Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন

Advertisement

Icon

মামুন হাসান

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন

Advertisement

একজন পর্যটন শিক্ষক হিসাবে শ্রেণিকক্ষে যখন শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করি, আগামী দিনের পর্যটন কেমন হবে, তখন উত্তর আসে-প্রযুক্তিনির্ভর, স্মার্ট এবং দ্রুতগতির পর্যটন। কিন্তু আমার কাছে ভবিষ্যতের পর্যটনের প্রশ্নটি আরও গভীর। আগামী দিনের পর্যটন শুধু কত দ্রুত একটি টিকিট বুক করা যাবে, কত সহজে একটি হোটেল পাওয়া যাবে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কত সুন্দর একটি ভ্রমণসূচি তৈরি করতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করবে না। আসল প্রশ্ন হবে, প্রযুক্তির এ বিপুল পরিবর্তন পর্যটনকে কতটা মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং স্থানীয় মানুষের জন্য অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করে তুলতে পারছে।

আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘Digital Agenda and Artificial Intelligence to Redesign Tourism’, বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় যার বাংলা অনুবাদ করেছে, ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। প্রতিপাদ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি হলো ‘Redesign’, অর্থাৎ শুধু প্রযুক্তি যুক্ত করা নয়, বরং পর্যটনের প্রচলিত কাঠামোকেই নতুন করে সাজানো।

এ নতুন বাস্তবতা একজন পর্যটন শিক্ষকের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পর্যটনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে শুধু সফটওয়্যার বা যন্ত্র দিয়ে নয়, বরং শ্রেণিকক্ষে তৈরি হওয়া নতুন প্রজন্মের দক্ষতা দিয়ে। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের হোটেল ব্যবস্থাপক, ট্যুর অপারেটর, গন্তব্য ব্যবস্থাপক, পর্যটন উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারক। ফলে পর্যটন শিক্ষাকে যদি ডিজিটাল বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা না যায়, তাহলে আমরা ভবিষ্যতের পর্যটনশিল্পের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারব না। পর্যটনের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, জিপিএস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন রিভিউ ইতোমধ্যে পর্যটকের ভ্রমণ আচরণ বদলে দিয়েছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান এ পরিবর্তনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একজন পর্যটক এখন নিজের বাজেট, সময়, পছন্দ, খাদ্যাভ্যাস এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্য জানিয়ে কয়েক মুহূর্তে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভ্রমণ পরিকল্পনা পেতে পারেন। এআই পর্যটকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, গন্তব্য তুলনা করতে পারে, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা কমাতে পারে এবং ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলতে পারে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হয়তো পর্যটককে সেবা দেওয়ার মধ্যে নয়, পর্যটন ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে। একটি গন্তব্যে কখন পর্যটকের চাপ বাড়বে, কোথায় অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হচ্ছে, কোন এলাকায় পরিবেশগত চাপ বাড়ছে কিংবা পর্যটকের আচরণ কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে-বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব বিষয়ে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ ভবিষ্যতে পর্যটন ব্যবস্থাপনা অনুমানের ওপর নয়, ডেটার ওপর দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এ পরিবর্তনের গুরুত্ব অনেক। আমাদের পর্যটন সম্পদের অভাব নেই, কিন্তু পর্যটন সম্পদকে তথ্য ও অভিজ্ঞতায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, শ্রীমঙ্গল, হাওড় অঞ্চল, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা কিংবা গ্রামীণ জনপদের পর্যটন সম্ভাবনা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যটকের জন্য সমন্বিত, নির্ভরযোগ্য ও বহুভাষিক ডিজিটাল তথ্য কতটা সহজলভ্য, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আমরা যদি বাংলাদেশের প্রতিটি পর্যটন গন্তব্যের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করতে পারি, তাহলে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেখানে শুধু একটি গন্তব্যের ছবি থাকবে না। থাকবে ইতিহাস, সংস্কৃতি, যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন, স্থানীয় খাবার, পরিবেশগত সংবেদনশীলতা, নিরাপত্তা, স্থানীয় গাইড, উদ্যোক্তা, পর্যটন মৌসুম এবং সম্ভাব্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতার তথ্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশি-বিদেশি পর্যটকের জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারবে।

সুন্দরবন হতে পারে এ ধরনের স্মার্ট পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সুন্দরবনে পর্যটন বাড়ানোর পাশাপাশি এর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। পর্যটকের সংখ্যা, নৌযানের চলাচল, আবহাওয়া, জোয়ারভাটা এবং সংবেদনশীল এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যটন ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে। কোন সময়ে কোথায় পর্যটকের চাপ কম রাখা দরকার, কোন এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা উচিত কিংবা কোন বিকল্প গন্তব্যে পর্যটক পাঠানো যায়-এসব সিদ্ধান্ত ডেটার ভিত্তিতে নেওয়া সম্ভব।

এখানে আমাদের পর্যটন দর্শনেরও পরিবর্তন প্রয়োজন। পর্যটন মানেই বেশি পর্যটক নয়। বরং পর্যটন হতে হবে বেশি মূল্য সৃষ্টি করার মাধ্যম। একজন পর্যটক একটি এলাকায় গিয়ে কত টাকা ব্যয় করলেন, তার কত অংশ স্থানীয় মানুষের হাতে গেল, কতদিন অবস্থান করলেন এবং স্থানীয় সম্পদ ও সংস্কৃতির সঙ্গে কতটা যুক্ত হলেন-এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি যদি পর্যটকের ব্যয়কে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করতে পারে, তাহলে পর্যটন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের শক্তিশালী মাধ্যম।

তবে প্রযুক্তির এ অগ্রযাত্রার সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। ডেটার গোপনীয়তা, অ্যালগরিদমের পক্ষপাত, ডিজিটাল বৈষম্য, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং মানুষের কর্মসংস্থানের পরিবর্তন নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে। কারণ প্রযুক্তি নিজে কখনো নিরপেক্ষ সমাধান নয়। আমরা কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, তার ওপর নির্ভর করবে এর সুফল কারা পাবেন।

বিশ্ব পর্যটনের ভবিষ্যৎ তাই শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। এআই হবে মানুষের সহায়ক শক্তি। একজন পর্যটককে প্রযুক্তি দ্রুত সেবা দিতে পারে, কিন্তু স্থানীয় মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা দিতে পারে না। একটি অ্যালগরিদম একজন পর্যটককে সুন্দরবনের পথ দেখাতে পারে, কিন্তু সুন্দরবনের মানুষের জীবন, নদীর গল্প কিংবা স্থানীয় সংস্কৃতির অনুভূতি একজন মানুষই তুলে ধরতে পারেন। পর্যটনের প্রাণ তাই প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগে।

এ কারণেই ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য আমাদের কাছে শুধু প্রযুক্তি গ্রহণের আহ্বান নয়, পর্যটনকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান। ডিজিটাল রূপান্তর মানে পুরোনো ব্যবস্থার ওপর নতুন সফটওয়্যার বসানো নয়। এর অর্থ হলো পর্যটনের পরিকল্পনা, শিক্ষা, বিপণন, সেবা, ব্যবস্থাপনা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে নতুন প্রযুক্তির আলোকে পুনর্বিন্যাস করা। বাংলাদেশের সামনে সুযোগটি এখন বড়। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী প্রযুক্তিবান্ধব, আমাদের পর্যটন সম্পদ বৈচিত্র্যময় এবং আমাদের স্থানীয় সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রয়োজন শুধু এই তিন শক্তিকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় নিয়ে আসা। একটি জাতীয় স্মার্ট ট্যুরিজম নীতি, শক্তিশালী পর্যটন ডেটা অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যটন সেবা, ডিজিটাল দক্ষ মানবসম্পদ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মামুন হাসান : ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

উত্তরাধিকার ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

হালফিল বয়ান ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত : বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ

ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত : বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি জরুরি ছিল

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কি জরুরি ছিল

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম