Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

প্রত্যাশা আছে অনেক

Icon

গৌতম কুমার রায়

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রত্যাশা আছে অনেক

Advertisement

পৃথিবীর মানচিত্রে মঙ্গল কাব্যের ইতিহাসখ্যাত জাতি আমরা। আমাদের অর্জন আছে, বিসর্জনও আছে। আমরা যাত্রা যেমন করতে পারি, আবার অন্যের যাত্রা ভঙ্গও করতে পারি। রাজনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতায় রাষ্ট্রের কাছে কোনো প্রত্যাশা করতে যেন ভুলেই গেছি।

ভৌগোলিক আঙিনায় সবাই বাঙালি হলেও অনেকের প্রকৃত সত্তা যেন তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘু। তবে সংখ্যালঘু হিসেবে যারা সবসময় এদের ভাবে আমার ধর্মীয় অভিভাবক, তারা অন্তত তাদের ধর্মটার ছিটেফোঁটাও বাস্তব জীবনে ব্যবহার করে বলে প্রমাণ মেলে না।

সভ্যতার শুরু থেকে ধর্মে বিভেদ ছিল, সভ্যতার রাইজিং সময়েও তা আছে। এ বিভেদই যুগে যুগে কাউকে অধিকার ও সম্পদ হারা করেছে, আবার কাউকে তা অনৈতিক অর্জনে সহায়তা দিয়েছে।

আমার কাছে স্বাধীনতার একটা সজ্ঞা আছে। আসলে স্বাধীনতা পৃথিবীর কোনো প্রাণীর জন্য অসম্ভব। কেননা প্রতিটি প্রাণী কোনো না কোনো কারণে তার স্বকীয়তাকে পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারে না।

বাধা পেয়ে তারা জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। এমনকি মানুষও তার গোষ্ঠীতে, পরিবারে, সমাজে, নিজ বা পররাষ্ট্রের প্রভাবের জন্য স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। নীতি, ধর্ম, আইনের জন্য অন্যের অধীন চলে যেতে বাধ্য হয়ে পড়ে।

আমাদের ভোগ-বিলাসের উপভোগ্যতার অভাব, নেতৃত্বশূন্যতার কারণ, অধীনতাকে মেনে নেয়া, দয়া-দাক্ষিণ্যের প্রাপ্তিতে আসল প্রাপ্তিকে গ্রহণ না করা, যোগ্যতার অভাব ইত্যাদি কারণে আমরা দীর্ঘদিন অন্যের দ্বারা শোষিত হয়ে এসেছি। এ জন্য গোটা বিশ শতকে আমাদের আন্দোলন হল নিজেদের মধ্যে মারামারি-হানাহানি, এমনকি নিজেদের ভূখণ্ডকে বিভক্তি করতে বাধ্য করা। এ কারণে প্রকৃত কোনো স্বাধীনতা আমরা কখনও পাইনি।

তাই ১৯৭১ সালে এসে আমাদের জাতিগত এবং মানচিত্রে স্বাধীনতার বিষয়টি বাস্তবায়ন ছিল এক অবশ্যম্ভাবী ঘটনা। মানচিত্রে স্বাধীনতা পেয়েও পরবর্তী সময়ে আবারও আমরা জাতিগত ও অধিকারগত স্বাধীনতার জন্য দাবি আদায়ের আন্দোলন করে এসেছি। যদি অর্থনৈতিক মুক্তি আন্দোলনের কথা বলি, তবে তা আগেও যেখানে ছিল, এখনও সেখানেই রয়েছে।

তবে পার্থক্য এতটুকুই- ঋণের বা ধারের টাকায় কারও কারও পকেট ভারি হলেও বোঝার দায় চেপেছে সবার পড়ে। যে জাতির স্বাধীন একটা ভূখণ্ড থাকে, সেই ভূখণ্ড অতি উর্বর হয়। তাদের কর্মঠ হাত থাকে।

মাটিতে মুখের কুলি ফেললে গাছ জন্ম নেয়। অফুরন্ত জলরাশি থাকে, যে জলের স্রোত শক্তি তৈরি করতে পারে। এ শক্তির জন্য জলজপ্রাণী বংশ সৃজন করে থাকে। কীটপতঙ্গ গান গেয়ে পরাগায়ন ঘটিয়ে ফল ও ফসল জন্ম দেয়। সে জাতির ভাগ্যে ধার বা হাত পেতে নেয়ার প্রয়োজন হয় না।

অন্য সবসময় বাদ দিলে ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন নবাবি যুগের গোড়াপত্তন হয়ে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ নবাবি আমলের অবসান পর্যন্ত সময়ে যে শাসন ছিল, সেখানেও ছিল অধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষা। এরপর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সময়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় উপমহাদেশের মানুষের আত্মআকাঙ্ক্ষার তেমন কোনো প্রতিফলন না ঘটায় দাবি আদায়ের পরিপ্রেক্ষিত পথ তৈরি হওয়াটা জরুরি হয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের আগে-পরের সময়ে শাসনের প্রকৃতি ভিন্ন হলেও জাতির মৌলিক চাহিদার বিষয়টি ঠিক একই ছিল। সে জন্য পরনির্ভর রাজনীতি, ঋণনির্ভর অর্থনীতি এবং শোষণনির্ভর শাসননীতি আমাদের পরিবর্তনের মৌলিকতায় বিশ্বাস জোগাতে পারেনি। এর ফলে আকাঙ্ক্ষার স্তূপে আমরা দিন দিন তার পরিধি বাড়িয়েছি।

আর অবিশ্বাসের জন্য আমাদের হতাশাকে জিইয়ে রেখেছি। বংশপরিক্রমার শাসনকাল থেকে মোগল আমল। তারপর কোম্পানি থেকে ’৪৭-এর স্বাধীনতা। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ’৭৫-পরবর্তী সময় আমাদের শাসন ও শোষণের নিয়ামক শক্তির জোগান ছিল বর্ণ ও ধর্মের ভেদাভেদে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সময়ে মানুষের লাইফস্টাইলে যতটা পরিবর্তন এসেছে, তার থেকেও ভয়ংকর পরিবর্তন এসেছে ধর্মীয় জঙ্গিবাদে। সময়ের মহাকালে ধারার পরিবর্তন ও পরিবর্ধনে এতটুকুও পিছিয়ে নেই ধর্মান্ধ উন্মাদনা। আইনের পরে আইন করে, সঙ্গে সভ্যতার বাণী ছিটিয়েও এর কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করা যাচ্ছে না।

দিব্যজ্ঞানে এখন আমাদের সাধুর সন্ধান করতে হবে। সাধু যদিও শয়তানের ভয়ে সন্ত্রস্ত। স্বাধীনতার পর আসলে অনেকটা সময় পিছিয়েছে। ’৭১-এর মৌলিক ধারায় যেতে না পারলেও শাসকের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য ধর্মকে উপস্থাপন করা হয়েছে স্তম্ভের নিরপেক্ষতার জায়গায়। আর সুশাসনের সমস্যা এখানেই। জঙ্গিবাদের এতটুকু আস্ফালনের জোগান এলেও এসেছে এখান থেকেই। নিরপেক্ষতার জায়গায় শূন্যতা। পক্ষতার গায়ে যেন প্রলেপ লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।

বছর এসেছিল বলেই তা চলে গেল। তবে আবার এসেছে বছর। ২০২০ খ্রিস্টাব্দ। এক বছর আগে যখন ২০১৯-কে বরণ করেছিলাম, তখন অনেক প্রত্যাশার ডালপালা ছড়িয়ে ছিল মনে-চোখে। এর কোনোটা আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি আবার কোনোটা পারিনি। যেমন অনেক ক্ষতবিক্ষত স্বাধীনতার মর্মস্পর্শী স্লোগান ‘জয় বাংলা’ রাহুমুক্ত হয়েছে ২০১৯ সালে। এ বছরে গুজব আমাদের বিশ্বাসের নীতিতে চির ধরিয়েছে।

ছেলেধরা গুজব, লবণ গুজব, পেঁয়াজ গুজব। ভোলার ধর্মীয় ও ঢাকার ছেলেধরা গুজবে মানুষ হত্যা আমাদের বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করেছে। আমাদের শিক্ষায় দুর্বলতা, সচেতনতায় অভাব এবং আইন প্রয়োগে শৈথিল্য এহেন ঘটনাগুলো সৃষ্টির জন্য দায়ী।

২০২০ সাল। নতুন বছরের প্রত্যাশা বেশ জোরালো। আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, বাঙালি ও বাংলা ইতিহাসের রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। সঙ্গত কারণে আমি জাতির পিতার মনের মতো, তার দৃষ্টিতে লালিত সোনার বাংলা চাই। সোনার মানুষ চাই। ’৭১-এ যেমনটি চেয়েছিলেন শহীদরা এবং এখনও বেঁচে থাকা আত্মত্যাগী ও মহিমান্বিত মুক্তিযুদ্ধের মানুষ।

মানুষের মাঝে মানুষের ভেদবৃত্তান্ত মৌলবাদ, উগ্রবাদ, পুঁজিবাদ, বর্ণবিষ, সাম্প্রদায়িক শিষ্টাচার, নীতির কমিশনভোগী, শিক্ষার পণ্য-গণ্যতা বন্ধ হোক। ছাত্র যেন শিক্ষকের প্রতি তার মূল্যবোধে শ্রদ্ধাশীল হয়। মাটি আর মানুষের সন্ধি হোক। লাঙল ও মাটির সম্পর্ক ঘটুক কৃষকের সঙ্গে, যেন সে উৎপাদনের উদারতায় আশ্রিত হতে পারে। শ্রমে ফিরে আসুক শ্রমিকরা। সমাজ থেকে দারিদ্র্যের জীবাণু বিনাশ হোক।

বনে বনে বৃক্ষ সৃজন হোক। লতাগুল্মে, কীটপতঙ্গে, পাখি আর পশুর কোলাহলে স্বর্গ মাতিয়ে উঠুক সুন্দরবন। নদী কথা বলুক তার বুকভরা জলের সঙ্গে, জলজ সব প্রাণীর সঙ্গে। আশ্রিত রোহিঙ্গারা যেন ফিরে পায় তাদের আপন ভূমি। রূপায়ণের ভিত্তিতে দাঁড়াক ২০২১ রূপকল্পের প্রতিশ্রুতি।

নতুন বছরের প্রকৃতির কাছে আমার অনেক দাবি আছে, প্রত্যাশা আছে, তবে তা আদায়ে কোনো কর্মসূচি নেই। এ জন্য সেও বিগড়ে যেতে পারে।

গৌতম কুমার রায় : প্রাবন্ধিক, গবেষক

 

Advertisement

প্রত্যাশা

Advertisement

আরও পড়ুন

সিলিন্ডার বিস্ফোরণ : থামাতে হবে ব্যর্থতার শৃঙ্খল

সিলিন্ডার বিস্ফোরণ : থামাতে হবে ব্যর্থতার শৃঙ্খল

জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনায় পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার

জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনায় পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার

বিশ্বরাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ আনছেন শি জিনপিং

বিশ্বরাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ আনছেন শি জিনপিং

আত্মসমীক্ষার রাজনীতি : ব্যারিস্টার রাজ্জাকের দৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী

আত্মসমীক্ষার রাজনীতি : ব্যারিস্টার রাজ্জাকের দৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম