মিলনের পর সঙ্গীকে খেয়ে ফেলে স্ত্রী অক্টোপাস
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম
ব্লু-লাইনড অক্টোপাস। ছবি: সাটারস্টক
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বহুপদী সামুদ্রিক জীব অক্টোপাসের জীবন যতটা রহস্যময়, ঠিক ততটাই জটিল এর প্রেমের গল্প। এই প্রেমের গল্পে রয়েছে হিংস্রতা। কারণ প্রায়ই মিলনের পর পুরুষ সঙ্গীকে মেরে খেয়ে ফেলে স্ত্রী ব্লু-লাইনড অক্টোপাস। মানুষের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও এই রহস্যময় প্রাণীদের জীবনের স্বাভাবিক চক্রই এটি।
ডিম পাড়া ও তা পাহারা দেওয়ার সময় ছোট আকারের পুরুষ অক্টোপাসকে খেয়ে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে স্ত্রী অক্টোপাস। তবে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু পুরুষ অক্টোপাস এমন এক কৌশল বের করেছে, যার মাধ্যমে তারা নিজের জীবনের শেষ মিলন মুহূর্তটিকে কেবল একটি সাধারণ ‘ওয়ান-নাইট স্ট্যান্ডে’ পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের গবেষক ফ্যাবিও কোর্তেসি মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআরের আইশা রাসকোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এই গবেষণার তথ্য প্রকাশ করেছেন।
ফ্যাবিও কোর্তেসি বলেন, মিলনের পর স্ত্রী অক্টোপাস কিছুদিন ওখানেই থেকে যায় এবং প্রায় ৪০ দিন পর ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার পর তারা সেগুলোর দেখাশোনা করে এবং এই সময়ে কোনো খাবার খায় না। তাই ডিম পাড়ার আগেই খেয়েদেয়ে তাদের প্রচুর পরিমাণে শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে হয়, যাতে পরবর্তী কয়েক মাস ধরে ডিম পাহারা দেওয়ার সময় সেই শক্তি কাজে লাগানো যায়। অর্থাৎ, এ সময় তারা প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত থাকে।
তিনি বলেন, সেই ক্ষুধা মেটাতে মিলনের পর অপেক্ষাকৃত ছোট পুরুষ অক্টোপাসকে খেয়ে ফেলে তারা। মূলত নিজের পরবর্তী প্রজন্মকে সুরক্ষা দিতে এমনটা করে থাকে স্ত্রী অক্টোপাস।
তবে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সম্প্রতি দেখেছেন, কিছু বুদ্ধিমান পুরুষ অক্টোপাস স্ত্রী অক্টোপাসের আহার হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা পথ বের করেছে।
কোর্তেসি বলেন, এই পুরুষ অক্টোপাসগুলো নিজেদের রক্ষায় টেট্রোডোটক্সিন নামের শক্তিশালী বিষ ব্যবহার করে। এই বিষের অল্প পরিমাণই একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট।
গবেষকরা দেখতে পান, মিলনের সময় পুরুষ অক্টোপাসটি স্ত্রী অক্টোপাসের পিঠে ওঠে। এরপর প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে স্ত্রী অক্টোপাসটির গায়ের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং তার সমস্ত নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। স্ত্রী অক্টোপাসটি এই নিস্তেজ অবস্থায় প্রায় এক ঘণ্টা অসাড় হয়ে পড়ে থাকে।
এরপর চেতনা ফিরে পেলে স্ত্রী অক্টোপাসটি মারাত্মক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুরুষ অক্টোপাসটিকে শরীর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ততক্ষণে পুরুষ অক্টোপাসটি নিরাপদে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে সরে পড়ার সুযোগ পেয়ে যায়।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, পুরুষ ব্লু-লাইন্ড অক্টোপাসের বিষগ্রন্থি স্ত্রী অক্টোপাসের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বড়। আকারে ছোট হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের কেন এত বড় বিষগ্রন্থি লাগবে, তা নিয়ে প্রথমে চিন্তায় পড়ে যান গবেষকরা। কারণ উভয়েই একই ধরনের খাবার খায়। মূলত মিলনের সময় স্ত্রী অক্টোপাসকে বিষ প্রয়োগ করার জন্যই তারা এই বাড়তি বিষ ব্যবহার করে।
গবেষক কোর্তেসি বলেন, প্রাণিজগতে টিটিএক্স বিষ প্রয়োগের ঘটনা এই প্রথমবার দেখা গেল। অক্টোপাসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রজাতিতেই স্ত্রী অক্টোপাস পুরুষকে খাওয়ার চেষ্টা করে। তাই পুরুষ অক্টোপাসরা তা এড়ানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। এর মধ্যে একটি হলো দীর্ঘ অঙ্গের ব্যবহার। তারা মিলনের জন্য একটি বিশেষ বাহু বা অঙ্গ ব্যবহার করে। এদের আসলে কোনো পুরুষাঙ্গ থাকে না; শুক্রাণু স্থানান্তরের জন্য তারা মিলনের উপযোগী একটি বাহু ব্যবহার করে। কিছু প্রজাতিতে এই মিলন-বাহুটি বেশ লম্বা হয়, যার ফলে তারা স্ত্রী অক্টোপাসকে দূরে রাখতে পারে। কিন্তু এই প্রজাতিটির ক্ষেত্রে তারা স্ত্রী অক্টোপাসকে কামড় দেয়। তারা অন্য কোনো প্রাণী থেকে এই কৌশল শেখে না; কারণ মিলন ও প্রজনন মৌসুম শেষ হওয়ার পর স্ত্রী অক্টোপাস ডিম পাড়ে এবং মারা যায়। পুরুষ অক্টোপাসও মারা যায়।
এই গবেষক বলেন, পুরুষটির তুলনায় স্ত্রী-অক্টোপাসটি যখন আকারে অনেক বড় হয়ে যায়, তখন তার পেটে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। কিন্তু পুরুষটিকে তো প্রজনন করতেই হবে; প্রজাতিটিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। আমরা যতদূর জানি, এরা অন্য পুরুষদের দেখে শেখে না। মূলত ভুল করার মাধ্যমেই এরা শেখে। যেমন তারা যদি সঠিক জায়গায় কামড় না দেয়—সাধারণত তারা প্রধান ধমনীর কাছাকাছি কামড় দেয়—আর যদি সেই জায়গাটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তবে স্ত্রী অক্টোপাসটি অনেক আগেই জেগে ওঠে। ফলে প্রজননের সময় পুরুষটির এক বা দুটি বাহু হারানোর ঝুঁকি থাকে।
তিনি আরও বলেন, টিটিএক্স অত্যন্ত শক্তিশালী স্নায়ু-বিষ। এটি স্নায়ুকে অবশ করে দেয়। ফলে কেউ এই বিষের সংস্পর্শে এলে খুব দ্রুত হৃদযন্ত্র অচল হয়ে মৃত্যু ঘটে। তাই ভবিষ্যতে এই বিষ দিয়ে ব্যথানাশক ওষুধও তৈরি করা যেতে পারে।
ফ্যাবিও কোর্তেসি জানান, তবে স্ত্রী অক্টোপাস প্রায় এক ঘণ্টা অসাড় থাকার পরও মারা যায় না। পুরো গবেষণায় একটি অক্টোপাসেরও মৃত্যু হয়নি। অক্টোপাস কীভাবে বিষ সামলে এত দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তা আণবিক পর্যায়ে বোঝা সম্ভব হলেও স্নায়ুতন্ত্রের উচ্চতর স্তরে কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে গবেষণা চলছে।

