এক কিশোরের স্বপ্নের সংগঠন হিলফুল ফুজুল

  আহনাফ আবদুল কাদির ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তিনি ছিলেন মানব দরদী, মানবতার নবী। ছোটবেলা থেকেই ভাবতেন মানবজাতির মুক্তির কথা। শান্তির কথা। পাপে জর্জরিত আরব সমাজের গোত্রীয় কলহ আর বছরের পর বছর চলমান যুদ্ধ কিশোর মুহাম্মদকে খুব ভাবাত। কিভাবে সমাজ থেকে অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতনের শিকল কেটে ফেলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়, এটা ছিল তার মূল লক্ষ্য।

মুহাম্মদ (সা.) তখন কিশোর। আরবের বিখ্যাত ওকাজ মেলায় জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে কুরাইশ ও হাওয়াজিন গোত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ বছর চলতে থাকা এই যুদ্ধে অনেক প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধের বিভীষিকায় কিশোর মুহাম্মদের কোমল হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। তাই নবুয়্যত পাওয়ারও পনেরো বছর আগে পঁচিশ বছর বয়সে সমমনা যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলেন হিলফুল ফুজুল নামে স্বেচ্ছাসেবী শান্তিকামী সংগঠন। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে বিশ্বাসী আরব সমাজে শুরু হল শান্তির পতাকাবাহী একদল যুবকের পদচারণা। অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদে আলোর মশাল নিয়ে হাজির হলেন এসব যুবক। এ যুব সংঘের কাজ ছিল :

ক. সামাজিক ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। খ. যুদ্ধ বন্ধ করে সম্প্রীতি গড়ার চেষ্টা করা। গ. অন্যায় ও অবিচার থেকে মানুষকে রক্ষা করা। ঘ. নিঃস্ব, বিধবা ও অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো। ঙ. বিদেশি বণিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া। চ. সব ধরনের অন্যায় ও অবিচারের অবসান ঘটিয়ে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। ছ. সর্বোপরি গোত্র, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানবতার কল্যাণে কাজ করাই ছিল এ সংগঠনের উদ্দেশ্য।

মানবতার কল্যাণে মহানবী (সা.) তার সুদূরপ্রসারি কর্মসূচির মাধ্যমে মক্কার মানুষের মন জয় করে নিলেন। আরবের অলি-গলিতে আল-আমিন বা পরম বিশ্বাসী হিসেবে তার সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। মক্কার শ্রেষ্ঠ ধনাঢ্য মহিলা খাদিজা তাকে ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন এবং পরবর্তীতে হজরতকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন। আর্তমানবতার সেবায় মহানবী (সা.)-এর এ মিশন নবুয়্যতের আগে শুরু হলেও আমৃত্যু তিনি এ কাজই করে গেছেন। আল্লাহতায়ালা তার পরম প্রিয় বন্ধুকে এ দায়িত্বই প্রদান করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ওমা আরসালনাকা ইল্লা রহমাতাল্লিল আলামিন। অর্থ : আর অবশ্যই আমি আপনাকে বিশ্বমানবতার জন্য রহমত করে পাঠিয়েছি।’

পৃথিবী নামক মানবগ্রহটি আজ বড় অন্ধকার সময় পার করছে। এ অন্ধকার রাতের গহিন কালোর চেয়েও কালো। চারদিকে বাজছে আজ যুদ্ধের দামামা। বিপর্যস্ত হচ্ছে মানুষ ও মানবতা। মদ, জুয়া, রাহাজানি, হত্যা, ধর্ষণ, শোষণ ও অবিচার সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আরবের সেই জাহেলিয়াত ফিরে এসেছে যেন নব্য রঙে, নতুন ঢঙে। ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় মানবতা বিধ্বংসী পারমাণবিকের ভয়াবহতায় নিহত হয়েছে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ। তারপর বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে দেশে যুদ্ধ থামেনি। রক্তপাত কমেনি। অন্য ধর্মের লোকেরা যেমন আঘাত হানছে মুসলমানদের ওপর, তেমনি স্বজাতির হাতেও মার খাচ্ছে মুসলিম জাতি। ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া, মিসরসহ মধ্যপ্রচ্যের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্র প্রতিদিন লাল হচ্ছে অমুসলিমদের ষড়যন্ত্রে আর স্বজাতীর আঘাতে। দুঃখের বিষয় মানবসেবায় অমুসলিমরা বিভিন্ন এনজিও সংস্থা তৈরি করে কোটি কোটি ডলার খরচ করলেও মুসলিমরা এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে।

বিভিন্ন মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও ইসলামী সংগঠনগুলো মুহাম্মদ (সা.)-এর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে হাঁক ডাক দেখালেও মানবসেবা ও সামাজিক কাজে তাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। পাশাপাশি মহানবী (সা.)-এর আশেক পরিচয় দেয়া বিভিন্ন দরগাহ ও খানকাহের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন হলেও হজরতের দেখানো মানবসেবার আদর্শিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চোখে পড়ে না। অথচ মহানবী (সা.)-এর আদর্শের প্রতিফলন ছাড়া শান্তির কথা কল্পনাও করা যায় না। কোরআনের ভাষায়, ‘তোমাদের জন্য রাসূল (সা.)-এর জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ’। আরও এসেছে, ‘রাসূল তোমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন তা বর্জন কর। আর আল্লাহকে ভয় কর। অপরাধীদের জন্য তিনি কঠোর শাস্তিদাতা। তাই আসুন! আমরা নবীজির সাংগঠনিক সুন্নাতকে লালন করি। সংঘবদ্ধ হয়ে মানুষের কল্যাণে নিজের মেধা-শ্রম ব্যয় করি। তবেই ইসলাম স্বমহিমায় বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তবেই বুক চেতিয়ে বলা যাবে আমরাই আখেরি নবীর গর্বিত উম্মত।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×