মাধ্যমিকে ‘আবশ্যকীয়’ হোক ভূগোল
Advertisement
মু. শামসুল আলম
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানদীপ্ত করে মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটায়। একটি দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে শিক্ষার গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বলাই বাহল্য। বিশ্বায়নের এ যুগে সময়োপযোগী শিক্ষা কার্যক্রম প্রণয়ন করাটা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক থেকে শুরু করে শিক্ষার সব পর্যায়ের সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যক্রম প্রণয়ন দেশের অগ্রগতির জন্য জরুরি।
বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে হলে অবশ্যই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত, বিজ্ঞান, কারিগরি ও কম্পিউটার প্রকৌশল শিক্ষার পাশাপাশি টেকসই (সুস্থায়ী) উন্নয়ন ও বিদেশি ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ভূগোল এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার, একটি সমন্বিত ও সামগ্রিক বিজ্ঞান, যেখানে ‘মানব-ধরিত্রী’ (human-earth) নিয়ে অধ্যয়ন করা হয়। ভূগোল বিষয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। তবে পরিতাপের বিষয়, ভূগোল সম্পর্কে আমাদের পরিপূর্ণ জ্ঞানার্জনের সুযোগ সীমিত হওয়ায় এ বিষয়ে অধিকাংশ মানুষের ধারণাই অসম্পূর্ণ অথবা কিছুটা ভ্রান্ত। অনেকেরই ধারণা, ‘ভূ’ অর্থ পৃথিবী এবং ‘গোল’ অর্থ গোলাকার এবং এ গোলাকার পৃথিবী সম্পর্কে জানাই হচ্ছে ভূগোল। অন্যদিকে কিছু মানুষের ধারণা, মহাদেশ, মহাসাগর, আবহাওয়া-জলবায়ুসহ দেশ ও স্থানের বর্ণনাই ভূগোল।
ভূগোলের দশটি প্রধান বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নিয়ামক হচ্ছে- অবস্থান, স্কেল, দূরত্ব, বণ্টন, চলাচল, অঞ্চল, পরিবর্তন, প্রক্রিয়া, স্থানিক সম্পর্ক (spatial association) ও স্থায়িত্ব (sustainability)। ভূগোলবিদরা শাস্ত্রটির যে কোনো বিষয়বস্তু যেমন- পৃথিবী, মানুষ, পরিবেশ, জলবায়ু, প্রাকৃতিক সম্পদ ইত্যাদির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি ব্যাখ্যা ওই দশটি নিয়ামকের আলোকেই বিচার-বিশ্লেষণ করে থাকেন। ভূগোল অধ্যয়ন ছাত্রছাত্রীদের শুধু বিভিন্ন ভৌগোলিক প্রপঞ্চের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মুখ্য বিষয়গুলোকে অবলোকন, অনুধাবন, বিশ্লেষণ, সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের জন্য প্রস্তুতই করে না; এ শাস্ত্র অধ্যয়নের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তৈরি হয় একটি শক্তিশালী বুনিয়াদ।
ভূগোলের টেকসই উন্নয়ন শিক্ষা বর্তমান পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জটিল ও অনিরাপদ পরিবেশকে অনুধাবনের পথনির্দেশক বলা যেতে পারে। ভৌগোলিক তথ্যের ভিত্তিতে যে কোনো বিষয়ের অনিশ্চয়তা, সংকট ও বিশৃঙ্খলার পূর্বাভাস প্রদান সম্ভব, যা স্থায়িত্বের মুখ্য বিষয়গুলো বিবেচনার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ভিত্তি প্রদান করে। টেকসই উন্নয়ন শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সামগ্রিক (holistic) এবং ভূগোল শাস্ত্রেই রয়েছে এ সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। ভূগোল শিক্ষা ব্যক্তিকে নিজ ও সমাজের আচরণের প্রভাব সম্বন্ধে সচেতন এবং পারিপার্শ্বিকভাবে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তথ্যভাণ্ডার, দক্ষতা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে। টেকসই উন্নয়ন শিক্ষার জন্য ভূগোল অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যার কারণগুলো হচ্ছে- ক. জীবন সহায়ক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বিষয়ে জ্ঞানার্জন, খ. অবস্থান ও স্থানের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে জানা, গ. পরিবেশের পরিবর্তন অনুধাবন করা, ঘ. এলাকা, দেশ, অঞ্চল ও বিশ্বের মানচিত্র প্রণয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ অনুধাবন সহজতর করা, ঙ. প্রাকৃতিক ও মানবিক প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে পৃথিবীপৃষ্ঠ ও তার পরিবেশের পরিবর্তন করে তা ব্যাখ্যা করা, চ. স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক পর্যায়ে পারিসরিক বণ্টন শনাক্তকরণ, ছ. জনগণ ও স্থানের জটিল সংযোগ অনুধাবন, জ. প্রাকৃতিক ও সামাজিক সম্পর্কযুক্ত বিষয় সম্পর্কে বিচক্ষণ বিচার-বিশ্লেষণ, ঝ. মানবজাতির আবাস হিসাবে পৃথিবীর মূল্যায়ন, ঞ. ধরিত্রীর সম্পদ ব্যবস্থানায় যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ট. বৈশ্বিক আন্তঃনির্ভরশীলতা অনুধাবনের মাধ্যমে বিশ্ব নাগরিকে পরিণত হওয়া।
ভূগোল বিষয়ের পাঠগুলো টেকসই উন্নয়ন শিক্ষার মূল বুনিয়াদ হিসাবে বিবেচিত। মানব-ধরিত্রী বাস্তুতন্ত্র হলো ভূগোলের মূল বিষয়, যা কিনা টেকসই উন্নয়নেরও প্যারাডাইম। পৃথিবীর টেকসই উন্নয়ন হলো প্রাকৃতিক ও আর্থ-সামাজিক টেকসই উন্নয়ন এবং ভূগোলের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা টেকসই উন্নয়নের সব ক্ষেত্রগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। ভূগোল বিষয়ে শিক্ষা টেকসই উন্নয়ন শিক্ষার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ তা জানা জরুরি। ভূগোল শিক্ষার আন্তর্জাতিক সনদে ভবিষ্যতের টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নে ভৌগোলিক শিক্ষার সক্ষমতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। একদিকে মানব কর্মকাণ্ডের প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব এবং অপরদিকে পরিবেশের বৈসাদৃশ্য সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রযুক্তিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রভাব অনুধাবনে ভূগোল শাস্ত্রের দক্ষতা রয়েছে। ভূগোল শাস্ত্রে টেকসই উন্নয়ন শিক্ষা কেবল উচ্চমার্গের বিষয়বস্তুর জ্ঞান নয়, বরং আধুনিক গবেষণালব্ধ শিক্ষানির্ভর পড়াশোনা।
ভূগোলের মানব-পরিবেশ ঐতিহ্য স্থায়িত্বের মুখ্য বিষয়গুলো বিবেচনার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ভিত্তি প্রদান করে এবং স্থায়িত্বের পারিসরিককালীন মাত্রাগুলো, গতিপ্রকৃতি, জটিলতা ও মিথস্ক্রিয়া অনুধাবনে সহায়ক। টেকসই উন্নয়ন শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে সামগ্রিক; যা শুধু ভূগোল শাস্ত্রেরই রয়েছে। শাস্ত্রটির পারিবেশিক, নৈতিকতা উন্নয়নের সক্ষমতা রয়েছে। উল্লেখ্য, টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা দশক উদযাপনের (DESD, 2005-2014) লুসেম ঘোষণা অনেকাংশে ভূগোল শিক্ষার বিষয়বস্তুর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ভূগোল শিক্ষায় ‘মানব-ধরিত্রী’ বাস্তুতন্ত্রের সব বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলা অত্যুক্তি হবে না।
ভূগোলের সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে একরকম প্রকৃতি প্রদত্ত বলা যেতে পারে এবং এ কারণেই বিষয়টি একটি সৃজনশীল বিষয় হিসাবে স্বীকৃত। সৃজনশীল চিন্তার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভূগোলের ছয়টি মুখ্য পদক্ষেপ হলো- সমস্যার পর্যবেক্ষণ; সমস্যার সম্ভাব্য কারণ নিরীক্ষণ; সমস্যা সমাধানে বিকল্প ব্যবস্থা চিহ্নিতকরণ; সমস্যা সমাধানের দৃষ্টিভঙ্গি নির্বাচন; সমাধান পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সমস্যা নিষ্পত্তির শুদ্ধতার পরীক্ষণ। এসব বিষয়ই টেকসই উন্নয়ন শিক্ষার জন্য আবশ্যক। একইসঙ্গে ভূগোল টেকসই আচরণের বিষয়েও সচেতনতা সৃষ্টি করে। ভূগোলের প্রপঞ্চ ও প্রক্রিয়াগুলোর সমন্বিত জ্ঞান বর্তমান বিশ্বায়নের জটিলতর বিশ্বের টেকসই উন্নয়ন সমস্যা অনুধাবন ও সমাধানে এক গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান।
আমাদের দেশে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক পর্যায়ে ভূগোল সব শাখার জন্যই আবশ্যক ছিল; যা এখন কেবল মানবিক শাখার জন্যই আবশ্যক। বিজ্ঞান শাখার ছাত্রদের ভূগোলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে, যেখানে ভৌগোলিক তথ্য সন্নিবেশনে উচ্চতর গণিতের কৌশল অবলম্বন হয়ে থাকে। বিজ্ঞান শাখার ছাত্রদের যদিওবা ৪র্থ বিষয়ের গুচ্ছ থেকে ভূগোল নেওয়ার সুযোগ থাকে, তবে তা বিভিন্ন মহল থেকে নিরুৎসাহিত ও প্রচারণার অভাবে হাতেগোনা কিছু ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা নিয়ে থাকে। এমনকি উচ্চমাধ্যমিকে এসেও ভূগোল বিষয়টি ৪র্থ বিষয় হিসাবে ঠাঁই পায়। সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ভূগোল বিষয়টি ৩য় বিষয়ে উন্নীত হয়েছে, তবে এখনো সেটি অনেকটা গুরুত্বহীনভাবেই সেখানে অবস্থান করছে।
দেশের পাঠ্যক্রম নির্ধারণী সংস্থা ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড’ (NCTB) এক অজানা কারণে প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ভূগোল বিষয়ের অতি সাধারণ বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত করা থেকে দূরে রয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটা শ্রেণির জন্য ভূগোল বিষয়ের সামান্য কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তাতে বিষয়সূচির ধারাবাহিকতা মোটেই লক্ষ করা যায় না। নির্দিষ্ট কিছু শিখন ফল সামনে রেখে এ কারিকুলাম তৈরি করা হয়েছে সেটাও মেনে নেওয়া কঠিন। এর ফলে দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সমতুল্য দূরে থাক, নিজ দেশের প্রাথমিক ভৌগোলিক জ্ঞান লাভ করা থেকেও বঞ্চিত থাকেন। বর্তমানের দ্বাদশ শ্রেণির ভূগোল বইগুলোর মানও আগের তুলনায় অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও পরের বিষয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ আমাদের এ দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন ও অভিযোজন এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে নতুন প্রজন্মের জন্য ভৌগোলিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বিশ্ব পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এ কারণে ভূগোল শিক্ষাদান আবশ্যক। ভবিষ্যৎ পরিবর্তনশীল বিশ্বের জ্ঞানার্জনে যে কোনো বিষয়ের চেয়ে ভূগোলের গুরুত্ব বেশি। সুতরাং ‘মানব-ধরিত্রী’ ও তার পরিবর্তনশীল অবস্থা নিয়ে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন শিক্ষার জন্য ভূগোল শিক্ষা মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শাখার আবশ্যকীয় বিষয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে টেকসই উন্নয়ন শিক্ষা প্রদানপূর্বক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ আমাদের দেশ তথা ধরিত্রীর বসবাসযোগ্যতা কিছুটা হলেও নিশ্চিত করা যেতে পারে।
মু. শামসুল আলম, বীরপ্রতীক : প্রাবন্ধিক
