Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

Advertisement

Icon

ড. একেএম শামছুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

Advertisement

একই মঞ্চ। তিনটি ভিন্ন সময়। তিন প্রজন্মের নেতৃত্ব। আর প্রতিবারই সামনে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন-পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে কীভাবে তুলে ধরা হবে?

১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, নব্বইয়ের দশকে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-জাতিসংঘের মঞ্চে তাদের উপস্থিতিকে শুধু তিনটি পৃথক রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্যের একটি বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। বরং এই তিনটি সময়কে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অভিযাত্রার তিনটি পৃথক অধ্যায় দেখা যায়-রাষ্ট্রকে আত্মনির্ভর ও আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান করার চেষ্টা, গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে সংহত করার প্রচেষ্টা এবং পরিবর্তিত বিশ্বে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করে নতুন সক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা।

প্রথম অধ্যায় : রাষ্ট্রের অবস্থান প্রতিষ্ঠা : ১৯৮০-এর বাংলাদেশ ছিল স্বাধীনতার এক দশকও পূর্ণ না করা একটি রাষ্ট্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক পরিসরে অবস্থান সুসংহত করা এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার ভিত্তি তৈরি করা ছিল রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বৃহত্তর উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করা। ২৬ আগস্ট ১৯৮০ জাতিসংঘের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে তার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বৈষম্যমূলক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন এবং একটি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি।

এর মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতাও প্রতিফলিত হয়েছিল। সদ্য স্বাধীন একটি গরিব রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই পূর্ণ অর্থ বহন করতে পারে, যখন তার সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও যুক্ত হয়। একই চিন্তার আরেকটি প্রকাশ দেখা যায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণায়। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক বিরোধের বাইরে গিয়ে অর্থনীতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে, এই ধারণাকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ পরবর্তীকালে সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় মুল নিয়ামকের ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সেই সময়ের মূল প্রশ্ন ছিল-বাংলাদেশ কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং বিশ্বব্যবস্থায় নিজের স্বার্থ ও কণ্ঠ প্রতিষ্ঠা করবে?

দ্বিতীয় অধ্যায় : গণতন্ত্র, প্রতিষ্ঠান ও ছোট রাষ্ট্রের অধিকার : ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের বাস্তবতা আবার বদলে যায়। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন, জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা-গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কার্যকর করা।

১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার বক্তব্যে দারিদ্র্য, সামাজিক উন্নয়ন, শরণার্থী এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহযোগিতার মতো বিষয় উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কার, ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন। এমনকি, ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের পঞ্চাশতম বার্ষিকীর বিশেষ অধিবেশনে তার বক্তব্যে নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গগুলোর সংস্কার এবং ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের শক্তিশালী ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।

এখানে আগের দশকের সঙ্গে একটি যোগসূত্র স্পষ্ট। জিয়াউর রহমানের সময়ে যে প্রশ্নটি ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ন্যায্য অধিকার, খালেদা জিয়ার সময়ে সেটি আরও বিস্তৃত হয়ে অন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং ছোট রাষ্ট্রের ন্যায্য অবস্থানের প্রশ্নে পৌঁছায়। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে ভাষা ও অগ্রাধিকার বদলেছে, কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকেছে, তা হলো, বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ ও স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করা।

তৃতীয় অধ্যায় : পুনর্গঠন থেকে নতুন সক্ষমতার সন্ধান : ২০২৬ সালের বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান এবং পরবর্তী প্রায় দুই বছরের অন্তর্বর্তী অধ্যায়ের পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নতুন সরকারের সামনে তাই শুধু দেশ পরিচালনার স্বাভাবিক দায়িত্ব নয়, একই সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সুসংহত করা এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

কিন্তু এই অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের কাজটি এমন একসময়ে করতে হচ্ছে, যখন বিশ্বব্যবস্থা নিজেই দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাত, বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রগুলোর জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি ও প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। ফলে আজ বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ কেবল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন বা বৈদেশিক অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশকে একই সঙ্গে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতায় রূপান্তর, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার কাজ এগিয়ে নিতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে চলমান রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি এবং পরিবর্তিত আঞ্চলিক ভূরাজনীতি দেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী-দেশের ভেতরে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির পুনর্গঠন, আর বাইরে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের স্বার্থ, সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করা।

এই প্রেক্ষাপটেই ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারেক রহমান প্রথমবার সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে তার অবস্থান। যুদ্ধ ও প্রাণঘাতী অস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, বিতর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবিকতাকে পরিবর্তনের মাধ্যম করার কথা তিনি বলেন। রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে তিনি সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন ।

কিন্তু তার বক্তব্য কেবল বৈশ্বিক শান্তির আহ্বানে সীমাবদ্ধ ছিল না। বর্তমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের একটি বিস্তৃত চিত্রও সেখানে উঠে আসে-রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়ন, নিরাপদ অভিবাসন, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় উন্নয়নশীল বিশ্বের ন্যায্য প্রবেশাধিকার, শিক্ষা, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি।

দেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের জন্য তিনি Recovery, Restoration and Reconstruction (3R) কৌশলের কথাও তুলে ধরেন। এখানেই ২০২৬ সালের বক্তব্যটি পূর্ববর্তী দুই প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত হয়, আবার একই সঙ্গে পৃথক হয়ে ওঠে।

১৯৮০-এর প্রশ্ন ছিল : বাংলাদেশ কীভাবে বিশ্বব্যবস্থায় ন্যায্য অর্থনৈতিক অবস্থান পাবে।

১৯৯০-এর দশকের প্রশ্ন ছিল : বাংলাদেশ কীভাবে গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার মধ্যে নিজের স্বার্থ রক্ষা করবে।

২০২৬-এর প্রশ্ন : বাংলাদেশ কীভাবে নিজের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা পুনর্গঠন করে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে জায়গা করে নেবে।

একই মঞ্চে তিন প্রজন্ম : তারেক রহমানের এবারের বক্তব্যে একটি ব্যক্তিগত অথচ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তও ছিল। একই জাতিসংঘ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি স্মরণ করেন যে, তার বাবা জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়াও এই মঞ্চ থেকেই বাংলাদেশের কথা বলেছেন। এই স্মৃতির গুরুত্ব শুধু পারিবারিক আবেগে নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের তিনটি সময়কে একই ফ্রেমে দেখার সুযোগ তৈরি করে।

এক প্রজন্মের সামনে ছিল স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রকে দাঁড় করানোর চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী প্রজন্মের সামনে ছিল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও সংহত করার চ্যালেঞ্জ। বর্তমান প্রজন্মের সামনে রয়েছে আরও জটিল কাজ-রাষ্ট্রকে কার্যকর, প্রতিযোগিতামূলক, প্রযুক্তিসক্ষম এবং পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতির উপযোগী করে তোলা।

সুতরাং রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শুধু পারিবারিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখলে এর অর্থ সংকুচিত হয়। রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় উত্তরসূরি পূর্বসূরির নাম কতবার উচ্চারণ করেন তা দিয়ে নয়, বরং পূর্ববর্তী সময়ের রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতাকে নিজের সময়ের সমস্যার সমাধানে কতটা রূপান্তর করতে পারেন, তা দিয়ে।

এখন পরীক্ষা দেশের ভেতরে : এই জায়গাটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের মঞ্চে উচ্চারিত নীতি ও আকাঙ্ক্ষা একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্দেশ করতে পারে, কিন্তু তার সাফল্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয় দেশের ভেতরে। যেমন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সমর্থন চাওয়া জরুরি, কিন্তু একই সঙ্গে সীমান্ত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সামলানোর সক্ষমতাও প্রয়োজন। জলবায়ু অর্থায়নের দাবি যৌক্তিক, কিন্তু সেই অর্থ ব্যবহারে কার্যকর প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার জন্য আইনের শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রয়োজন। তরুণদের সম্ভাবনার কথা বলা জরুরি, কিন্তু তার বাস্তব অর্থ হবে মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান। প্রযুক্তির ন্যায্য প্রবেশাধিকারের দাবি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দেশের ভেতরেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

অতএব ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সামনে মূল পরীক্ষা শুধু একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু করা নয়, বরং রাষ্ট্রের সক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের আস্থা পুনর্গঠন করা। মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না, প্রশাসন সেবা দিতে পারছে কি না, বিচারব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য কি না, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে কি না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিমূলক হচ্ছে কি না এবং সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে নিজের বলে অনুভব করছে কি না-শেষ পর্যন্ত এসব দিয়েই রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকারিতা বিচার হবে।

উত্তরাধিকার থেকে দায়িত্ব : তিন প্রজন্মের এই ইতিহাস তাই সরল কোনো বংশানুক্রমিক রাজনৈতিক গল্প নয়। বরং এটি তিনটি ভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চ্যালেঞ্জের বিবর্তনের একটি ছবি। জিয়াউর রহমানের সময় সামনে ছিল রাষ্ট্রের আত্মনির্ভরতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। খালেদা জিয়ার সময়ে সামনে আসে সংসদীয় গণতন্ত্র, প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ছোট রাষ্ট্রের অধিকারের প্রশ্ন। তারেক রহমানের সময় সামনে এসেছে রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জলবায়ু নিরাপত্তা, মানবিক সংকট এবং পরিবর্তিত ভূরাজনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রশ্ন। পারিবারিক ইতিহাসের বাইরে এই তিন সময়কে যুক্ত করে যে সূত্রটি, তা হলো বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ। আর এখানেই উত্তরাধিকারের সঙ্গে দায়িত্বের পার্থক্য। উত্তরাধিকার পাওয়া যায় ইতিহাস থেকে, কিন্তু তার রাজনৈতিক মূল্য অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে। পূর্ববর্তী প্রজন্ম একটি পথ তৈরি করতে পারে, কিন্তু নতুন প্রজন্মকে নিজের সময়ের সমস্যার সমাধান নিজেকেই করতে হয়। সুতরাং, ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু-কে কার উত্তরসূরি, তা নয়। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-অতীতের রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান নেতৃত্ব কি এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে রাষ্ট্র হবে কার্যকর, প্রতিষ্ঠান হবে শক্তিশালী, অর্থনীতি হবে প্রতিযোগিতামূলক, নাগরিক হবে ক্ষমতাবান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কণ্ঠ হবে স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ?

তিন প্রজন্ম একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের কথা বলেছেন। কিন্তু প্রত্যেক প্রজন্মের ইতিহাস শুধু জাতিসংঘের মঞ্চে উচ্চারিত কথায় লেখা থাকবে না, বরং লেখা থাকবে, সেই কথাগুলো বাংলাদেশের মানুষের জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয়, তার ভিত্তিতে। সেখানেই উত্তরাধিকারের প্রকৃত পরীক্ষা। সেখানেই নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.) : প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

হালফিল বয়ান ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত : বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ

ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত : বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি জরুরি ছিল

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি জরুরি ছিল

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম