বাংলাদেশের মার্কেটারদের উদ্দেশে কটলার
‘আই উইশ আই ওয়াজ দেয়ার উইথ ইউ ফিজিক্যালি’
Advertisement
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খবরটা আগেই পাওয়া। বাংলাদেশের ব্র্যান্ড প্র্যাকটিশনার ও মার্কেটারদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনায় আসছেন আধুনিক মার্কেটিংয়ের জনক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ফিলিপ কটলার। ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় শুরু হয় ‘এআই ফর মার্কেটার্স সামিট’ শীর্ষক এ আয়োজন। ফিলিপ কটলারের সঙ্গে সঙ্গে আরও যুক্ত ছিলেন ‘বি টু বি ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ বইয়ের সহলেখক এবং ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসের অধ্যাপক ওয়ালদেমার ফোর্চ।
সঞ্চালক মার্ক অনুপম মল্লিক বাংলাদেশের উদ্দেশে ‘হ্যালো’ বলার আহ্বান জানালেন অধ্যাপক ফিলিপ কটলারকে। ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা কটলার তখন বললেন, “আই উইশ, আই ওয়াজ দেয়ার উইথ ইউ ফিজিক্যালি”—‘আমি যদি স্বশরীরে আপনাদের সঙ্গে সেখানে থাকতে পারতাম।’ কয়েকটি শব্দ মাত্র। অথচ বাংলাদেশের মার্কেটার ও ব্র্যান্ড প্র্যাকটিশনারদের জন্য মুহূর্তটি হয়ে উঠল পুরো আয়োজনের অন্যতম স্মরণীয় অংশ।
প্রায় ৫৩ হাজারের বেশি নিবন্ধন, তিন ঘণ্টার ম্যাসিভ লার্নিং সেশন এবং লাইভ চলাকালে এক লাখের বেশি ভিউ—সব সংখ্যাকে ছাপিয়ে বাংলাদেশের মার্কেটারদের শেখার আগ্রহ ও পেশাগত আকাঙ্ক্ষাই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল ওই আয়োজনে। অংশগ্রহণকারীদের এই আগ্রহে মুগ্ধ হয়ে অনুষ্ঠান শেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানান অধ্যাপক ফিলিপ কটলার ও অধ্যাপক ওয়ালদেমার ফোর্চ।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ব্র্যান্ড প্র্যাকটিশনার ও মার্কেটারদের সঙ্গে সরাসরি ফেসবুক লাইভ আলোচনায় যুক্ত হন ফিলিপ কটলার। ‘এআই ফর মার্কেটার্স সামিট’ শীর্ষক এ বিশেষ আয়োজন করে আইডিয়ান কনসালটিং। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আইডিয়ান কনসালটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও এক্সিকিউটিভ কনসালট্যান্ট মার্ক অনুপম মল্লিক।
এআইয়ের যুগে মার্কেটিংয়ের নতুন বাস্তবতা
আয়োজনের মূল আকর্ষণ ছিল ফিলিপ কটলারের ‘এআই ইন মার্কেটিং’ বিষয়ক বিশেষ উপস্থাপনা। মার্কেটিংয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে মার্কেটারদের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, গ্রাহককে বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি করছে এবং ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে—এসব বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি।
কটলারের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এআই মার্কেটিংয়ের গতি বহুগুণ বাড়াতে পারে। বিশাল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ, গ্রাহকের আচরণ বোঝা, কনটেন্ট তৈরি থেকে শুরু করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এআই এখন গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতির মধ্যেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত—মানুষ। গ্রাহকের আবেগ, মনস্তত্ত্ব, বিশ্বাস ও মানবিক সংযোগকে কোনো প্রযুক্তিই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। বরং এআইকে কাজে লাগিয়ে মানুষের প্রয়োজনকে আরও গভীরভাবে বোঝা এবং তাদের জন্য অর্থবহ ভ্যালু তৈরি করাই হবে ভবিষ্যতের মার্কেটিংয়ের বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্র্যান্ড এখনো মানুষের হাতেই অর্জন করতে হয়
ফিলিপ কটলারের পর ‘এআই ইন ব্র্যান্ডিং’ বিষয়ে মাস্টারক্লাস দেন অধ্যাপক ওয়ালদেমার ফোর্চ। এআই কীভাবে ব্র্যান্ডিংয়ের প্রচলিত ধারণা ও প্রক্রিয়াকে বদলে দিচ্ছে, সেই সঙ্গে প্রযুক্তির যুগে ব্র্যান্ডের মানবিক দিকটি কেন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—তা তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্যের শেষ লাইনটি বিশেষভাবে মনে দাগ কাটে— “দ্য ব্র্যান্ড স্টিল হ্যাজ টু বি আর্নড বাই হিউম্যান”।
প্রযুক্তি একটি ব্র্যান্ডকে মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথ সহজ করতে পারে। ডেটা দিতে পারে, কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, গ্রাহকের আচরণ বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে হলে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই ফিরতে হবে ব্র্যান্ডকে।
বাংলাদেশের মার্কেটারদের জন্য এ বক্তব্যের গুরুত্বও কম নয়। কারণ এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিজস্বতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করা।
কটলারের বইয়ে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড
সামিটে বাংলাদেশের জন্য আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। ফিলিপ কটলার ও ওয়ালদেমার ফোর্চের বৈশ্বিক প্রকাশনা ধারার অংশ হিসেবে তাদের আলোচিত ‘বিটুবি ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ বইটির বাংলাদেশ সংস্করণ আগামী বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হবে। এ সংস্করণে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবমুখী বিটুবি কেস স্টাডি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে সহলেখক হিসেবে যুক্ত থাকবেন মার্ক অনুপম মল্লিক।

বাংলাদেশের ব্যবসা ও ব্র্যান্ডের স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক মার্কেটিং চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এআই: হাইপ, বাস্তবতা ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
কটলারের সেশনের পর অনুষ্ঠিত হয় ‘মার্কেটিংয়ে এআই: হাইপ, বাস্তবতা ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন স্বপ্নের ডিরেক্টর (মার্কেটিং অ্যান্ড গ্রোথ) মাহাদি ফয়সাল। প্যানেলে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র অধ্যাপক রেজওয়ানুল হক খান, গ্রামীণফোনের হেড অব ব্র্যান্ড মার্কেটিং নাফিস আনোয়ার চৌধুরী, প্রথম আলোর জেনারেল ম্যানেজার ও হেড অব মার্কেটিং মো. আজওয়াদ খান, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের ডিরেক্টর (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) বিনয় দাস, দ্য ডেইলি স্টারের চিফ বিজনেস অফিসার মো. তাজদিন হাসান এবং এটেক গ্লোবালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর শুভাশিস ভৌমিক। প্যানেল আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এআই ব্যবহারের নানা দিক।
বক্তারা বলেন, এআই প্রযুক্তি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফলে শুধু এআই টুল ব্যবহার করতে পারাটাই আগামী দিনে কোনো ব্র্যান্ডকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে না। বরং স্থানীয় ডেটার কার্যকর ব্যবহার, ফলাফলনির্ভর মার্কেটিং, ব্র্যান্ডের স্বকীয়তা ধরে রাখা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্সে এআইয়ের সঠিক প্রয়োগই হয়ে উঠবে বড় বিষয়। বাংলাদেশের মার্কেটারদের সামনে তাই একদিকে যেমন রয়েছে এআইকে কাজে লাগিয়ে কাজের দক্ষতা ও গতি বাড়ানোর সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে স্থানীয় ভোক্তার আচরণ ও চাহিদা বুঝে প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর চ্যালেঞ্জ।
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে মার্কেটিংয়ের জগতে প্রভাব বিস্তার করা কটলারের কাছ থেকে ‘এআই ইন মার্কেটিং’ নিয়ে শেখা, ওয়ালদেমার ফোর্চের ‘এআই ইন ব্র্যান্ডিং’ মাস্টারক্লাস এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় মার্কেটিং লিডারদের বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক আলোচনা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মার্কেটিং কমিউনিটির জন্য এটি ছিল ব্যতিক্রমী একটি সুযোগ।
তবে এই আয়োজন বড় একটি বার্তা রেখে গিয়েছে—এআই সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে। এখন পার্থক্য তৈরি করবে কে প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছে।
যে ব্র্যান্ড এআইয়ের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের প্রয়োজন আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে, স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারবে এবং একই সঙ্গে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে—আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে থাকবে।
আর সেখান থেকেই বাংলাদেশের মার্কেটারদের সামনে এখন নতুন দায়িত্ব—শুধু অন্য দেশের সফল ব্র্যান্ডের গল্প অনুসরণ নয়, বরং বাংলাদেশ থেকে একের পর এক শক্তিশালী, স্বতন্ত্র ও বিশ্বমানের ব্র্যান্ড তৈরি করা।

