ব্যাংকিং খাতে মহাসংকট
খেলাপি ঋণ উদ্ধারে পাঁচ বছরের রোডম্যাপ
Advertisement
শেখ মামুনুর রশীদ ও এম শাহজাহান
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় আর মূলধনের ভয়াবহ ঘাটতি-এই সংকট একসঙ্গে চেপে বসেছে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডে। জুন শেষে ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে সরাসরি খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বা ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৩১ টাকার বেশি এখন খেলাপির খাতায়। এ অবস্থায় সংকট থেকে ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলতে পাঁচ বছর মেয়াদি ১৩ দফা সংস্কার রোডম্যাপ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শীর্ষ খেলাপিদের নিয়মিত নজরদারি, এক গ্রাহক বা গ্রুপের পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, আন্তর্জাতিক মানের এক্সপেকটেড ক্রেডিট লস (ইসিএল)-ভিত্তিক প্রভিশনিং, বড় অঙ্কের অর্থায়নে বন্ডের ব্যবহার এবং বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ আর্থিক দুর্বলতার এই চিত্র উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কেবল তারল্য সহায়তা দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া যাবে না। খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন পুনর্গঠন, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। সংস্কার পরিকল্পনার প্রথম ধাপে আগামী এক বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণ বেশি থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানো হবে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদের সিনিয়র ব্যবস্থাপনা দলের সঙ্গে প্রতি প্রান্তিকে বৈঠক করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব বৈঠকে ব্যাংকভিত্তিক ঋণ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, খেলাপি ঋণের বর্তমান মাত্রা শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয়-এটি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কসংকেত। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ অনুমোদন, প্রভাবশালী গ্রাহকদের সুবিধা এবং দুর্বল তদারকির কারণে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়েছে। এখন রোডম্যাপের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
জানা গেছে, প্রতিটি ঋণ আদায়ে ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাদের কাছ থেকে কত টাকা আদায় হয়েছে, কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কোথায় আইনি বা প্রশাসনিক বাধা রয়েছে-এসব তথ্য নিয়মিত তদারকি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা এনপিএল রেজ্যুলেশন স্ট্র্যাটেজি বা খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির কৌশল প্রণয়নের নির্দেশনাও দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বা রিস্ক বেসড সুপারভিশন চালু করেছে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি, সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি প্রশমন ব্যবস্থা মূল্যায়ন করে কম্পোজিট রিস্ক রেটিং দেওয়া হবে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এক্সপেকটেড ক্রেডিট লস বা (ইসিএল)-ভিত্তিক ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং চালুর লক্ষ্য রয়েছে। বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর জন্য ইসিএল পদ্ধতি চালুর প্রস্তুতি ২০২৭ সালের দিকে নেওয়া হচ্ছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নাম জনসমক্ষে প্রকাশের আইনি বাধা পর্যালোচনা, ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রণোদনা এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের পুরস্কারের নীতিমালাও হালনাগাদ করা হবে।
এক গ্রাহকের ঋণে লাগাম, ১০০০ কোটি টাকার বেশি হলে বন্ড : সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনায়। একজন গ্রাহক বা একটি গ্রুপ যেন পুরো ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে অস্বাভাবিক পরিমাণ ঋণ নিতে না পারে, সেজন্য ব্যাংকিং খাতজুড়ে একক গ্রাহকের ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে নেওয়া কঠোর ব্যবস্থা সাধারণ খেলাপিদের ক্ষেত্রে কতটা প্রয়োগ করা যায়, সে বিষয়ে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
খেলাপি ঋণ আদায়ের মামলা করে পরে রিটের মাধ্যমে আদায় কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করার প্রবণতা ঠেকাতেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহ বা নির্দেশনা দেওয়া হবে। এর ফলে বড় করপোরেট ঋণের ঝুঁকি শুধু ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে কেন্দ্রীভূত না হয়ে পুঁজিবাজারেও ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মন্দ ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি বা গঠনের আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন এবং ১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইন বদলে নতুন ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপটসি অ্যাক্ট প্রণয়নের কাজ চলছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের বড় কাঠামোগত সমস্যা হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে। তাই সংস্কারের পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে শুধু নতুন আইন করেই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হবে না। তিনি বলেন, সংস্কারের ফলে আগে গোপন থাকা খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রও সামনে এসেছে।
২২ ব্যাংকের লোকসান ২ লাখ ৫৪ হাজার কোটি, ১৫টির মূলধন ঋণাত্মক : সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা কতটা জরুরি, তা বোঝা যায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার দিকে তাকালে। মার্চ শেষে ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক রয়েছে। বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংকও এই তালিকায় রয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নেমে গেছে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে, ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী ন্যূনতম প্রয়োজন ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ৬৩টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ৪০টি ন্যূনতম মূলধন শর্ত পূরণ করতে পেরেছে; শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ-তাদের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। প্রভিশনের ঘাটতিও বিশাল। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার কথা থাকলেও রাখতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রথম প্রান্তিকে পরিচালন মুনাফা ৭৮৯ কোটি টাকা হলেও প্রভিশন ও সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতি সমন্বয়ের পর ব্যাংকিং খাতের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। তারল্য পরিস্থিতিতে অবশ্য পুরো খাতের চিত্র ভিন্ন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। ফলে সংকটটি সামগ্রিক তারল্য সংকট নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের তারল্য, মূলধন ও সম্পদমানের গভীর দুর্বলতার সংকট।
