Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

৭ নভেম্বর ও শহীদ জিয়ার কালজয়ী রাষ্ট্রদর্শন

Icon

মাহ্দী আমিন

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

৭ নভেম্বর ও শহীদ জিয়ার কালজয়ী রাষ্ট্রদর্শন

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। ফাইল ছবি

Advertisement

ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে কিছু বিশেষ দিন এমনভাবে আবির্ভূত হয়, যা কোনো একক রাজনৈতিক ঘটনা কিংবা সাময়িক ক্ষমতার পালাবদলের চেয়েও বহুগুণ বেশি গভীর ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বহন করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের মহান স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়ের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দিনটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় মর্যাদার এক অমোঘ রক্ষাকবচ হিসাবে ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে রয়েছে।

১৯৭৫ সালের আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে এনেছিল এ দেশের সব শ্রেণি ও পেশার সাধারণ মানুষ এবং দেশপ্রেমিক সিপাহি ও জনতার এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব। কারণ দেশের মানুষের গভীর আস্থা, ভালোবাসা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি শুধু একজন সামরিক অধিনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অবিনাশী প্রতীক। জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম, প্রজ্ঞা, সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব, অসামান্য সাহসিকতা ও দৃঢ় দূরদর্শিতার মুখে মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় দেশ ধ্বংসকারী যাবতীয় অপচেষ্টা।

এই আস্থার শেকড় প্রোথিত ছিল ১৯৭১ সালের সেই রক্তঝরা কালরাতে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, দিশেহারা জাতি যখন গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত, ঠিক তখনই কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান আবির্ভূত হয়েছিলেন জাতির ত্রাণকর্তা হিসাবে। সুনিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে তিনি স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার সেই প্রত্যয়ী কণ্ঠের ডাকেই দিকভ্রান্ত জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শুধু ঘোষণাপত্র পাঠ করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, রণাঙ্গনে জেড ফোর্সের অধিনায়ক ও সেক্টর কমান্ডার হিসাবে সম্মুখ সমরযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বীরত্বের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সেদিন যদি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিতেন, তবে আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়তো আরও দীর্ঘ ও প্রলম্বিত হতো।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার পর একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েম করে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। চারদিকে যখন সীমাহীন নৈরাজ্য ও সার্বভৌমত্ব হারানোর গভীর আশঙ্কা, তখনই আসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে ৩ নভেম্বর একদল চক্রান্তকারী জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেশের সাধারণ সিপাহি ও জনতার আত্মিক বন্ধন কতটা নিবিড়। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে সেনানিবাসের দেওয়াল ভেঙে রাজপথে নেমে আসে সাধারণ সৈনিক ও মুক্তিকামী জনতা। ৭ নভেম্বরের সেই রক্তহীন বিপ্লব চক্রান্তকারীদের যাবতীয় অপচেষ্টাকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে আনে। এবং স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের ওপর আস্থা রাখে সিপাহি জনতা ও দেশের প্রত্যেক স্বাধীনতাকামী মানুষ।

জিয়াউর রহমানের কালজয়ী নেতৃত্বে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ এক অলৌকিক পুনর্জীবন লাভ করে। কালের পরিক্রমায় তিনি জাতিকে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের মোহনায় সমবেত করেছিলেন। স্বাধীনতার পর চাপিয়ে দেওয়া বিভেদ সৃষ্টিকারী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে তিনি প্রবর্তন করেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। এটি শুধু একটি ধারণাগত রাজনৈতিক শব্দবন্ধ নয়, বরং এটি পাহাড় ও সমতল, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, মত, পথ ও আদর্শ নির্বিশেষে এ ভূখণ্ডের প্রত্যেক নাগরিককে একই পতাকাতলে একত্রিত করার সার্বজনীন দর্শন। এ দর্শনের বলেই পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একজন মানুষও সমান নাগরিক মর্যাদায় বলতে পারেন, ‘আমি বাংলাদেশি’।

জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র। বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাদপত্রের ওপর থেকে কালো আইন ও নিবর্তনমূলক বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে নিশ্চিত করেছিলেন গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করতে তিনি যে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার শুরু করেছিলেন, তা ছিল যুগান্তকারী। সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি স্বল্পতম সময়ে বহুবিধ কল্যাণকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

জিয়াউর রহমানের অসামান্য রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রশাসনিক দূরদর্শিতা বাংলাদেশকে একটি তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ থেকে মুক্ত করে বিশ্বমঞ্চে স্বাবলম্বী ও কর্মক্ষম রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপনে তিনি সিভিল সার্ভিসকে গতিশীল করেন, দুর্নীতি দমন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে আনেন বৈপ্লবিক সংস্কার। প্রশাসনকে কেতাবি খামখেয়ালিপনা থেকে বের করে জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি গ্রাম সরকার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের মাধ্যমে তৃণমূলের ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করেন। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমেই বাংলার অবহেলিত গ্রামগুলো প্রথম প্রদীপের আলো থেকে আধুনিক বিদ্যুৎ সুবিধার দিকে ধাবিত হতে শুরু করে।

আজকের আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনীতির যে দুটি প্রধান চালিকাশক্তি, তার উভয়টিরই মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। প্রথমত, তৈরি পোশাক বা গার্মেন্ট শিল্প, যা আজ লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান মাধ্যম। ব্যাকগ্রাউন্ড লিংক ব্যবস্থার নীতি তৈরি ও বন্ডেড ওয়ারহাউজ সুবিধার মাধ্যমে তিনি বেসরকারি উদ্যোগের মহাসড়ক উন্মুক্ত করেন। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে জনশক্তি রপ্তানি, যা আমাদের বিশাল জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে সম্পদে পরিণত করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পথ উন্মুক্ত করেছিল।

কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে জিয়াউর রহমান সূচনা করেছিলেন ঐতিহাসিক ‘খাল খনন কর্মসূচি’। কোটি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজে কোদাল হাতে নেমে পড়েছিলেন নদীনালা ও সেচব্যবস্থার আধুনিকায়নে। চালু করেছিলেন যুগান্তকারী ‘সবুজ বিপ্লব’, যার ফলে কৃষক সহজ শর্তে সার ও বীজ পেয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার সংগ্রামে বিজয়ী হয়েছিল। ভূমি সংস্কার এবং কৃষি ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে তিনি কৃষককে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন। পাশাপাশি পরিবেশের সামঞ্জস্য ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় তিনি সূচিত করেছিলেন ব্যাপকভিত্তিক ‘দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’।

মাত্র চার বছরের রাষ্ট্রপরিচালনায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে অন্তত চার দশক এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ সংযোজন এবং ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ স্থাপন করেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তিনি একমুখী ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির দেওয়াল ভেঙে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আত্মমর্যাদাশীল সার্বভৌম ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। তিনি মুসলিম উম্মাহ ও ওআইসির সঙ্গে ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের জন্য এক শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করেন। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার অনন্য কালজয়ী ফোরাম হিসাবে ‘সার্ক’-এর রূপরেখাও ছিল তারই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ফসল।

আজ হয়তো শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার আদর্শ, তার দেশপ্রেম এবং ৭ নভেম্বরের জাতীয় সংহতির চেতনা কোটি কোটি দেশপ্রেমিক জনতার হৃদয়ে চিরজাগরূক। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে যেভাবে সিপাহি-জনতা এক হয়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিল, আজও সেই একই সংহতি নিয়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসুন, সুদৃঢ় ঐক্যের মাধ্যমে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি স্বাবলম্বী, সমৃদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করি। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ আবারও মাথা উঁচু করে নিজের মর্যাদার আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করবে।

মাহ্দী আমিন : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

এদিন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়

এদিন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়

৭ নভেম্বর ও শহীদ জিয়ার কালজয়ী রাষ্ট্রদর্শন

৭ নভেম্বর ও শহীদ জিয়ার কালজয়ী রাষ্ট্রদর্শন

সাত নভেম্বরের প্রাপ্তি

সাত নভেম্বরের প্রাপ্তি

বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং জিয়াউর রহমান

বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং জিয়াউর রহমান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম