সিলেটেও এনসিপির গাড়িবহরে হামলা
আমি আজ থেকে আর কথা বলব না, চুপ থাকব -নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী * সারজিস আলমের গাড়ির পেছনের গ্লাস ভেঙেছে * বিএনপিকে দায়ী করলেন এনসিপি নেতারা
Advertisement
সিলেট ব্যুরো ও গোলাপগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হবিগঞ্জের পর এবার সিলেটেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের গাড়িবহরে দুদফা হামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সিলেটের গোলাপগঞ্জে এক মতবিনিময় সভা থেকে বের হতেই তাদের গাড়ির ওপর ইটপাটকেল ও বোতল ছুড়ে ভাঙচুর করা হয়। পরে পাঁচমাইল নামক এলাকায় গেলে সেখানেও হামলা হয়। এতে দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়ির পেছনের গ্লাস ভেঙে গেছে। হামলার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের দায়ী করেছেন সারজিস আলমসহ এনসিপি নেতারা। তবে এ ঘটনায় সারজিস আলম বা তার সঙ্গে থাকা কেউ আহত হননি। এছাড়া কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে এনসিপির বিক্ষোভ মিছিলে হামলা হয়েছে। এ ঘটনায় জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) এক সদস্যসহ এনসিপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে, নিজের কথা বলাকে কেন্দ্র করে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে নীরব থাকার ঘোষণা দিয়েছেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেছেন, ‘এখন থেকে আর কোনো কথা বলব না। চুপ থাকব। পুরো বাংলাদেশে দেখি উনারা কতটুকু বাড়তে পারে, কতটুকু যাইতে পারে। আমরা সেই মাত্রাটা দেখব।’ গতকাল বেলা সোয়া ৩টার দিকে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা সভা শেষে একাডেমিক ভবনের সামনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একথা বলেন। এদিকে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে গোলাপগঞ্জ পৌর অডিটোরিয়ামে জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় শেষে বের হয়ে যাওয়ার পথে চৌমুহনী এলাকায় প্রথম হামলা হয়। এ সময় একদল লোক তাদের উদ্দেশে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেন। দেশজুড়ে জুলাই পদযাত্রার অংশ হিসাবে দুপুরে গোলাপগঞ্জে শহীদ পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে সারজিস আলম বিএনপির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতেই বিভিন্ন স্থানে এনসিপির ওপর হামলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘নির্যাতনে বিএনপি আগের স্বৈরাচারকে ছড়িয়ে যেতে চাইছে।’ এরপর পৌরসভা থেকে বের হওয়ার সময়ই এনসিপি নেতাদের গাড়িবহরের সামনে বিক্ষোভ করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে বোতল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এ সময় সারজিস আলমের গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখান থেকে দুপুরের খাবার খেতে পাঁচমাইল এলাকায় গেলে সেখানে আবারও বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন এনসিপি নেতাকর্মীরা। দ্বিতীয় দফা হামলার পর সেখান থেকে নেতাকর্মীরা সার্কিট হাউজে ফিরে আসেন। সারজিস আলম বলেন, ‘জিয়ার সৈনিক স্লোগান দিয়ে গাড়িতে হামলা করেছে। তারেক রহমান শেখ হাসিনার পথে হাঁটছেন। পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হামলা দেখেছে।’
এনসিপি নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মাহমুদা মিতু বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন হয়েছিল গণতান্ত্রিক কাঠামো ফেরাতে। কিন্তু বিএনপি আবারও ফ্যাসিবাদী কাঠামোয় ফেরত যাচ্ছে।’ সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোলাপগঞ্জ সার্কেল) শাহ আলম বলেন, ঢিল নিক্ষেপের ঘটনায় একটি গাড়ির কাচ ভেঙে গেছে। পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।
এদিকে দুপুরে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই স্মরণে : অগ্নিঝরা জুলাই, রক্তের ঋণ ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা শেষে গোলাপগঞ্জে সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গণভোটের গণরায়ের পক্ষে ১১ দল ঐক্যবদ্ধ আছে, থাকবে। হবিগঞ্জ থেকে গোলাপগঞ্জ-আমরা যা দেখছি, সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে দেশকে আবারও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকারের সন্ত্রাসী চরিত্র জাতির সামনে উন্মুক্ত হচ্ছে। সরকার যদি সন্ত্রাসের পথে হাঁটে তাহলে জনগণ প্রতিরোধের পথে হাঁটবে।’ তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে যেভাবে সন্ত্রাসীরা হামলা করেছিল একই কায়দায় কিন্তু তারা এখন আমাদের গাড়িবহরে হামলা করছে।’
নেতাকর্মীদের উত্তেজিত না হতে বিএনপির ভিডিও বার্তা : এদিকে সকালেই এক ভিডিও বার্তায় সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আজকে এনসিপির শীর্ষ নেতারা সিলেট সফর করছেন। এর আগে আমরা দেখেছি হবিগঞ্জে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। তাই আমরা আমাদের দলের প্রতিটি উপজেলার নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছি এনসিপি তাদের বিভিন্ন উপজেলায় সভা করবে। এমনকি যদি কোথাও বিএনপির কোনো নেতাকে উদ্দেশ করে খারাপ বক্তব্যও দেয় তবুও উত্তেজিত হওয়া যাবে না। আশা করি এই নির্দেশনা সিলেট জেলার সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মানবে। এনসিপি যাতে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কর্মসূচি শেষ করতে পারে তাতে সব ধরনের সহযোগিতা আমরা করব।’
এমন ভিডিও বার্তার পরও হামলা হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ইতোমধ্যেই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার : হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় জারি করা ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করেছে জেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. জিএম সরফরাজ এ আদেশ জারি করেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক মো. মঈনুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হয়।
এনসিপি নেতাদের মালামাল লুটের অভিযোগ : মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জে হামলার সময় এনসিপি নেতাদের ২০ লাখ টাকার মালামাল লুট ও নগদ ৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপি নেতারা। গতকাল সকালে মৌলভীবাজার থেকে গাড়িবহর নিয়ে সিলেটের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার সময় সাংবাদিকদের কাছে এই অভিযোগ করেন দলটির নেতারা।
ফুলবাড়ীতে এনসিপির ওপর ছাত্রদল-যুবদলের হামলা : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, জেলার ফুলবাড়ীতে বৃহস্পতিবার এনসিপির বিক্ষোভ মিছিলে ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দলের নেতাকর্মীরা হামলা করেন বলে অভিযোগ এনসিপির নেতাকর্মীদের। উপজেলা শহরের থানা রোডে জামে মসজিদের পাশে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় জেলা যুবশক্তির সিনিয়র সেক্রেটারি তাওহিদ হাসান শান্ত, ফুলবাড়ী উপজেলার সিনিয়র সদস্য সচিব রাজু, ছাত্রশক্তির জেলা আহ্বায়ক জাহিদ হাসান, জেলা সদস্য সচিব সাদিকুর রহমানসহ আরও কয়েকজন আহত হন। হামলায় পুলিশের ডিএসবি সদস্যকেও পেটাতে দেখা গেছে। তার নাম ফেরদৌস। তিনি হাতে আঘাত পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রেজাউল ইসলাম রেজা দাবি করেন, এনসিপি নেতাকর্মীরা তাদের এক কর্মীর ওপর হামলা করে।
