আহলে বায়েতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি

  মাহদী মাহমুদ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আহলে বায়েতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি

রাসূল (সা.) বলে গিয়েছেন, ‘হে লোকসকল! আমি তো মানুষই। অচিরেই আমার প্রভুর তরফ থেকে দূত এসে যাবে এবং আমি তার ডাকে সাড়া দেব (মৃত্যুর আহ্বানে)। আমি তোমাদের মধ্যে দুটি ভারি জিনিস রেখে যাচ্ছি। এ দুটির প্রথমটি হল আল্লাহর কিতাব যা দিকনির্দেশনা ও আলোক রশ্মিতে পরিপূর্ণ।

অতএব, তোমরা আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধর। (এরপর তিনি আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে তাগিদ দিলেন) বললেন, আর দ্বিতীয়টি হল আমার আহলে বায়েত (রক্তজ বংশধারা)। আমার আহলে বায়েত সম্পর্কে আমি তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। (কথাটি তিনি তিনবার বললেন গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য)। (সহিহ মুসলিম, সহিহ তিরমিজি, মান : মুতাওয়াত্তির হাদিস)

আল্লাহ যেভাবে কোরআনকে হেফাজত করার নিশ্চয়তা দিয়েছেন, সেভাবে কোরআনের সঙ্গে একই সমতলে আহলে বায়েতের কথা বলেছেন, তার মানে আহলে বায়েতের শিক্ষাকেও তিনি অবিকৃত রাখবেন, আহলে বায়েতের হাতে রাসূল (সা.)-এর সুন্নতকে জীবিত রাখবেন। আহলে বায়েতরাই হবেন রাসূলের সুন্নাতের সত্যায়নকারী। আর সে জন্যই ইমাম হোসাইন বনি উমাইয়ার কোরআন ও সুন্নতবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কোনো যশ বা ক্ষমতার লোভে কিংবা ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য বিদ্রোহ করছি না। বরং আমি আমার নানার উম্মতের মধ্যে সংস্কার করতে চাই। আমি চাই সৎ কাজের আদেশ দিতে এবং অসৎ কাজ নিষেধ করতে। আর আমার নানা এবং পিতা আলী ইবনে আবি তালিবের পথে চলতে।’

সূরা আহজাবের তেত্রিশ নম্বর আয়াতে রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীদের কথা বলার পর আল্লাহ রাসূল আহলে বায়েত বা রক্তজ বংশধারাকে সম্বোধন করে বলছেন, ‘আল্লাহ চান যে, আহলে বায়েত, তোমাদের থেকে সব কলুষ দূরে রাখতে এবং তোমাদের সম্পূর্ণ রূপে পবিত্র রাখতে।’

কারা এই আহলে বায়েত তা স্পষ্ট করার জন্য এ আয়াত নাজিলের পর একটানা ত্রিশ দিন ফজরের নামাজের পর রাসূল (সা.) হজরত আলী (কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু)-এর বাড়ির দরজায় গিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলেন, ‘আসসালামু আলাইকা ইয়া আহলাল বায়েত (তোমাদের প্রতি সালাম, হে আমার পরিবার)।’ (তাফসিরে দুররে মনসুর, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৯৮)। আর আমরা জানি যে, আলী (কা.)-এর ঘরের বাসিন্দা ছিলেন আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হোসাইন।

সূরা শুরার ২৩নং আয়াতে আল্লাহ রাসূলকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘(হে রাসূল) তুমি বলে দাও ‘আমি এর জন্য (আল্লাহর বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া) তোমাদের থেকে আমার পরমাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোনো প্রতিদান চাই না’। এ আয়াতে নিকটাত্মীয় আরবি ‘কুরবা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কুরবা শব্দের অর্থ ‘রক্তজ আত্মীয়’। আর নিঃসন্দেহে রাসূল (সা.)-এর পরিবারে রক্তজ আত্মীয় ছিলেন আলী, হাসান, হোসাইন, ফাতেমা।

এই পাঁচজনের সম্মানে প্রত্যেক নামাজে আমরা দরুদ সালাম পড়ে থাকি- আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলে মুহাম্মাদ (হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ (সা.) এবং তার বংশের ওপর শান্তি বর্ষণ কর)।

আর এ জন্যই শাফেয়ী মাজহাবের প্রখ্যাত ইমাম ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন,

‘ইয়া আলা বায়েতে রাসূলিল্লাহে হুব্বুকুম,

ফারজুম মিনাল্লাহি ফিল কোরআনে আনযালাহু,

ইয়াকফিকুম মিন আজিমিল ফাখরে ইন্নাকুম,

মানলাম ইউসাল্লি আলাইকুম ফালা সালাতা লাহু।’

অর্থ- হে রাসূল (সা.)-এর আহলে বায়েত। আপনাদের মহব্বত আল্লাহতায়ালা ফরজ করে দিয়েছেন এবং পবিত্র কোরআনে তার হুকুম জারি করেছেন। আপনাদের মর্যাদার জন্য এই যথেষ্ট যে, কেউ যদি নামাজে আপনাদের ওপর দরুদ ও সালাম পেশ না করে তবে তার নামাজই হয় না। (Collection of Imam Shafi'i Poetry, p. 93, Dar al-Kitab al-Arabi, Beirut, 1414 A.H.)

আর এই পাঁচজন মিলেই পাক পাঞ্জাতন। যাদেরকে ভালোবাসা আল্লাহ আমাদের জন্য কোরআন কারিমে আবশ্যক করে দিয়েছেন।

রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার যুগের ইমামকে না চিনে (না অনুসরণ করে) মারা যায় সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু লাভ করল।’ (সহিহ মুসলিম, মুসনাদে হাম্বাল)।

আমাদের যুগ তথা আখেরি জামানার ইমাম, ইমাম হোসাইনের বংশধর ইমাম মাহদি। উম্মে সালামাহ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি : মাহদি আমার পরিজন থেকে ফাতেমার সন্তানদের বংশ (আহলে বায়েত) থেকে জন্ম নেবে ‘ (সুনানে আবু দাউদ, মান : সহিহ)।

আলী (কা.) সূত্রে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেন, ‘যদি দুনিয়ার একদিনও অবশিষ্ট থাকে তবুও আল্লাহ আমার পরিজন (আহলে বায়েত) থেকে অবশ্যই এক ব্যক্তিকে পাঠাবেন। তখনকার দুনিয়া যেভাবে অত্যাচারে ভরে যাবে, সে সেভাবেই তা ন্যায়-ইনসাফে ভরে দেবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, মান : সহিহ)।

রাসূল (সা.) থেকে আহলে বায়েতের প্রত্যেক সদস্যের ব্যাপারে তাদের অনুসরণ, সম্মান এবং ভালোবাসার ব্যাপারে এত বেশি পরিমাণ হাদিস বর্ণিত হয়েছে যে, সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতাকে অস্বীকার করা বা ভিন্ন ব্যাখ্যা করার কোনো অবকাশই নেই।

ইমাম হোসাইনের পিতা ইমাম আলী (কা.) সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন, মহানবী (সা.)-এর সাহাবিদের মধ্যে অন্য কারও সম্পর্কে আলী (কা.)-এর মতো এত অধিক মর্যাদা বর্ণিত হয়নি।

রাসূল (সা.) বলেন, ‘সে (আলী) আমার থেকে এবং আমি তার থেকে। আমার পরে আলীই প্রত্যেক মুমিনের পৃষ্ঠপোষক।’ (আশারায়ে মোবাশশারা, পৃ. ১৬৪, এমদাদিয়া লাইব্রেরি)।

হজরত আয়েশা বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহ এমন কাউকে সৃষ্টি করেননি যে রাসূল (সা.)-এর কাছে আলীর চেয়ে প্রিয় বা পছন্দের হবে।’ (তারিখে দামেশক)

মা ফাতেমা সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, ‘ফাতেমা জান্নাতের নারীদের নেত্রী।’ (সহিহ আল বুখারি, মুসনাদে হাম্বাল)।

রাসূল (সা.) বলেন, ‘ফাতেমা আমার সত্তার অংশ। যে ফাতেমাকে কষ্ট দিল সে আমাকেই কষ্ট দিল।’ (মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বাল)।

রাসূল (সা.) ফাতেমা জাহরা (রা.)-কে শ্রেষ্ঠ চার নারীর একজন এবং চারজনের মধ্যেও সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করেন। অপর তিনজন শ্রেষ্ঠ নারী হচ্ছেন হজরত খাদিজা, বিবি মারইয়াম এবং আছিয়াবিনতে মুজাহিম।

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘হোসাইন আমার থেকে এবং আমি হোসাইন থেকে। যে হোসাইনকে ভালোবাসে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন।’

ইমাম হোসাইন সম্পর্কে রাসূলে পাক (সা.) আরও বলেন, ‘হোসাইন হল হেদায়েতের আলোকবর্তিকা ও নাজাতের (মুক্তি) তরী।’ তিনি বলেন, ‘হাসান ও হোসাইন জান্নাতের যুবকদের সর্দার।’

লেখক : প্রাবন্ধিক, ঢাবি

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×