Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং জিয়াউর রহমান

Icon

ব্রি. জে. মো. আব্দুল হক (অব.)

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং জিয়াউর রহমান

Advertisement

সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মানুষের কাছে প্রতিশ্রুত সব আশা-আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময়ে এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ ও ভয়ংকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। কার্যত শেখ মুজিবুর রহমানের কোথাও কোনো কর্তৃত্ব ছিল বলে প্রতীয়মান হয় না। ১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে তিনি যে বক্তব্য প্রদান করেন। তা শুনলে কেবল তার তীব্র হতাশাই প্রকাশ পায় এবং দেশের চরম খারাপ পরিস্থিতিরও ইঙ্গিত দেয়। রাজনীতিকরা পুরোপুরিই ব্যর্থ ছিলেন। দেশের সর্বত্রই অরাজকতা বিরাজমান ছিল। দেশের মানুষ ছিলেন মারাত্মক অশান্তিতে। আর সামরিক বাহিনীতে ছিল ভয়াবহ হতাশা ও অসন্তোষ। এমতাবস্থায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পরিবর্তনের কোনো গণতান্ত্রিক পথই খোলা ছিল না।

অবশেষে, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ও সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচারের পতনে দেশ রাহুমুক্ত হলে দেশবাসী আনন্দে উল্লাস প্রকাশ করে। শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তারই বিশ্বস্ত সহযোগী খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় তৎকালীন সংসদের স্পিকার আবদুল মালেক উকিল লন্ডনে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘দেশ ফেরাউন মুক্ত হয়েছে’। মোশতাকের মন্ত্রিসভায় বাকশালের ২১ জন মন্ত্রী শপথ গ্রহণ করেন। তিন বাহিনী প্রধান, পুলিশের আইজি, বিডিআর মহাপরিচালকসহ সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নতুন সরকারের আনুগত্য প্রকাশ করেন। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসাবে যোগদান করলেন জেনারেল এমএজি ওসমানী। ২৫ আগস্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নিযুক্ত করা হয় সেনাবাহিনী প্রধান হিসাবে। জেনারেল জিয়া সেনাপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা, হিংসা-বিদ্বেষ, ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্তিশালী সুশৃঙ্খল একটি সেনাবাহিনী পুনর্গঠনে মনোযোগী হলেন। উল্লেখ্য, ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে মুক্তিযোদ্ধা সদস্যরাই নেতৃত্ব প্রদান করেন।

ইতোমধ্যে খন্দকার মোশতাকের নতুন এ সরকারকে মুসলিম দেশগুলোসহ অনেক দেশই স্বীকৃতি প্রদান করতে থাকল। এভাবেই দেশটি এগিয়ে চলছিল শান্তি, প্রগতি, উন্নতি ও স্থিতিশীলতার পথে। কিন্তু তা সহ্য করতে পারছিলেন না ভারতের পোষ্য কিছু কিছু হিংসুক ষড়যন্ত্রকারী। দেশবাসী মেনে নিলেও একজন ব্যক্তিত্ব দেশের এ পরিবর্তন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কেননা, তিনি দেশ ও জনগণের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি বা পারিবারিক স্বার্থটাই প্রাধান্য দিয়েছিলেন বেশি। এ ব্যক্তিটি ছিলেন মরহুম কর্নেল শাফায়াত জামিল। তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন তার এ বক্তব্যে-‘১৫ আগস্টের পর থেকেই অভ্যুত্থানকারী খুনিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার একটা চিন্তা কাজ করছিল আমার মধ্যে। সমমনা কিছু অফিসারের মৌন সমর্থনও আমার পেছনে ছিল জানতাম। ১৯ আগস্ট সেনা সদরে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে ফারুক ও রশিদের উপস্থিতিতে আমি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করি, দেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হবে। অবৈধ খুনি রাষ্ট্রপতি মোশতাককে আমি মানি না এবং প্রথম সুযোগেই তাকে আমি পদচ্যুত করব। অফিসারদের অনেকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কিছু একটা করার তাগিদ ও নৈতিক সমর্থন দিচ্ছিলেন আমাকে। সেনা আইনে এগুলো গর্হিত অপরাধ। কিছু একটা করতে চাইছিলাম। কিন্তু পক্ষ-বিপক্ষ চেনা ছিল মুশকিল তখন। তবে বুঝতে পারছিলাম, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও অন্যান্য শৃঙ্খলাপরায়ণ ও নীতিমান কিছু অফিসারের সমর্থন আমি পাব।...

অক্টোবরের ২৮-২৯ তারিখ হবে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ আমাকে বললেন, ‘কিছু কি ভাবছ? এ পরিস্থিতিতে দেশ ও আর্মি চলতে পারে না। জিয়া এগিয়ে আসবে না। ডু সামথিং।’ ব্রিগেডিয়ার খালেদের সঙ্গে রক্ষীবাহিনী প্রধান ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের আলাপ হয়েছিল এ ব্যাপারে। খালেদ আমার মত চাইলেন। আমি বললাম, ‘আপনি দিন-তারিখ বলেন। আমি প্রস্তুত।

১ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান ও আমি খালেদের অফিসে বসলাম। বিস্তারিত আলোচনার পর খালেদ সিদ্ধান্ত দিলেন, ২ তারিখ দিবাগত রাত ২টায় বঙ্গভবনে মোতায়েন আমার দুটো কোম্পানি ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসবে, সেটাই হবে অভ্যুত্থান শুরুর ইঙ্গিত।’- (সূত্র : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর, লেখক : কর্নেল শাফায়াত জামিল, পৃষ্টা : ১৩০-১৩২)

১৫ আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শফিউল্লাহর দুর্বল কমান্ডের কারণে সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন মতের, পথের, আদর্শের গ্রুপিং শুরু হলে চেইন অব কমান্ড নড়বড়ে হয়ে পড়ে। দেশের অবস্থাও যখন টালমাটাল, সে সময়ে অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট মোশতাক সরকার মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে শফিউল্লাহর স্থলাভিষিক্ত করলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৃতীয় সেনাপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের আড়াই মাসের মাথায় নভেম্বর মাসের ৩ তারিখে কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বাধীন ঢাকা ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের সহায়তায় বীরউত্তম মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান ও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে চিফ অফ-আর্মি স্টাফ হিসাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে গৃহবন্দি করে রাখা হয়, যা সেনাবাহিনীর মধ্যে তার বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে অত্যন্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় এবং জিয়ার প্রতি অবিচার করায় ক্ষুব্ধ সেনাসদস্যরা ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা পালটা অভ্যুত্থান ঘটায় এবং জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করে পুনরায় সেনাপ্রধান পদে আসীন করানো হয়।

উল্লেখ্য, ওই সময়কার নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে লে. কর্নেল আবু তাহের চাচ্ছিলেন সমাজতন্ত্র কায়েম করে গণবাহিনী প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ফলে তারই প্রতিষ্ঠিত ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকরা ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই; হাবিলদারের উপর অফিসার নাই’ ইত্যদি স্লোগান ও লিফলেট বিতরণ করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে নির্বিচারে ১৪ জন অফিসারকে হত্যার মাধ্যমে কর্নেল তাহের, হাসানুল হক ইনু, মেজর জলিল, আসম আব্দুর রব তাদের জিঘাংসা চরিতার্থ করেন।

মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর অশেষ রহমতে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়ে নড়বড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। দেশে তখন কার্যত কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। ফলে দেশের এ দুঃসময়ে জিয়াউর রহমান একমাত্র জনপ্রিয় সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা হিসাবে আবির্ভূত হন এবং তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। জিয়াউর রহমান তখন এমনই জনপ্রিয় ছিলেন যে, পরে সামরিক বাহিনীর সব সদস্য এবং রাজনীতিবিদ ও তাদের কর্মীরাও তাকে দেশের সরকার পরিচালনার শীর্ষপদে আসীন করান।

অনেকেই যে দেশদ্রোহিতা করেছেন তা ছিল ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। দেশে ও সামরিক বাহিনীতে অরাজকতা সৃষ্টির মাধ্যমে জাসদ যেরকম বিশৃঙ্খলতার মধ্যে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল তাতে তাদের অনেক নেতারই মৃত্যুদণ্ড হওয়াই ছিল যথাযথ বিচার। এমনকি ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সব দায়ও তাদের ওপর দেওয়া যেত। কিন্তু জিয়া বাস্তবতার নিরিখে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রকৃত অপরাধী তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও অন্যদের ক্ষমা করে দেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আব্দুল হক, পিএসসি (অব.) : নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

এদিন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়

এদিন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়

৭ নভেম্বর ও শহীদ জিয়ার কালজয়ী রাষ্ট্রদর্শন

৭ নভেম্বর ও শহীদ জিয়ার কালজয়ী রাষ্ট্রদর্শন

সাত নভেম্বরের প্রাপ্তি

সাত নভেম্বরের প্রাপ্তি

বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং জিয়াউর রহমান

বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং জিয়াউর রহমান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম