Logo
Logo
×
   

খেলা

ছন্দে ফিরেছে ব্রাজিল, এবার কি ফিরবে ‘জোগো বোনিতো’?

মোহাম্মদ আসিফ

মোহাম্মদ আসিফ

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম

ছন্দে ফিরেছে ব্রাজিল, এবার কি ফিরবে ‘জোগো বোনিতো’?

সংগৃহীত ছবি

ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়। কখনও কখনও এটি একটি সংস্কৃতি, একটি অনুভূতি, একটি জাতির আত্মপরিচয়। পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই ফুটবলের একটি নির্দিষ্ট ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ব্রাজিল যেন সেই ব্যতিক্রম!

ব্রাজিল মানেই ছিল বলের সঙ্গে প্রেম। সবুজ ঘাসের বুকে শিল্পীর রঙ-তুলির আঁচড়ের মতো পাস, প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করে দেওয়া ড্রিবল, আর গোলের পর আনন্দের নৃত্য। বিশ্ব ফুটবল বহু বাঘা বাঘা দল দেখেছে, বহু কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে, কিন্তু সৌন্দর্যকে খেলার ভাষা বানানোর শিল্পটি সবচেয়ে বেশি আয়ত্ত করেছিল সেলেসাওরা।

সময়ের নিয়মে সবকিছু বদলায়। বদলেছে ব্রাজিলও।

গত কয়েক বছরে দলটি জয় পেয়েছে, ট্রফির লড়াইয়ে থেকেছে, কিন্তু তাদের খেলা দেখার পর হৃদয়ের ভেতর সেই পুরোনো শিহরণ জাগেনি। মনে হয়েছে, ফলাফল আছে, কিন্তু গল্প নেই। জয় আছে, কিন্তু জাদু নেই। যেন কোনো এক ব্যস্ত নগরের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সাম্বার সুর! 

বিশ্বকাপের শুরুটাও সেই সংশয়কে আরও বড় করে তুলেছিল।

মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলকে দেখে মনে হয়নি তারা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। পাসগুলো ছিল অনিশ্চিত, আক্রমণগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন, আর পুরো দলটাকে দেখাচ্ছিল যেন নিজেদের পরিচয় খুঁজে বেড়ানো একদল পথিক। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একক প্রতিভা না থাকলে হয়তো সেই ম্যাচের গল্প অন্যরকমও হতে পারত।

হাইতির বিপক্ষে জয় এল, স্কোরলাইনও ছিল স্বস্তিদায়ক। কিন্তু অনেক জয় আছে, যেগুলো চোখে পড়ে না; আবার কিছু জয় আছে, যেগুলো পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। ব্রাজিল তখনও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জয় খুঁজছিল।

সেই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা হলো স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। ম্যাচটি শুধু তিন পয়েন্ট কিংবা তিন গোলের গল্প নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল একটি দলের ধীরে ধীরে জেগে ওঠার ইঙ্গিত। 

দীর্ঘদিন পর ব্রাজিলকে বলের সঙ্গে স্বচ্ছন্দ মনে হয়েছে। তারা শুধু আক্রমণ করেনি, আক্রমণ উপভোগ করেছে। শুধু বল নিয়ন্ত্রণ করেনি, বলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে। মাঝমাঠে ছিল ছন্দ, উইংয়ে ছিল গতি, আর আক্রমণে ছিল সাহসের ছাপ। যে সাহস বহুদিন ধরে হারিয়ে গিয়েছিল। এ পুনর্জাগরণের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।

ভিনিসিয়ুসের ফুটবলে এক ধরনের বেপরোয়া সৌন্দর্য আছে। তিনি ভুল করতে ভয় পান না, প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে দ্বিধা করেন না। আধুনিক ফুটবলের হিসাবি কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়েও তিনি মাঝে মাঝে পুরোনো ব্রাজিলিয়ান ছন্দে ফুটবলের সুবাস ছড়িয়ে দেন।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তার দুই গোলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার উপস্থিতি। প্রতিবার বল পায়ে নেওয়ার পর মনে হয়েছে কিছু একটা ঘটতে পারে। দর্শক আসনের মানুষজনও যেন সেই অপেক্ষাতেই ছিলেন। ফুটবলে এমন খেলোয়াড়রাই পার্থক্য গড়ে দেয়।

কার্লো আনচেলত্তির দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল- তিনি কি ব্রাজিলকে শুধু কার্যকরী দল বানাবেন, নাকি তাদের আত্মাটাও ফিরিয়ে দেবেন? 

ইতালিয়ান এই কোচের দীর্ঘ ক্যারিয়ার বলে, তিনি জানেন কখন শৃঙ্খলা প্রয়োজন, আবার কখন শিল্পীকে স্বাধীনতা দিতে হয়। হয়তো সেই কারণেই বিশ্বকাপের শুরুতে তিনি ফলাফলকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ আত্মবিশ্বাসহীন একটি দলকে আগে জিততে শেখাতে হয়। তারপর তাকে স্বপ্ন দেখতে শেখানো যায়।

এখন মনে হচ্ছে, সেই দ্বিতীয় অধ্যায়ের দরজাও ধীরে ধীরে খুলছে। আরও বড় সুখবর হলো নেইমারের প্রত্যাবর্তন।

সমালোচনা, বিতর্ক কিংবা ইনজুরি- সবকিছুর বাইরে নেইমার এখনও এই প্রজন্মের সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার। তার খেলার মধ্যে এখনও রাস্তায় বেড়ে ওঠা শিশুর আনন্দ আছে, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস আছে, দর্শককে মুগ্ধ করার ইচ্ছা আছে। যদি তিনি পুরোপুরি ছন্দে ফিরতে পারেন, আর ভিনিসিয়ুস নিজের বর্তমান ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন, তাহলে ব্রাজিলের আক্রমণভাগ নতুন মাত্রা পেতে পারে। 

অবশ্যই, একটি ম্যাচ দেখে অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত হওয়ার সুযোগ নেই। সামনে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে। বিশ্বকাপের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে নকআউট পর্বে। সেখানে ভুলের মূল্য অনেক বেশি। তবু ফুটবলপ্রেমীরা আশাবাদী হওয়ার কারণ খুঁজে পাচ্ছেন। কারণ ব্রাজিলকে আবারও কিছুটা ব্রাজিলের মতো দেখাচ্ছে।

হয়তো তারা এখনও পূর্ণতা পায়নি। হয়তো সেই কিংবদন্তি দিনগুলোর সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করাও তাড়াহুড়ো হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর অন্তত মনে হচ্ছে, তারা নিজেদের হারানো আয়নাটা খুঁজে পেয়েছে। সেই আয়নায় এখনও পুরো ছবি স্পষ্ট নয়। তবু দূর থেকে সাম্বার সুর ভেসে আসছে। আর ফুটবল দুনিয়া জানে, ব্রাজিল যখন নিজের ছন্দ খুঁজে পায়, তখন শুধু একটি দল নয়, যেন পুরো বিশ্বকাপই আরও সুন্দর হয়ে ওঠে!

ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬


আরও পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম