Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি’

অর্থনীতির বিপৎসংকেত সরকারি নথিতেই

Advertisement

মনির হোসেন

মনির হোসেন

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনীতির বিপৎসংকেত সরকারি নথিতেই

Advertisement

দেশের অর্থনীতিতে ঝুঁকির গল্পটি বেশ আলোচিত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে রয়েছে নানা অশনিসংকেত। তবে এবার সরকারি নথিতেই বড় ধরনের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি’তে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে একসঙ্গে একাধিক ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয়ের দুর্বলতা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) নিম্ন প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক খাতে বড় ধরনের শঙ্কা অন্যতম। বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হবে। আর মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বাড়লে কমবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ সৃষ্টি হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকার দায়। এছাড়াও দুর্বল ব্যাংকব্যবস্থা, বিভিন্ন ঋণের বিপরীতে সরকারি গ্যারান্টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এতে বলা হয়, ঝুঁকিগুলো সময়মতো মোকাবিলা করতে না পারলে অর্থনীতি বড় সংকটে পড়তে পারে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে সরকারের ব্যয়, রাজস্ব আয় এবং উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তবে পরের বছর অর্থাৎ ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে সমস্যা কিছু কমবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনীতির সমস্যা চিহ্নিত। কিন্তু সমাধানে পদক্ষেপগুলো সঠিক হচ্ছে না। জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় অর্থনীতির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন, তা সঠিক নয়। কিন্তু নীতি বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে, তা কিছুটা যৌক্তিক। বাস্তব অবস্থা এর চেয়েও ভয়াবহ। তিনি বলেন, সরকার ঝুঁকিগুলোর কথা বলেছে। কিন্তু যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা উলটো। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাজেটে সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ আগামী ছয় মাসে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে রাখার কথা বলা হয়েছে। পুরো অর্থবছরের জন্য ধরা হয়েছে ৮ শতাংশ। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি একসময় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ ছিল। এর আগে ছিল ২২ থেকে ২৩ শতাংশও। কিন্তু এবার তা অনেক বেশি কমানো হয়েছে। এর মানে সরকারের রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সঙ্গে মিল নেই। আবু আহমেদ বলেন, অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। আর বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অবশ্যই সুদের হার কমিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে। কারণ, উদ্যোক্তারা কম সুদে টাকা না পেলে বিনিয়োগ করবে না। তার মতে, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো অসম্ভব। সরকারকে অর্থনীতির এই সহজ হিসাব বুঝতে হবে।

নীতি বিবৃতির প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনীতির বড় ঝুঁকিগুলোর অন্যতম মূল্যস্ফীতির ধাক্কা। প্রত্যাশার চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে কমবে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা। প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি বাড়লে প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। এতে অর্থনীতি একটি ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন প্রবৃদ্ধি’ পরিস্থিতিতে আটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও উৎপাদন-সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বৈদেশিক খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ বাড়লে রিজার্ভ কমবে। এতে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। কঠিন হবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। নথিতে সতর্ক করা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি কমে গেলে কর আদায়ের ভিত্তিও দুর্বল হবে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমে গেলে মূল্য সংযোজন কর (মূসক), আয়কর ও আমদানি পর্যায়ের রাজস্ব প্রত্যাশামতো বাড়বে না। ফলে বাজেট বাস্তবায়নে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা, ভর্তুকি ও অন্যান্য ব্যয় অব্যাহত রাখতে হবে। এতে বাজেটের ওপর সৃষ্টি হবে দ্বিমুখী চাপ। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিকল্প নেই।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও সরকারি দায়ে বাড়ছে আর্থিক ঝুঁকি : শুধু মূল্যস্ফীতি বা রাজস্ব ঘাটতিই নয়। সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং সরকারি গ্যারান্টিজনিত দায়। হয়তো এগুলো এখনই সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ বের করে নেবে না। কিন্তু ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের দায় বাড়াবে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন লোকসানে রয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ১২২টি প্রতিষ্ঠানের দায়ের পরিমাণ ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। উৎপাদন ব্যয়, পরিচালন ব্যয় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের আয় দিয়ে চলতে পারে না। সরকারকে মূলধন সহায়তা, ঋণ পরিশোধ কিংবা বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ দিতে হয়। এতে বাজেটের ওপর সৃষ্টি হয় অতিরিক্ত চাপ। আর্থিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা না বাড়লে সরকারের দায় আরও বাড়বে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে সরকার গ্যারান্টি দেয়। এসব গ্যারান্টি তাৎক্ষণিক ব্যয় নয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে পুরো দায় নিতে হয় সরকারকে। ফলে নতুন গ্যারান্টির ক্ষেত্রে প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা, সম্ভাব্য আয় এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণ জরুরি। বিবৃতিতে বলা হয়, ব্যাংক খাত বড় ঝুঁকিতে। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সংকট, মূলধন ঘাটতি এবং সম্পদের মানের অবনতি হয়েছে। এটি সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বড় ব্যাংক আর্থিক সংকটে পড়লে আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় সরকারকে সহায়তা দিতে হবে। এতে সরকারের অপ্রত্যাশিত ব্যয় বাড়বে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের বিরুদ্ধে দেশে ও আন্তর্জাতিক আদালতে অনেক মামলা রয়েছে। বিচারাধীন মামলাগুলো সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব মামলার রায় সরকারের বিপক্ষে গেলে ক্ষতিপূরণ, দেনা পরিশোধ এবং অন্য আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে। এসব দায়ের বিষয়ে আগাম মূল্যায়ন জরুরি।

দুর্যোগেই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা : বিবৃতিতে বলা হয়, দেশে প্রতিবছরই বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। এতে শুধু মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি হয় না-কৃষি, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু এজন্য সরকারের পর্যাপ্ত বাজেট থাকে না। পরবর্তী সময়ে যা অর্থনীতিতে চাপ বাড়ায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক পরিস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্যশস্য, সার ও শিল্পের কাঁচামালের দাম বাড়ছে। এতে বাড়ছে আমদানি ব্যয়।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

তারেক রহমান-সানায়ে তাকাইচি বৈঠক সম্পর্কে নতুন সূর্যোদয়

সম্পর্কে নতুন সূর্যোদয়

জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশিদের জোর করে যুদ্ধে পাঠিয়েছে রাশিয়া

বাংলাদেশিদের জোর করে যুদ্ধে পাঠিয়েছে রাশিয়া

যে বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের ঝড়

যে বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের ঝড়

নিরাপত্তাঝুঁকিতে শাহজালালের এয়ারসাইড কোনো নির্দেশনাই মানছে না এয়ারলাইন্সগুলো

কোনো নির্দেশনাই মানছে না এয়ারলাইন্সগুলো

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম