প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার : একটি শিশুর জন্মকাহিনী
Advertisement
লে. কর্নেল এটিএম মহিউদ্দিন সেরনিয়াবাত (অব.)
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সাল। সেদিন ছিল শনিবার। তখনও প্রভাতের সূর্য মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় দৃশ্যমান হয়নি। তবুও জেগে উঠেছে এখানকার মানুষ।
কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হলেও একদিন আগের বিকালে দু’জন বিএসএফ অফিসারসহ স্থানীয় এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আহমেদের আগমন, মঞ্চের স্থান নির্বাচন, নিরাপত্তা বিষয়ের আলাপচারিতায় মানুষ বুঝে গিয়েছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে এ নিভৃত আম্রকাননে।
আজ অন্ধকার কাটার আগেই পুনরায় ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থানীয় নেতা হেবা ডাক্তারসহ বেশ কিছু অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা উপস্থিত হয়ে জানান দিল- এখানে সকাল দশটায় জনসভা হবে। শপথ গ্রহণের বিষয়টি তখনও গোপন রাখা হয় নিরাপত্তার স্বার্থে।
এই সকালে পুলিশের ইউনিফর্মধারী মাহবুবউদ্দিন আহমেদ কী যেন একটা নির্দেশনা দিলে অস্ত্রধারীরা বেশ এলাকাজুড়ে বহির্মুখী অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। নিকটস্থ বাড়ি থেকে গোটা চারেক চৌকি এনে মঞ্চ, বিভিন্ন বাড়ি থেকে ক’টি চেয়ার নিয়ে আসা হয়েছে।
গ্রামের দিকে তাক করা দুটি মাইকে জনসভার প্রচার শুরু হলে যতদূর আওয়াজ যায়, মানুষ সেদিকে ছুটতে লাগল। কিছুক্ষণেই জিপ গাড়িতে উপস্থিত হলেন ইপিআরের মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ও স্ত্রী নাজিয়া ওসমান। উল্লেখ্য, ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী আক্রমণ শুরু করলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনগণের সঙ্গে সামরিক, ইপিআর, পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যরাও রুখে দাঁড়িয়েছে।
যশোরে হানাদাররা অবরুদ্ধ, কুষ্টিয়ায় পর্যুদস্ত। চুয়াডাঙ্গায় মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ইপিআর নিয়ে বিদ্রোহ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দক্ষিণ-পশ্চিম কমান্ড ঘোষণা করেছেন। কৌতুক মনে হলেও সত্যি, যুদ্ধে তাকে সহায়তার জন্য স্থানীয় এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী ও এসডিপিও মাহবুবউদ্দিনকে আত্মায়িক ক্ষমতাবলে মেজর ওসমান ক্যাপ্টেন র্যাংক পরিয়ে দিয়েছেন। তারাও সগৌরবে তা গ্রহণ করেছেন। তারা নিজেরা সিলমোহর তৈরি করে এত দ্রুত সময়েই সেখানে স্বাধীন বাংলার নতুন প্রশাসনও চালু করেছিলেন, যা আজ অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।
সকাল ১০টার কিছু পরে বিএসএফ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র প্রহরায় শ’খানেকের বিশাল একটি গাড়িবহর সীমান্ত অতিক্রম করে বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে এসে পৌঁছল। গাড়ি থেকে নেমে এলেন আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের নেতারা, এমএনএ-এমপিএ, ভারত-বাংলাদেশ ছাড়াও শরণার্থী কভারেজে কলকাতায় আগত বিদেশি অনেক সাংবাদিক।
নেতাদের দেখামাত্র উপস্থিত জনতার গগনবিদারী স্লোগানে আশপাশের দু’চার গ্রাম কেঁপে উঠল। মঞ্চে উঠে এলেন শীর্ষ নেতারা ছাড়াও এমএনএ কর্নেল (অব.) ওসমানী। তাকে আজ একটু বেখাপ্পা লাগছে, কেননা ২৫ মার্চ রাতে আত্মগোপনে যাওয়ার আগে তার মুখশ্রীর সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিশালাকারের গোঁফটি বিসর্জন দিয়ে আসতে হয়েছে। সভা শুরু হল। পরিচালনা করছেন টাঙ্গাইলের এমএনএ আ. মান্নান। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণাকে ভিত্তি করে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম এ স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র তৈরি করেন। এরপর মন্ত্রিপরিষদের নাম ঘোষণা। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তান কারাগারে আটক। কিন্তু তারপরও তিনি যে বাঙালি জাতির ঐক্যের প্রতীক, সব শক্তি ও সাহসের আধার।
শারীরিকভাবে তিনি অনুপস্থিত থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়ে তাকে হৃদয়ে ধারণ করেই লড়তে হবে। এমন বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুকে নতুন এ সরকারের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়েছে। তার অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক, কামরুজ্জামান মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সেনাপতি হিসেবে দলীয় এমএনএ কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানীর নাম ঘোষণা করা হলে খাকি ইউনিফর্ম ও ব্যারেট পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে মিলিটারি কায়দায় তিনি জনতার উদ্দেশে সালাম জানান। শপথ গ্রহণ শেষে নতুন সরকারকে ক্যাপ্টেন (এসডিপিও) মাহবুবউদ্দিনের নেতৃত্বে আনসার বাহিনীর একটি দল গার্ড অব অনার প্রদান করে।
এখানেই বৈদ্যনাথতলাকে মুজিবনগর নামকরণ করা হয়। বেলা ২টা নাগাদ মন্ত্রিপরিষদ, অন্যান্য অতিথি ও সাংবাদিক সবাই স্থান ত্যাগ করেন। মেজর আবু ওসমান, তার দুই তরুণ ডেপুটি তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও মাহবুবউদ্দিন সব শেষে নিরাপত্তা দল নিয়ে মুজিবনগর ছাড়লেও নিয়ে যান এক গৌরবময় ইতিহাসের স্মৃতি, যার জন্য হাজার বছর অপেক্ষা করেছিল আমাদের পূর্বপুরুষরা। যারা যুগের পর যুগ অত্যাচারিত হয়েছিল আর্য, পাল-সেন বংশ, তুর্কি-খালজি-সুলতান, হাবসি-হুসেন-শাহী-পর্তুগিজ-পাঠান-মোগল ও ইংরেজ বর্গিসহ আর কার নয়?
সত্য কী মিথ্যা প্রমাণের আগেই শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক মুজিবের বিরুদ্ধে আনীত আগরতলা মামলা তাদের জন্যই বুমেরাং হয়ে যায়। শেখ মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তি তাকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে দেয়। তিনি হয়ে যান বঙ্গবন্ধু। ১৯৭০-এর নির্বাচনী ফলাফলে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর যোগ্যতার্জন করেন। কিন্তু গণরায়ই চূড়ান্ত নয়। শাসকগোষ্ঠী অনুমান করতে পারে যে, শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হয়ে তার পূর্বাঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করামাত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
অতএব কোনো মতেই ক্ষমতা হস্তান্তর নয়। আগামী কয়েক দশক যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এমন প্রস্তুতি নিয়ে ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর হামলে পড়ে। তাকে হাতে না পেলে পাকবাহিনী ঢাকার মানুষকে আর জ্যান্ত রাখবে না এমন চিন্তা থেকে বঙ্গবন্ধু নিজে না পালালেও দলীয় নেতাকর্মীদের আত্মগোপনে এবং ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার নির্দেশ দেন। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম প্রদত্ত তথ্য মতে রাত এগারোটায় বিদায় নেয়ার সময় বঙ্গবন্ধু হাসিমুখে উচ্চারণ করেন ‘আমাকে ওরা হত্যা করলেও আমার ঠোঁটের কোনায় এই হাসি স্পষ্ট দেখতে পাবে, কেননা আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’ সেই রাতে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুর মুখে রেখে তাজউদ্দীন আহমদ এক বুক হতাশা নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
দ্রুত কাঁধে ঝোলান একটি ব্যাগে এক সেট কাপড় পুরে পায়ে কেড্স ও পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবিতেই ঘর ছাড়েন। ২৫ ও ২৬ তারিখ যখন গুলি ও একইসঙ্গে আগুন জ্বলছিল, তখন পেছনে রেখে আসা পরিবার অপেক্ষা তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুর ভাগ্য নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। ২৬ তারিখ দুপুরে লালমাটিয়ার আব্দুল গফুরের বাড়িতে আত্মগোপনে থাকাবস্থায় বেতার ভাষণে উন্মাদ ইয়াহিয়ার দম্ভোক্তি ‘শেখ মুজিব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাকে এবার বিনা শাস্তিতে যেতে দেয়া হবে না’ শোনামাত্র তাজউদ্দীন চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠেন।
২৭ মার্চ কিছু সময়ের জন্য কারফিউ প্রত্যাহার করা হলে সঙ্গী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে তাজউদ্দীন বেরিয়ে পড়েন। রায়ের বাজারের পর নবাবগঞ্জ পথে পিঁপড়ার মতো ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। তারাও মিশে গেলেন ওই কাফেলায়। সারাদিন হেঁটে সন্ধ্যায় দোহার। পরদিন আবার যাত্রা। পদ্মা পাড়ি দিয়ে অধিকাংশ পথ হেঁটে কিছুটা রিকশা-বাসে ফরিদপুর হয়ে মাগুরা। হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা, পায়ে ফোসকা। ক্লান্ত শরীর। রাতটা এখানে কাটিয়ে সকালে আবার যাত্রা। একটি জিপ পেয়ে সহসাই ঝিনাইদহে আওয়ামী লীগের আ. আজিজের বাড়িতে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক। এখান থেকে ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবদ্দিনকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় মেজর আবু ওসমানের কমান্ড হেডকোয়ার্টারে। সময় দ্রুত এগিয়ে চলছে। এবার সীমান্ত পাড়ি দেয়ার টার্গেট। তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলাম এবার সঙ্গে নিলেন তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও মাহবুবউদ্দিনকেও। সন্ধ্যার আঁধার যখন ধরণীকে কোলে তুলে নিয়েছে, তখন তারা সীমান্তের এপারে একটি কালভার্টের ওপর অপেক্ষমাণ। বিশেষ দূত হিসেবে শেষোক্ত দু’জনকে ওপারে পাঠানো হয়েছে বিএসএফের চৌকিতে আলোচনার জন্য। দূতদ্বয় বিএসএফের চৌকিতে ক্যাপ্টেন মহাপাথ্বরের কাছে বাংলাদেশের দুই শীর্ষ নেতার আগমনের খবর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেয়ার অনুরোধ জানান। এত বড় ব্যাপার হ্যান্ডল করার মতো জ্যেষ্ঠতা ক্যাপ্টেনের নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে শরণার্থীর স্রোত ও এখানকার অবস্থা জানার জন্য বিএসএফের পূর্বাঞ্চল অধিনায়ক ওইদিন কাছেই কোনো একটা শিবিরে অবস্থান করছিলেন। ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিক তাকে জানালে গোলক মজুমদার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত দেন। মহাপাথ্বর ওই দূতদ্বয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ এলাকায় প্রবেশ করে ও যথাযথ সম্মান জানিয়ে তাজউদ্দীন ও তার সঙ্গীকে তাদের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বিএসএফ চৌকিতে নিয়ে যান। ওই রাতেই বিএসএফের গোলক মজুমদার উপস্থিত হয়ে এই দুই অতিথিকে নিয়ে কলকাতায় রওনা হন।
৩১ মার্চ বিএসএফ প্রধান শ্রী রুস্তমজী বাংলাদেশ নেতৃদ্বয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তাজউদ্দীন আহমদ অন্য কারও নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। ১ এপ্রিল রাতে বাংলাদেশের দুই নেতাকে নিয়ে একটি সামরিক কার্গো বিমান দিল্লির পথে উড়াল দিল। সাক্ষাতের সময় এ বিশিষ্ট ব্যক্তিদ্বয়ের বেশভুষার করুণ অবস্থা দেখে রুস্তমজীর পক্ষ থেকে কিছু কাপড়, সেভিং কিট ও নোট নেয়ার জন্য কাগজ কলম বিমানে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। দিল্লিতে এ অতিথিদের বিএসএফের রেস্ট হাউসে ওঠান হয়। ২ এপ্রিল বিশ্রামের পর ৩ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে স্বাগত জানান। ওইদিন আলাপকালে তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতির একটি বাস্তব চিত্র জানার চেষ্টা করেন। আরও আলোচনার আশা নিয়ে অতিথিকে ওই দিনের মতো বিদায় জানান। ৫ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তাজউদ্দীন শরণার্থীদের নিরাপত্তা, খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ-যুদ্ধ সরঞ্জাম জোগান, বঙ্গবন্ধুর প্রাণ রক্ষা, বাঙালি জাতির মনোবল অটুট রাখার জন্য একটি বেতার স্টেশনের ব্যবস্থা এবং পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলাদেশ সরকার গঠন ও ভারতের মাটিতে বসে তৎপরতা চালাতে সুযোগ দেয়ার দাবি জানান। ইন্দিরা গান্ধী তাকে আশ্বস্ত করেন।
এর মধ্যে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে শরণার্থীদের যে স্রোত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রবেশ করছে, তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের সদস্য, এমএনএ-এমপিএ’ও চলে এসেছেন। ব্যারিস্টার আমীরকে নিয়ে ভারত সরকারের দেয়া ছোট্ট একটি বিমানে ঘুরে ঘুরে তাজউদ্দীন সবাইকে কলকাতায় জড়ো করেন। ৯ এপ্রিল তারা একটি নতুন সরকার গঠনের সিদ্ধান্তে উপনীত হলে ১০ তারিখ শিলিগুড়ি বেতার থেকে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের ভাষণের মাধ্যমে সবাই তা জানতে পারে। শত দুঃখ, কষ্ট ও প্রাণের ভয়ের মধ্যেও এ সংবাদে শরণার্থী শিবির, মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের ভেতর অবরুদ্ধ বাঙালিদের মনে আনন্দ বয়ে যায়। তারা আশার আলো দেখতে পায়।
ভারতের মাটিতে তৎপরতা হতে পারে ঠিকই; কিন্তু নতুন এ সরকারের শপথ অনুষ্ঠান নিজ মাতৃভূমিতে ১৭ এপ্রিল করার সিদ্ধান্ত থেকেই মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলাকে নির্বাচিত করা হয়। ১৬ এপ্রিল বিকালে কলকাতা প্রেস ক্লাবে হাজির হয়ে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, আব্দুল মান্নান এমএনএ এবং আমিনুল হক বাদশা পরদিন সূর্যোদয়ের আগে সাংবাদিকদের তাদের সঙ্গে লং ড্রাইভে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর সংগ্রহের আমন্ত্রণ জানান। কী সেই সুখবর! অতিমাত্রায় কৌতূহলী সাংবাদিকরা রাতের অন্ধকারের মধ্যেই প্রেস ক্লাবে উপস্থিত। কিছুক্ষণ পর প্রায় চল্লিশটি গাড়ি ভরে গেল দেশি-বিদেশি সাংবাদিকে। তারা সত্যিকার অর্থে কোনো লং ড্রাইভে নয়, বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে হাজির। চর্মচক্ষু দিয়ে শপথ অনুষ্ঠান দেখে সংবাদ ছড়িয়ে দিলেন বিশ্বে, এমন সৌভাগ্য হয় ক’জনের!
শপথ গ্রহণের পর সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে ছোট-বড় কুড়িটি কক্ষের কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডের একটি দোতলা বাড়িতে সরকারের কাজকর্ম শুরু হয়। মে মাস থেকে সরকারি অনেক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার লোক কলকাতায় উপস্থিত হতে থাকে। শরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, দেশ বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোসহ কাজের পরিধি বাড়তে থাকায় আরও বেশ কটি বাড়ি ভাড়া নিতে হয়। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে আবদুল মান্নান সাহেবের অধীনে গড়ে ওঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পরও অবাক না হয়ে পারি না যে, এক কোটি শরণার্থীর থাকা-খাওয়া, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রায় দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণ- তাদের জন্য অস্ত্র, অর্থ, নিরাপদে দেশে প্রবেশের ব্যবস্থা, তাদের শৃঙ্খলা নিশ্চিত, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য প্রবাসী বাঙালিসহ বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করা, যুদ্ধকালীন প্রশাসনকেই স্বাধীন হওয়া মাত্র মুক্ত বাংলার জন্য প্রস্তুত করার মতো কঠিন কাজ কীভাবে সফল ও সার্থকভাবে সম্পন্ন করেছিল অনভিজ্ঞ সেই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার! উত্তর একটাই- লাখো শহীদের আত্মদান, সেই হ্যামিলনের বংশীবাদক শেখ মুজিবুর রহমানের সফল নেতৃত্ব, অনভিজ্ঞ হলেও শিশু সরকারের দূরদৃষ্টি ও কঠোর পরিশ্রম, প্রশাসনের ওই সময়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেক্টর কমান্ডারসহ সব মুক্তিযোদ্ধা, দেশে-প্রবাসে অবস্থানরত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইস্পাত কঠিন ঐক্য, ত্যাগী মনোভাব, মনোবল এবং এর সঙ্গে বিশ্ব বিবেকের সমর্থন-সহযোগিতার ফলেই সম্ভব হয়েছিল মাত্র নয় মাসে শত্রু সৈন্যদলকে বাংলার মাটি থেকে বিতাড়ণের মাধ্যমে স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা।
এটিএম মহিউদ্দিন সেরনিয়াবাত : অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা
