ঢালিউডে সিনেমার প্রচারণায় মিথ্যাচার
তারকানির্ভর প্রচার, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি, অস্পষ্ট ব্যবসায়িক হিসাব আর দুর্বল নির্মাণ-সব মিলিয়ে ঢালিউডে সিনেমার প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। মুক্তির আগে যে সিনেমাকে ঘিরে তৈরি হয় আকাশচুম্বী প্রত্যাশা, পর্দায় তা পূরণ না হলে দর্শকের হতাশা গিয়ে পড়ে পুরো ইন্ডাস্ট্রির ওপর। সাময়িক প্রচারণার সাফল্য কি শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে? কেউ কেউ বলেন, এটা দর্শক টানার কৌশল। আবার কারও মতে, এটা ইন্ডাস্ট্রির আত্মঘাতী প্রবণতা। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
এফ আই দীপু
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিনেমা মুক্তির আগে প্রচারণায় বড় আয়োজন, তারকার মুখে অসাধারণ গল্পের প্রতিশ্রুতি, নির্মাতার মুখে আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণের দাবি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবসাসফল হওয়ার নানা ঘোষণা-ঢালিউডে এসব পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু মুক্তির পর অনেক সময় দর্শকের অভিজ্ঞতা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। গল্পের দুর্বলতা, চিত্রনাট্যের অসংগতি, সম্পাদনা ও শব্দের সমস্যা কিংবা প্রচারণায় ইঙ্গিত দেওয়া বিষয়বস্তুর অনুপস্থিতি নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা। প্রশ্ন হচ্ছে, নির্মাতা-প্রযোজকেরা কি জেনেশুনে দর্শককে বিভ্রান্ত করেন, নাকি দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা তাদের অতিরঞ্জিত প্রচারণার দিকে ঠেলে দেয়?
* প্রচারণা যখন সিনেমার বিকল্প
সিনেমার প্রচারণার উদ্দেশ্য হচ্ছে দর্শককে প্রজেক্টটি সম্পর্কে আগ্রহী করা। কিন্তু প্রচারণা যখন সিনেমার প্রকৃত মানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন সেটি বিপজ্জনক। কারণ দর্শক শেষ পর্যন্ত টিকিট কেনেন একটি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার আশায়। প্রচারণায় সেই অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সিনেমায় তা দিতে না পারলে দর্শকের কাছে বিষয়টি নিছক ব্যর্থতা নয়, প্রতারণা বলেও মনে হতে পারে।
চলতি বছর ঈদে মুক্তির আগে ও পরে শাকিব খান অভিনীত ‘প্রিন্স : ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ নিয়ে প্রচারণার ধরন এবং দর্শকের প্রত্যাশার ব্যবধান বেশ আলোচনায় আসে। সিনেমাটি নিয়ে পরিচালকের প্রচারণা ঘিরে শাকিব-ভক্তদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। শুধু এ সিনেমাই নয়, শাকিবের আরও কিছু সিনেমা যেমন ‘দরদ’, ‘রকস্টার’ এগুলোও নিয়ে প্রচারণায় অতিরঞ্জিত বিষয়ের অবতারনা করা হয়েছিল। অর্থাৎ তারকার জনপ্রিয়তা থাকলেই প্রচারণা দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। শুধু শাকিব খানের সিনেমাই নয়, ঢালিউডে নির্মিত বেশির ভাগ সিনেমার ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রচারণায় মিথ্যাচার। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, প্রচারণায় অতিরঞ্জন থাকলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার প্রমাণিত হয় না। কোনো সিনেমা প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারা এবং নির্মাতার জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এক বিষয় নয়। তবে প্রচারণায় এমন দৃশ্য, গল্প বা কারিগরি মানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে, যা চূড়ান্ত সিনেমায় নেই, তখন জবাবদিহির প্রশ্ন ওঠে।
* কেন এই মিথ্যাচার?
প্রথম কারণ, দর্শক টানার তীব্র চাপ। বাংলাদেশের বাজারে বড় তারকার সিনেমা এবং ঈদকেন্দ্রিক মুক্তির গুরুত্ব অনেক। উদারহণস্বরূপ বলা যায়, ২০২৪ সালে ‘প্রিয়তমা’র পোস্টারকে ঘিরে শাকিব খানের নতুন লুক কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। এটি প্রমাণ করে, সিনেমার মুক্তির আগেই তারকা ও দৃশ্যমান প্রচারণা দর্শকের আগ্রহ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিতীয় কারণ, পরিকল্পিত বিপণনের বদলে হঠাৎ আলোচনায় আসার চেষ্টা। বছর কয়েক আগে প্রকাশিত ফিল্ম মার্কেটিং টেকনিক ইন বাংলাদেশ : ইজ ইউটিউব ট্রেলার দ্য মোস্ট ইফেক্টিভ টুল?’ শীর্ষক এক গবেষণায় দর্শক, সিনেমাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীর সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় ইউটিউব ট্রেলারকে দর্শক আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। একইসঙ্গে গুজবনির্ভর ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার সমালোচনাও উঠে আসে। অর্থাৎ এটাই উপলব্ধ যে, প্রচারণা শুধু আলোচনার জন্ম দিলেই হবে না; সেটি দর্শকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে হবে।
তৃতীয় কারণ, মুক্তির আগেই সাফল্যের দাবি প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা। চলতি বছর ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমাগুলোর ব্যবসা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে দেখা গেছে, একই সিনেমার টিকিট বিক্রি নিয়ে কোথাও দুই কোটি, কোথাও চার কোটি টাকার দাবি করা হচ্ছিল। তবে মাল্টিপ্লেক্স কিংবা সিঙ্গেল স্কিণ, কোথাও থেকেই টিকিট বিক্রি থেকে সিনেমার আয় সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য আসেনি। অর্থাৎ যারা এসব তথ্য দিয়েছেন তারা শো ও অনলাইন টিকিট বিক্রির তথ্য থেকে আয় অনুমান করে বলেছেন। এখানেও প্রচারণার একটা মিথ্যাচার লক্ষ্য করা যায়। বক্স অফিস না থাকার কারণে ব্যবসার প্রকৃত হিসাব প্রকাশ না করে সংশ্লিষ্টরা প্রচারণার স্বার্থে বড় অঙ্কের আয়, দর্শকসংখ্যা কিংবা সাফল্যের দাবি সহজেই ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
* দুর্বল সিনেমা, বড় প্রচারণা
প্রচারণার সমস্যা শুধু মিথ্যা তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় সিনেমার চিত্রনাট্য, সম্পাদনা, শব্দ সংযোজন কিংবা সামগ্রিক নির্মাণের দুর্বলতা ঢাকতে তারকা, গান, অ্যাকশন দৃশ্য ও ভাইরাল মুহূর্তকে সামনে আনা হয়। কিন্তু প্রচারণা দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে আনতে পারে, সিনেমার দুর্বলতা দূর করতে পারে না।
এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ ‘প্রিন্স’। সিনেমাটি মুক্তির পর শব্দ ও কালার গ্রেডিংসহ কারিগরি ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। পরে শাকিব খান স্বীকার করেন, তাদের টিম দর্শকের সামনে একটি সম্পূর্ণ সিনেমা তুলে ধরতে পারেনি। সময়ের সীমাবদ্ধতা ও অনিবার্য পরিস্থিতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এটি ইচ্ছাকৃত প্রতারণা না হলেও নির্মাণের সময়সীমা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং মুক্তির প্রস্তুতি নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন তৈরি করে।
* ক্ষতি হচ্ছে পুরো ইন্ডাস্ট্রির
গত বছর বাংলাদেশে ৪৫টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল; এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করে। ঈদকেন্দ্রিক মুক্তির বাইরে অনেক সিনেমা দর্শক টানতে পারেনি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্তও একই চিত্র লক্ষ করা গেছে। যদিও সিনেমার ব্যর্থতার কারণ শুধু মিথ্যা প্রচারণার জন্য নয়, দুর্বল নির্মাণ, সীমিত প্রচারণা ও বিতরণব্যবস্থার সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। অনেকের মতে, মিথ্যা প্রচারণা বাজারের সীমাবদ্ধতা ও প্রতিযোগিতার বাস্তবতার কারণেই তৈরি হয়। মূলত প্রযোজকরা প্রথম সপ্তাহেই দর্শক টানতে মরিয়া হয়ে উঠেন। এ কারণে বিভিন্নভাবে অতিরঞ্জিত কিংবা মিথ্যা প্রচারণার আশ্রয় নেন। কিন্তু অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে আনার পর তাদের অভিজ্ঞতা খারাপ হলে ওই সিনেমা সিয়ে নেতিবাচক প্রচার খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি সিনেমার প্রতি দর্শকের অনাস্থা পরবর্তী সিনেমার টিকিট বিক্রিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। দর্শক তখন শুধু নির্দিষ্ট নির্মাতার সিনেমাকে নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলা সিনেমার মানকেই সন্দেহ করতে শুরু করেন। এতে ভালো সিনেমাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
* সমাধান কোথায়?
প্রথমত, প্রচারণায় যাচাইযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করতে হবে। সিনেমার গল্প, নির্মাণশৈলী, আয়, দর্শকসংখ্যা, আন্তর্জাতিক মুক্তি কিংবা উৎসবে অংশগ্রহণের দাবি প্রমাণ ছাড়া প্রকাশ করা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, ট্রেলার ও টিজারে সিনেমার প্রকৃত ধরন ও মান সম্পর্কে সৎ ধারণা দিতে হবে। তৃতীয়ত, মুক্তির আগে কারিগরি মান যাচাই, চিত্রনাট্য উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত পোস্ট-প্রোডাকশন সময় নিশ্চিত করা জরুরি। চতুর্থত, স্বাধীন সিনেমা সমালোচনা ও দর্শকের মতামতকে প্রতিপক্ষ হিসাবে না দেখে উন্নতির সুযোগ হিসাবে নিতে হবে। একইসঙ্গে টিকিট বিক্রির স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ এবং প্রচারণার বাজেটকে প্রযোজনার পরিকল্পনার অংশ করা প্রয়োজন।
এটা মনে রাখতে হবে, শেষ পর্যন্ত হয়তো দর্শককে একবার প্রেক্ষাগৃহে আনা সম্ভব, কিন্তু বারবার প্রেক্ষাগৃহে ফেরাতে পারে সিনেমার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা। প্রচারণা যদি বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, সাময়িকভাবে আলোচনা তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দর্শক হারানোর কারণ হতে পারে। ঢালিউডের জন্য তাই সবচেয়ে কার্যকর প্রচারণা হবে এমন, যেখানে প্রতিশ্রুতির চেয়ে সিনেমাই বড়।
