জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি জরুরি ছিল
Advertisement
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ পর্যন্ত তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। গত এপ্রিলে প্রথম দফায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা, কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৯ টাকা এবং অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় গত জুনে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে প্রতি লিটার কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়। আর গত ২০ সেপ্টেম্বর তৃতীয় দফায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যেই বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা, লঞ্চভাড়া ১৭ থেকে ২০ শতাংশ, ট্রাকভাড়া ৩০ শতাংশের মতো বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আর মোটরসাইকেল ভাড়া বেড়েছে ২০ থেকে ৪০ টাকা। এটি শুধু পরিবহণ খাতের হিসাব। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাসের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি এতই জরুরি ছিল? আমদানি পর্যায়ে একক পণ্য হিসাবে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে ডিজেল থেকে। গত অর্থবছরে ডিজেল আমদানি বাবদ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারকে ১১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর প্রদান করেছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছর সময়ে শুল্ক বাবদ বিপিসি বাংলাদেশ সরকারকে মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছে। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে বিপিসি মাত্র এক বছর লোকসান দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, সরকার কি মুনাফা অর্জনকারী কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান? জনগণের সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সর্বোত্তম জনকল্যাণ করা। গত ৪ বছরের বেশি সময় ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা বিরাজ করছে। করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল, তখন শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ে। ফলে বিশ্বব্যাপী দেশে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশ নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই এমনটি হয়েছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।
অভ্যন্তরীণ বাজারে একশ্রেণির অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ী আছে, যারা অজুহাত পেলেই পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে থাকে। পরিবহণ খাতে ব্যাপক চাঁদাবাজি, উৎকোচ গ্রহণ ইত্যাদি কারণে গ্রাম তথা তৃণমূল পর্যায় থেকে একটি পণ্য শহরে আসতে আসতে দাম অনেকটাই বেড়ে যায়। মধ্যস্বত্বভোগীরা তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদকদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে একটি পণ্য ক্রয় করে তা শহরে এনে দ্বিগুণ-তিনগুণ মূল্যে বিক্রি করে থাকে। আমাদের দেশে সরকার বদল হলেই মধ্যস্বত্বভোগী রদবদল হয়। প্রতিটি সরকার আমলেই সরকারি সমর্থন নিয়ে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এবং কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় ছাড়া কোনো গতি ছিল না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি না করেও বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ ছিল। বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে হলেও জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা যেত। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া। শুধু মুনাফা অর্জন করা এর কাজ হতে পারে না। সরকার এ খাতের কর সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করতে পারত। সরকার নতুন করে এ খাতে ভর্তুকি দিতে পারত। যে কোনো মূল্যে হোক, অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা উচিত ছিল। কারণ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে সব ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এতে উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় বেড়ে যাবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিতকরণ ও সিস্টেম লস বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ মজুত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো কারণে জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পুরো উৎপাদনব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়ায়। জ্বালানি তেলের গুরুত্ব কতটা, তা অনুধাবন করা যায় ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হলে অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর ওপর জ্বালানি তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল নিয়ে হাহাকার শুরু হয়। ওপেকের এ নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪ গুণ বা ৩০০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল ৩ মার্কিন ডলারেরও কম। ১৯৭৪ সালে জানুয়ারির মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মূল্য ১২ ডলারে উপনীত হয়। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে একে ‘প্রথম তেল সংকট’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। ওপেকের জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত এ নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। তারপর যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো আপৎকালীন সংকট মোকাবিলার জন্য অভ্যন্তরীণভাবে জ্বালানি তেলের মজুত গড়ে তোলে। যেসব দেশে তেল উৎপাদিত হয় না, তারা আমদানির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ গড়ে তোলে।
বাংলাদেশ জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশে গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসপ্রাপ্তির সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি পাঁচটি কূপ খনন করলে একটিতে গ্যাস পাওয়া গেলে তাকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে প্রতি তিনটি কূপ খনন করলে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়। অভ্যন্তরীণ উৎসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে চিহ্নিত সমুদ্রসীমায় গ্যাস ও জ্বালানি তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে চিহ্নিত সমুদ্রসীমায় ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২০১২ সালের ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালের ৭ জুলাই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা চিহ্নিত হয়। মিয়ানমার তার সমুদ্রসীমায় ৪টি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছে। সেখান থেকে তারা বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করে তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার ও রপ্তানি করছে। প্রতিদিন এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। সম্প্রতি তারা আরও ৪টি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছে। সব মিলিয়ে মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরের মিয়ানমার অংশে ৮ থেকে ১০টি বড় অনুসন্ধান কূপ ও ফিল্ড আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ভারত সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরে তার নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২৫টিরও বেশি তেল-গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে এবং বেশকিছু ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস ও তেল আহরণ করছে।
বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাসের জন্য অভ্যন্তরীণ কূপ খনন এবং বিশেষ করে সমুদ্রসীমায় কালক্ষেপণ না করে দ্রুত অনুসন্ধান চালাতে হবে। অবশ্য এটি আন্তর্জাতিক টেন্ডার এবং অর্থের উৎসের ওপর নির্ভর করে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কূপ খননকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রোডাক্ট শেয়ারিং বা যৌথ উদ্যোগের বিভিন্ন বিকল্প চিন্তা করা যেতে পারে। তবে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি যেন করা না হয়, লক্ষ রাখতে হবে। অতীতে জ্বালানি খাতে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই দেশের স্বার্থবিরোধী ছিল। সে ধরনের প্রক্রিয়ার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : অর্থনীতিবিদ, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা
অনুলিখন : এম এ খালেক
