পথপ্রদর্শকরাই পথ হারিয়েছেন

  আমিনুল ইসলাম হুসাইনী ০২ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ওয়াজ মাহফিল
ছবি: সংগৃহীত

আমরা তো আমাদের বাড়ি কোথায়, তা-ই ভুলে গেছি। এই যে রোজ পাঁচবার জায়নামাজে দাঁড়িয়ে শেখানো ময়নার মতো বুলি আওড়িয়ে যাচ্ছি, ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম।’ অর্থাৎ ‘আমাকে সহজ-সরল পথ দেখাও।’ এর মর্মার্থ কি ভেবে দেখেছি?

এর মর্মার্থ হল, ‘হে প্রভু! আমাকে ওই পথ দেখিয়ে দিন, যে পথে চললে আমার বাড়ি পৌঁছতে পারব।’

আমাদের বাড়ি হল জান্নাতে। সেখানেই কেটেছে আমাদের শৈশব (আমরা যখন রুহ ছিলাম)। সেখান থেকে আমাদের এ পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে পুণ্য অর্জনের জন্য। যে পুণ্যের বিনিময়ে আমরা আল্লাহর কাছ থেকে জান্নাত কিনে নেব।

কিন্তু আফসোস! নাদান পথিক যেমন রঙিন প্রজাপতির পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে তার পথ ভুলে যায়, তেমনই আমরাও এ পৃথিবীর মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে বাড়ি ফেরার পথ ভুলে গেছি। ভুলে গেছি মৃত্যু আসার আগেই পুণ্যের থলে ভরে নিতে হবে। সেই ভুলে যাওয়ার কারণেই আমরা ইবাদত থেকে গাফেল। আর এক শ্রেণির মুসল্লি যারা ইবাদত করি, তা-ও নামে মাত্র। লোক দেখানো। তাদের ইবাদতে প্রেম থাকে না। থাকে না বলেই তারা নামাজ পড়ে কপালের চামড়া কালো করে ফেললেও প্রভুর সাড়া পান না।

অথচ হাদিসে এসেছে, ‘বান্দা যখন নামাজে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করেন, তখন আল্লাহতায়ালা প্রতিটি আয়াতের জবাব দেন। (মুসলিম : ৯০৪, মিশকাত : ৮২৩)।

অন্তরে আল্লাহর প্রেম নেই বলেই অনেকেই হজের মতো মহিমান্বিত ইবাদতেও সেলফিবাজিতে মত্ত হয়ে পড়েন। তাদের হজ প্রেমের টানে নয়, স্রেফ নিজেকে হাজী বলে পরিচিত করার মানসে। অথচ নবীজি হজের সফরে বারবার বলতেন- ‘হে আল্লাহ! এ হজে নিজেকে জাহির ও অন্যকে শোনানোর চেষ্টা থেকে পবিত্র রাখ।’ হজ যে আল্লাহর সান্নিধ্য, আত্মার পরিশুদ্ধির নেয়ামক, তা উপলব্ধিই হয় না তাদের। উপলব্ধি হয় না হজ পরকালীন সফরের একটি মহড়া। মৃত্যুর পর যেমন বান্দাকে সাদা কাফনে আবৃত হতে হয়, তেমনই হজের সময়ও হাজীদের ইহরামের সাদা কাপড়ে আবৃত হতে হয়। মৃত্যু হয়ে গেলে যেমন দুনিয়ার আর কারও সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না, তেমনই ইহরামের কাপড় পরার পরও হাজীদের উচিত জাগতিক লোভ-লালসার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। এমন হজই বান্দাকে নিষ্কলুষ করে তোলে।

হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে হজ করল এবং হজ সম্পাদনকালে কোনো ধরনের অশ্লীল কথা ও কাজ কিংবা গোনাহের কাজে জড়ালো না, সে সদ্যোজাত নিষ্পাপ শিশুর মতো প্রত্যাবর্তন করল।’ (বোখারি : ৮৫৬৭)। এমন হজের বিনিময়ে রয়েছে জান্নাত। নবীজি বলেছেন, ‘হজে মাবরুর বা কবুল হজের বিনিময় হল (আল্লাহর) জান্নাত।’ (মিশকাত : ২০১০)।

আফসোসের বিষয় হচ্ছে, ওই দিগভ্রান্ত লোকরাই এখন সমাজের নেতা। সুদের টাকায় হজ করে মসজিদের সভাপতি সাজছেন! প্রতিবেশীর হক মেরে দানবীর হচ্ছেন। আর আলেমরা হয়ে গেছেন তাদের তাঁবেদার। একদা যে আলেমরা ছিলেন দ্বীনের রাহবার, সিরাতুল মুস্তাকিমের বাতিঘর, সেই আলেমরাই আজ দুনিয়ার মোহে পড়ে ভুলে গেছেন তাদের কর্তব্য, স্বভাব ও নৈতিকতা। অনেক নামজাদা আলেমকেও দেখা যায় গাড়ি, বাড়ি, ব্যাংক-ব্যালেন্স আহরণে হালাল-হারামের তোয়াক্কা করছেন না। পদমর্যাদার লোভে দ্বীনের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতেও কুণ্ঠাবোধ হয় না তাদের। তাদের সেই ব্যক্তি স্বার্থের কারণেই তাবলিগ আজ দ্বিখণ্ডিত। দ্বীনের জন্য দরদ এখন কয়জন আলেমের আছে?

এই যে প্রতি বছর এত এত মাহফিল হচ্ছে, কয়জন আলেম মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বয়ান করছেন? বরং কোনো কোনো ওয়ায়েজদের মাধ্যমে মুসলমান মুসলমানে বিভেদে জড়িয়ে পড়ছেন। যেখানে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা একতাবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রশিকে আঁকড়ে ধরো’ সেখানে আলেমরা মুসলমানদের দল-উপদলে বিভক্ত করে দিচ্ছেন। আবার অনেক আলেমকেই দেখা যায়, ওয়াজের শামিয়ানায় বেশ সুন্দর সুন্দর কথা বলেন, অথচ নিজের জীবনে নেই আমলের তাগিদ।

তাদের প্রসঙ্গেই আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা কেন এমন কথা বল, যা তোমরা নিজেরাই মেনে চল না? তোমরা যা কর না, তোমাদের তা বলা আল্লাহর কাছে অতিশয় অসন্তোষজনক।’ (সূরা সফ : ২-৩)।

শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্য যে, মাহফিলের শামিয়ানায় এখন আর ইসলামের বয়ান হয় না, যা হয় তা ওয়াজের নামে অন্য কিছু। এখনকার অনেক ওয়ায়েজ আছেন, যাদের হাসি, ঠাট্টা তামাশায় নট-নটীরাও হার মানে। এটা যে ইসলামের জন্য কতটা ক্ষতিকর তা বোঝার মতো মানুষ কই এ সমাজে! এ জন্যই আলেমদের ওপর এখন ইতিহাসের সবচেয়ে মন্দ সময় অতিবাহিত হচ্ছে। ধর্ষণের মতো পাপের দায়ে গ্রেফতার হয়ে অপমানিত হচ্ছেন। এটা হচ্ছে কেবল আল্লাহর ভয় না থাকার কারণেই। এদের আলেম না বলাই শ্রেয়। কেন না আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই শুধু তাকে ভয় করে।’ (সূরা ফাতির : ২৮)। সুতরাং তারা যদি আলেম হতো, তাহলে অবশ্যই অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকত তাদের।

আলেমরা আজ হক বলা ছেড়ে দিয়েছেন সামান্য চাকরি হারানোর ভয়ে। তাই অনেক মসজিদের মিম্বারেই এখন আর ধ্বনিত হয় না মহাসত্যের আহ্বান। এমনও নজির আছে, জুমার খুতবা নির্ধারণ করে দেন মসজিদ কমিটির সভাপতি। আর খতিব সাহেবও তাদের সেই ভুজংভাজুং শেখানো বুলি দিয়ে শেষ করেন খোদার বিধান।

এমন আলেমদের প্রসঙ্গেই আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘এরা হচ্ছে সেসব লোক, যারা সঠিক পথের বিনিময়ে ভুল পথ এবং ক্ষমার বিনিময়ে শাস্তি বদলে নিয়েছে। জাহান্নামের আগুন সহ্য করতে এদের কতই না ধৈর্য।’ (সূরা বাক্বারাহ : ১৭৫)।

তাই বলছি, পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ তোমার বাড়ি কই! এপথ তোমার নয়। আপনারা আলেম, তাওহিদের ঝাণ্ডাবাহী। সিরাতুল মুস্তাকিমের পথপ্রদর্শক। আপনাদের জন্য রয়েছে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মহামূল্যবান পুরস্কার। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমানদার এবং যারা আলেম বা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।’ (সূরা মুজাদালা : ১১)।

আজকের তথাকথিত সেই শ্রেণীর আলেমদের কাছে বিনীত আরজ, আর সবার মতো আপনারাও পাপাচারে নিজেদের তলিয়ে দেবেন না। আসুন জীবন সূর্যের আলো থাকতে থাকতে পরকালের জান্নাতি রাস্তাটা খুঁজে নিই।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×