পাঁচ বছরেই লালে লাল গোদাগাড়ীর চানাচুর বিক্রেতা
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সীমান্তবর্তী চর বয়ারমারী মহরাপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম বুধু পাঁচ বছর আগে হাটে হাটে ফেরি করে পাউরুটি চানাচুর ও বিস্কুট বিক্রি করতেন। একটি বাইসাইকেল ছিল তার একমাত্র সম্বল। প্রতিদিন সকালে রেলবাজার থেকে পাউরুটি-চানাচুর-বিস্কুট ও মুড়ি-নাড়ু কিনে চরের হাটে দোকানে দিতেন। বাবা দুরুল হোদা ছিলেন পদ্মার ফেরিঘাটের মাঝি। সেই নুরুল ইসলামই এখন কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। মাত্র পাঁচ বছরে মাদকের কারবার করে নুরুল এখন লালে লাল। চর থেকে উঠে এসে বড় বাড়ি করেছেন গোদাগাড়ী সদরের চম্পকনগর হাবাসপুরে। আরেকটা বাড়ি করেছেন উজানপাড়ার দেওয়ানপাড়ায়। মাদকের কারবারে দ্রুত আর্থিক সমৃদ্ধি আসায় বিয়ে করেছেন দুটি। দুই স্ত্রী থাকেন দুই বাড়িতে। ছোট স্ত্রী রুমা খাতুন দেওয়ানপাড়ার বাড়িতে থাকেন। বড় স্ত্রী থাকেন চম্পকনগরের বাড়িতে। নুরুল নিজের নামের পাশাপাশি দুই স্ত্রীর নামেও করেছেন বাড়ি গাড়ি জমি প্লট পুকুর মর্কেট। এলাকাবাসী জানিয়েছে, নুরুলের দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য নেই। মাদকের কারবারই তার দ্রুত কোটিপতি হওয়ার সিঁড়ি।
রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের উজানপাড়া বাইপাস মোড় থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে ছোট পাকা সড়ক লাগোয়া চম্পকনগর হাবাসপুর গ্রাম। নুরুল এখানেই গড়ে তুলেছেন তার সাম্রাজ্য। হাবাসপুরে দেড় বিঘা জমির ওপর সম্প্রতি করেছেন একটি বড় পাকা মার্কেট। ৫০টি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। কাছাকাছি এলাকায় করেছেন একটি দুই তলা পাকা বাড়ি। হাবাসপুরের আশপাশের এলাকায় কিনেছেন ২০ বিঘা জমি। রাজশাহী মহানগরীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অভিজাত এলাকা ডাবতলা তেরখাদিয়াতে নুরুল কিনেছেন একাধিক জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট। এসব করেছেন নিজের ও দুই স্ত্রীর নামে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নুরুল ওরফে বুধু পাউরুটি চানাচুর ফেরির আড়ালে হেরোইনের কারবারে জড়িত হন মাত্র পাঁচ বছর আগে। সীমান্তপথে মাদকদ্রব্য হেরোইনের বড় বড় চালান এনে পাইকারি সরবরাহ করেন দেশের বিভিন্নস্থানে। ফলে অল্প সময়েই মাদকের কারবারে ফুলে ফেঁপে ওঠেন নুরুল। স্থানীয়রা আরও জানান, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের ছত্রছায়ায় থেকে নুরুল নির্বিঘ্নে হেরোইনের পাইকারি কারবার চালালেও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে স্পর্শ করতে পারেনি সাবেক সরকারের আমলে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতেন। আগে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় অবাধে হেরোইনের কারবার চালালেও সরকার বদলের পর বর্তমানে নুরুল স্থানীয় কতিপয় বিএনপি নেতার ছাতার তলে আশ্রয় নিয়েছেন। নুরুলের কারবার চলছে সেই আগের মতোই রমরমা। বিভিন্ন কর্মসূচিতে টাকা ঢেলে বিএনপি নেতাদের ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় কারবার করে নিজের সাম্রাজ্য গড়লেও পুলিশের হালনাগাদ তালিকাতে তার নাম নেই। এ নিয়ে রহস্যের জন্ম হয়েছে। তবে সম্প্রতি মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের একটি দল হাবাসপুরে গিয়ে নুরুলের মার্কেট, বাড়ি, গাড়ি ও জমিজমাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছে। নুরুলের আকস্মিক উত্থানের পেছনে মাদকের রমরমা কারবার প্রধান কারণ বলে মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তর জানতে পারে। এদিকে এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নুরুল দেশের বড় বড় শহরের মাদককারবারিদের কাছে পাইকারিতে মাদক সরবরাহ করেন। কয়েকটি ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় তার ব্যাংক হিসাব থাকলেও ভারত থেকে আসা মাদকের অর্থ পরিশোধ করেন হুন্ডিতে। গোদাগাড়ী ও রাজশাহীর একাধিক হুন্ডি কারবারির সঙ্গে নুরুলের যোগাযোগের তথ্যানুসন্ধান করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ দপ্তর।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) উপপরিচালক মেহেদী হাসান জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে অভিযোগ পেয়ে সম্প্রতি আমরা চম্পকনগর হাবাসপুরে গিয়ে নুরুলের মার্কেট বাড়ি জমিজমার তথ্য সংগ্রহ করেছি। কীভাবে সে বিপুল সম্পদ অর্জন করল-সেটাও জানার চেষ্টা করেছি। উপপরিচালক আরও জানান, আমাদের তালিকায় মাদককারবারি হিসাবে নুরুলের নাম রয়েছে। তার নামে দুটি মাদক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। নুরুল কীভাবে এত বিপুল সম্পদ অর্জন করল, সে বিষয়ে আরও অনুসন্ধান করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
এত কম সময়ে বিপুল অর্থসম্পদ অর্জনের বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল ইসলামের দাবি, তিনি কোনো অবৈধ কারবারে জড়িত নন। জমি ও বেকারির ব্যবসা করেছেন। এই ব্যবসা থেকেই তার টাকা পয়সা হয়েছে। নুরুলের স্ত্রী রুমা খাতুন দাবি করেছেন, তারা কোনো অবৈধ কারবার করেন না। কিছু মানুষ শক্রতামূলকভাবে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে।
নুরুলের বিষয়ে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মির্র্জা আব্দুস সালাম জানান, তার বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। পুলিশ ইতোমধ্যে বেশকিছু মাদককারবারির বিরুদ্ধে যথাযথ মাধ্যমে মান্ডি লন্ডারিং মামলার সুপারিশ পাঠিয়েছে সিআইডির কাছে। আরও কয়েকজন মাদককারবারির বিষয়ে তদন্ত চলছে। তাদের তালিকাও সিআইডির কাছে পাঠানো হবে। নুরুলের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তের প্রতিবেদন আসার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
