তারেক রহমান-সানায়ে তাকাইচি বৈঠক
সম্পর্কে নতুন সূর্যোদয়
Advertisement
টোকিওতে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি -পিআইডি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাপানের টোকিওতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে দুদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারে একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন) বিনিয়োগের প্রত্যাশা করা হয়েছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি ঋণ সহায়তার বিষয়ে একমত হয়েছে টোকিও।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি এ বৈঠক দুদেশের সম্পর্কের নতুন সূর্যোদয় সূচনা করবে। এ অধ্যায় আরও গভীর আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর তিনটি পৃথক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ডিজিটাল রূপান্তর (ডিএক্স), দক্ষ আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ডিজিটাল সংযোগে একযোগে কাজ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের তাগিদসহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, রেমিট্যান্স ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেই’তে এ শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে তারেক রহমানকে রাজকীয় অভ্যর্থনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সেখানে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান জাপানের প্রধানমন্ত্রী। আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিদর্শক বইয়ে সই করেন এবং তাকাইচির সঙ্গে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। প্রকাশিত ১৪ দফার এক যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বৈঠক শেষে তারা মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।
১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ ও টেক পার্কের প্রস্তাব : বৈঠকে তারেক রহমান বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপকল্প তুলে ধরে বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ এ উন্নয়ন অভিযাত্রায় তিনি জাপান সরকার ও তাদের বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়নে দ্রুত একটি জাপানি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতি বিনির্মাণে এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিক্স ও ইলেকট্রনিক্স গবেষণার কেন্দ্র হিসাবে ‘বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে জাপানের সহযোগিতা চান তিনি।
যোগাযোগব্যবস্থার বৈপ্লবিক রূপান্তরে দেশের ছয়টি বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনায় জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের অংশ হিসাবে এলএনজি অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়।
নতুন রূপরেখায় ‘বিগ-বি’ ও মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন : বৈঠকে দুদেশের ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক উদ্যোগ ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’কে উন্নীত করে নতুন কৌশলগত রূপরেখা ‘শেয়ারিং প্রসপারিটি বিগ-বি’ গঠনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের একটি প্রধান কেন্দ্র (হাব) হিসাবে গড়ে তোলা হবে। এছাড়া হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করার প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া, ঢাকার মেট্রোরেলের (এমআরটি) লাইনগুলোর দ্রুত নির্মাণ এবং মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে উভয় দেশ একমত হয়েছে। অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতগুলোর কার্যক্রম বাস্তবায়নে একটি পৃথক মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনেরও প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব ও আস্থার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আজ এ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সময় এসেছে।’ এ সময় তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুদফা জাপান সফর এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানান প্রধানমন্ত্রী।
গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশংসা সানায়ে তাকাইচির : বৈঠকের পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তার এক্স হ্যান্ডেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের অভিন্ন মূল্যবোধের অংশীদার বন্ধু হিসাবে রহমান প্রশাসনের জাতি গঠনমূলক প্রচেষ্টায় জাপান পূর্ণ সমর্থন দেবে।’ তিনি বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল এবং ১৭ কোটি মানুষের অমিত সম্ভাবনাময় বাজার হিসাবে উল্লেখ করেন। মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গঠনে বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসাবে আখ্যা দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই : বৈঠকে মিয়ানমারের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোহিঙ্গাদের প্রতি জাপানের ধারাবাহিক মানবিক সহায়তার প্রশংসা করে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘এ সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে নিরাপদ, সম্মানজনক ও দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।’
সমুদ্র নিরাপত্তায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি টোকিওর : দুদেশের মধ্যে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তি’ স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের শীর্ষ ভূমিকার প্রশংসা করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সমুদ্র ও বন্দর নিরাপত্তায় সহযোগিতা গভীর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের ওডিএ সহায়তার আওতায় ১টি বড় টহল জাহাজ (প্যাট্রোল ভেসেল) এবং ওএসএ কর্মসূচির আওতায় ৫টি প্যাট্রোল বোট প্রদানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান দুই নেতা। এছাড়া স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (২য় পর্যায়)’-এ ইয়েন ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।
ফিলিস্তিন সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান কামনা : ফিলিস্তিনের গাজা পুনর্গঠনে ‘কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান’ এগিয়ে নেওয়া এবং দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের মাধ্যমে ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায্য ও স্থায়ী সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দ্রুত ও পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং লোহিত সাগর ও বাব আল মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব : বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুদেশের অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতগুলো চিহ্নিত করা, সেগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং সহযোগিতার সুযোগগুলোকে কার্যকর উদ্যোগে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দুদেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চিবা প্রিফেকচারের ইচিকাওয়া শহরে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত ‘নিটসু লজিস্টিকস হাব’ পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসাবে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ অনেকে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ৪ দিনের এ রাষ্ট্রীয় সফরে সোমবার টোকিও পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর এটি তার তৃতীয় বিদেশ সফর।

