সালমানের স্টুডিওতে হামলা ভাঙচুর গুলি লুটপাট
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউন ফিশ স্টুডিওতে’ শনিবার রাতে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায় ও তছনছ করে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় নিউগিনি প্রোপার্টিজ কার্যালয় এবং আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার রাতে দুই শতাধিক অস্ত্রধারী মুহুর্মুহু গুলি ছুড়ে ওই এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করে। এ ঘটনায় সালমান মুক্তাদির চাঁদাবাজির অভিযোগ তুললেও পুলিশ জানিয়েছে, চাঁদাবাজির কোনো ঘটনা ঘটেনি, মূলত প্রোপার্টিজ মালিক নাজিম উদ্দীন ভূঁইয়ার সঙ্গে সাবেক এক সেনা কর্মকর্তার জমি নিয়ে বিরোধের জেরেই এই হামলা। নাজিম উদ্দীনের দাবি, শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের বাহিনী ও কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এই হামলায় জড়িত। হামলার ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় করা মামলায় মূল আসামিসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম বলেন, জমির দখল-বেদখল কেন্দ্র করে রাতে কিছু লোক দলবদ্ধভাবে এসে ভাঙচুর করে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। চাঁদাবাজির কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই, এটি জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ঘটেছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইসিবি চত্বরের মানিকদী নামাপাড়া এলাকায় জমি নিয়ে নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের মালিক নাজিম উদ্দীন ভূঁইয়ার সঙ্গে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিনের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। সেই পূর্বশত্রুতার জের ধরেই শনিবার রাতে গোলাম মহিউদ্দিনের লোকজন এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে।
হামলার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন সালমান মুক্তাদির। এতে তার তছনছ হওয়া স্টুডিও, ভাঙা আসবাব ও কর্মীদের কান্না করতে দেখা যায়। ভিডিওতে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগ তোলেন। সালমান মুক্তাদিরকে বলতে শোনা যায়, ‘একটু আগে এখানে অ্যাটাক হয়েছিল। এই পুরা অ্যাটাকে আমাদের স্টুডিও ডেস্ট্রয়েড হয়ে গেছে। ভিডিওটা খুবই স্পেশালি বানানো আমাদের যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, উনার জন্য। আপনি প্লিজ কোনো টেনশন নিবেন না। দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ।’
তবে রোববার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাস্থলে একটি বিরোধপূর্ণ জমি আছে। জমি নিয়ে দুপক্ষের বিরোধ। একপক্ষের হয়ে বেশকিছু লোক তা দখল করতে গিয়েছিল। তারা সেখানে ভাঙচুর করেছে। এর মধ্যে সালমান মুক্তাদিরের একটি স্থাপনা, যেখানে তিনি কনটেন্ট ক্রিয়েট করতেন। সেটা ভাঙচুর করা হয়েছে। তিনি বলেন, যিনি অভিযোগ করেছেন, তিনি কোনো মামলা করেছেন? করেননি। তিনি একপর্যায়ে বলেছেন, তার (সালমান মুক্তাদির) কাছে কেউ চাঁদা চায়নি। চাইলে নাকি দিতেন। এরকম শুনেছি। বিএনপিকে চাঁদাবাজ দল বলে যে অভিযোগ সালমান মুক্তাদির করেছেন, সেটা ঢালাও মন্তব্য। সালমান মুক্তাদির সুনির্দিষ্ট মামলা করলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। পরে আরেক ভিডিও বার্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে সালমান মুক্তাদির বলেছেন, শনিবার রাতে তার স্টুডিওতে হামলার পর তিনি থানায় মামলা করতে গিয়ে ভোর ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন; কিন্তু মামলা নেওয়া হয়নি। তার প্রশ্ন, এ ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার আগপর্যন্ত এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য আসার আগপর্যন্ত মামলা কেন হলো না।
এদিকে ঘটনার পর রোববার ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন সাইফুল ইসলাম ভূইয়া। এতে মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিনসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা শটগান, পিস্তল, চাপাতি, রামদা, ছোরা, রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রবেশ করে এবং ৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ সময় ভাঙচুর ও লুটপাট করে হামলাকারীরা।
ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রুহুল কবির খান যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় করা মামলায় ১ নম্বর আসামি শাহরিয়ার মাহমুদসহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রোববার সরেজমিন মানিকদী নামাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিউগিনি প্রোপার্টিজের ফটকে একাধিক গুলির ছিদ্র এবং ভবনের জানালার কাচ ভাঙা। ভেতরে টিনশেড প্লটের সামনের গোডাউনের পাশেই সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। স্টুডিওর প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। ল্যাপটপ, ক্যামেরা, টেলিভিশন থেকে শুরু করে দরজা-জানালা সবকিছু ভেঙে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে হামলাকারীরা। লুট করা হয়েছে যন্ত্রাংশ ও নগদ অর্থ।
রাতের বিভীষিকাময় ওই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে উজ্জ্বল হোসেন নামের এক চা-দোকানি বলেন, আড়াইশ থেকে তিনশ সন্ত্রাসী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করে। তারা জানালা-দরজায় গুলি করা শুরু করলে আমরা ভয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ি। তারা বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পুলিশ আসে। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়ে। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে কয়েক দফায় গোলাগুলি হয়।
ভবন নির্মাণশ্রমিক আবু হাসান জানান, পিস্তল হাতে কয়েকজন এসে তাদের সবাইকে মারধর করে আটটি মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ কেড়ে নেয়। কয়েকজনকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখমও করা হয়।
নিউগিনি প্রোপার্টিজের স্বত্বাধিকারী মো. নাজিম উদ্দীন বলেন, কয়েকদিন আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত আমাকে এক লোকের মাধ্যমে হুমকি দিয়েছিল। আমার প্রোপার্টিজে হামলায় শাহাদাত বাহিনী জড়িত। সাবেক কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাও সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর আগেও কয়েক দফায় আমার ওপর হামলা হয়েছে। থানায় মামলা করেও কোনো লাভ হয়নি।
৩ আসামি কারাগারে, রিমান্ড শুনানি বুধবার : স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেফতার তিন আসামিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করা হয়েছে। রোববার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ক্যান্টনমেন্ট থানার ইন্সপেক্টর সুব্রত দেবনাথ আসামিদের ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমান তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই তারেকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কারাগারে পাঠানো আসামিরা হলো-মো. মামুন, মো. আসলাম ও মুন্না। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার আসামিদের কাছ থেকে দেশীয় অস্ত্র ও গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
