বেআইনি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না: তথ্য উপদেষ্টা

দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে বেআইনি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না: তথ্য উপদেষ্টা

হানিফসহ চারজনের মামলার রায় বৃহস্পতিবার

জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধ হানিফসহ চারজনের মামলার রায় বৃহস্পতিবার

আরও পড়ুন

অন্যায়কারী দলের ছোট-বড় যেই হোক ছাড় নেই: যুবদল সম্পাদক

অন্যায়কারী দলের ছোট-বড় যেই হোক ছাড় নেই: যুবদল সম্পাদক

ফেসবুকে অপপ্রচার না করে জনগণের পাশে দাঁড়ান: আমিনুল হক

ফেসবুকে অপপ্রচার না করে জনগণের পাশে দাঁড়ান: আমিনুল হক

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ‘উন্নয়ন অংশীদারিত্ব’ আরও জোরদার হবে: খন্দকার মারুফ

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ‘উন্নয়ন অংশীদারিত্ব’ আরও জোরদার হবে: খন্দকার মারুফ

নিজ দলের নেতাকর্মীরাও এখন বিএনপির হাতে নিরাপদ নয়: সাদিক কায়েম

নিজ দলের নেতাকর্মীরাও এখন বিএনপির হাতে নিরাপদ নয়: সাদিক কায়েম

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম