বিশ্বকাপের তারকা, তারকার বিশ্বকাপ
হেক্সার খোঁজে সেলেসাওরা, পথ দেখাবেন নেইমার
Advertisement
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার জুনিয়র।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণা করতে মঞ্চে উঠেছিলেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। কিন্তু এটি ছিল না কেবল একটি দল ঘোষণার অনুষ্ঠান। পুরো আয়োজন যেন নতুন করে প্রমাণ করল, ব্রাজিলিয়ানদের কাছে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয় বরং আবেগ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের অংশ।
গান, কনসার্ট, অপেরা, ডকুমেন্টারি এবং ব্রাজিলের পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতিচারণে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে যায়। এরপর শুরু হয় বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।
তিন গোলরক্ষকের নাম ঘোষণার পর আসে ডিফেন্ডারদের পালা। এরপর মিডফিল্ডার। একে একে ১৭ জনের নাম ঘোষণা হয়ে গেলে বাকি থাকে মাত্র নয়টি জায়গা। সেই নয়টি জায়গাই ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ফরোয়ার্ডদের তালিকায় একটি নামের জন্য শুধু ব্রাজিল নয়, অপেক্ষায় ছিল যেন গোটা ফুটবল বিশ্ব।
এস্তেভাও, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, ইগর জেসুস, লুইস এনরিকে, ম্যাথিউস কুনিয়ার নাম ঘোষণার পরও উত্তেজনা কমেনি। কারণ তখনও বাকি ছিল কয়েকটি জায়গা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়ার উপস্থিতি ছিল প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু প্রশ্ন ছিল একটাই, নেইমার কি থাকবেন?
ম্যাথিউস কুনিয়ার পর যখন আনচেলত্তি উচ্চারণ করলেন ‘নেইমার জুনিয়র’, তখন পুরো হলরুম উল্লাসে ফেটে পড়ে। মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্নে এখনো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নাম নেইমার।
গত কয়েক মাসের পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের পর আর ব্রাজিলের জার্সিতে দেখা যায়নি তাকে। ভয়াবহ চোটে ছিটকে যাওয়ার পর তার ক্যারিয়ার যেন ছন্দ হারিয়ে ফেলে। সৌদি আরব অধ্যায় শেষে শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে এলেও জাতীয় দলে ফেরার পথ সহজ ছিল না।
আরও বড় বিষয় হলো, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় এক বছরের মধ্যে কার্লো আনচেলত্তি একবারও জাতীয় দলে ডাকেননি নেইমারকে। তাই অনেকের ধারণা ছিল, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াডেও হয়তো জায়গা হবে না তার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার ওপরই আস্থা রাখলেন ইতালিয়ান এই কোচ।
তিনটি বিশ্বকাপ, তিনটি আক্ষেপ
২০১৪ সালে নিজের দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে চোটে ছিটকে যান। এরপর সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ব্রাজিলের ৭-১ গোলের লজ্জাজনক পরাজয় তাকে দেখতে হয়েছিল মাঠের বাইরে বসে।
২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার অসাধারণ এক শট থিবো কর্তোয়ার দুর্দান্ত সেভে আটকে যায়। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় ব্রাজিলের স্বপ্নও।
২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে দুর্দান্ত গোল করে দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন নেইমার। মনে হচ্ছিল সেমিফাইনালের পথ খুলে গেছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায়। সেখানে নিজের কিক নেওয়ার আগেই ব্রাজিল বিদায় নেয় বিশ্বকাপ থেকে।
নেইমারের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার যেন অপূর্ণতার এক দীর্ঘ গল্প
তবু নেইমার ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। ১২৮ ম্যাচে ৭৯ গোল করে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন কিংবদন্তি পেলের ৭৭ গোলের রেকর্ড। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছিলেন সেলেসাওদের আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা।
তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় পরিসংখ্যান নয়। তিনি এমন একজন ফুটবলার, যিনি মাঠে বল পায়ে সৌন্দর্য সৃষ্টি করেন। আধুনিক ফুটবলে শিল্পীসুলভ ফুটবলের যে ধারা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, নেইমার যেন তার শেষ দিকের প্রতিনিধিদের একজন।
এ কারণেই তার বিশ্বকাপ দলে ফেরাটা শুধু ব্রাজিলিয়ানদের জন্য নয়, ফুটবলপ্রেমীদের জন্যও আনন্দের। অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকও হয়তো চাইবেন, আরেকবার বিশ্বমঞ্চে নেইমারের জাদু দেখতে।
সম্প্রতি এক পডকাস্টে ব্রাজিলের ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক রোমারিও তো বলেই ফেললেন, ‘শুধু নেইমারকে সঙ্গে নিয়েই ব্রাজিলের ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ আছে। তাকে ছাড়া দলটি বিশ্বকাপ জিততে পারবে না। ১৯৬২ সালে ব্রাজিল গারিঞ্চাকে নিয়ে জিতেছে, ১৯৭০ সালে পেলেকে নিয়ে জিতেছে, ১৯৯৪ সালে রোমারিওকে নিয়ে এবং ২০০২ সালে রোনালদোকে নিয়ে জিতেছে। ২০২৬ সালে যদি তারা নেইমারকে ছাড়া খেলে, তবে তারা জিততে পারবে না।’
এবারই হয়তো নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ। হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বকাপের আলোয় নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ। যে যুবরাজ কখনো রাজা হতে পারেননি, তার সামনে আবারও এসেছে রাজমুকুট জয়ের সুযোগ।
ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ‘হেক্সা’ বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, নেইমারকে ছাড়া ব্রাজিলের সম্ভাবনা যতটা, নেইমারকে নিয়ে সেই সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।
এখন প্রশ্ন একটাই, ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে, সব আক্ষেপ মুছে দিয়ে, ব্রাজিলকে কি ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এনে দিতে পারবেন নেইমার?
উত্তরটা সময়ই বলে দেবে।


