কক্সবাজারে রিসোর্টে ১০ পর্যটকের মৃত্যু
আনন্দের ভ্রমণ আগুনে শেষ
নিহতদের তিনজন ঢাবি, জবি ও ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থী; একই পরিবারের ৬ জন * ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস, ছিল না অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র * অনুমোদন ছাড়াই চলছিল রিসোর্ট * মালিকপক্ষ লাপাত্তা, ম্যানেজার গ্রেফতার
Advertisement
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দাউদাউ জ্বলছে কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্ট। চোখের সামনে পুড়ে যাচ্ছে সন্তানসহ স্বজনরা। সন্তানকে ফিরে পেতে এক মা ছুটছেন দিগবিদিক। আহাজারি করছেন-আমার সাইফকে আইন্না দাও -ভিডিও থেকে সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন একটি রিসোর্টে শনিবার সকালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা একে একে ১০টি লাশ উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন। আগুনে পুড়ে লাশগুলো ঝলসে গেছে। নিহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন করে শিক্ষার্থী রয়েছেন। তারা একই পরিবারের। এ ঘটনায় তিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শোক জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে মো. নাফিজ তেহামি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার’ প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী। লায়লা জাহান নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। আর মিলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেসের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. জাকারিয়া হাবিব। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। এছাড়া আটজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) এক শিক্ষার্থীর স্বজন বলে জানা গেছে। আগুন থেকে বাঁচতে রিসোর্টের টয়লেটে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি চারজন। তাদের লাশ সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র না থাকা রিসোর্টটিকে জুনে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। এরপরও সেখানে পর্যটকদের থাকা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু ছিল। এ ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের আগে সুমন দাবি করেন, ‘বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।’ তার ভাষ্য, ‘আগুন লাগার পর কর্মীরা তা নেভানোর চেষ্টা করেন। এর মধ্যেই রিসোর্টের এসি ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।’
শনিবার সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকতের ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। বেলা ১১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে রিসোর্টের বিভিন্ন কক্ষ থেকে একে একে লাশ উদ্ধার করা হয়। আগুনে রিসোর্টের কাঠের ভবনটি পুরোপুরি পুড়ে যায়। এ ঘটনায় ছয়জন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর বলেন, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই তা দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় কয়েকজন পর্যটক ভবন থেকে লাফ দিয়ে কিংবা আগুনের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অন্যরা বের হতে পারেননি।
ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দোলন আচার্য ১০টি লাশ উদ্ধারের বিষয় নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রিসোর্টের টয়লেটের ভেতর থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগুন থেকে বাঁচতে তারা সেখানে আশ্রয় নিয়ে পানি ব্যবহার করে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, লাশগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন সূত্রে ইসরাত জাহান মালিহা, মিলিতা মেহজাবিন আলভি (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা, নাফিস্তা মিম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সি ফাইয়াজ আহমেদ, নাফিজ তেহামি ও নাসরিন আক্তার মুক্তার (২৮) নাম পাওয়া গেছে। তবে নিহতদের পরিচয় ও সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে কিছু অসংগতি রয়েছে। সব লাশের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা।
একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু : একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাদের স্বজন আমিনুল ইসলাম জানান, পরিবারের ৯ জন কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। তাদের নিতে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে এসে ছয়জনের মৃত্যুর খবর পান তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এক পরিবারের ছয়জন মারা গেছে। তারা আমার ভাগনে-ভাগনি। আমি তিন বোনের একমাত্র ভাই। আমার তিন বোনের পাঁচ ছেলে-মেয়ে মারা গেছে। বড় এক ভাগনির সন্তানও মারা গেছে। ৯ জন বেড়াতে এসেছিল। তাদের মধ্যে তিনজন বেঁচে আছে। ছয়জন মারা গেছে।
রিসোর্টের দ্বিতীয়তলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন মো. আশিকুল ইসলাম। তবে তার স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) মারা গেছেন। অন্য আরেকজন পর্যটক গণমাধ্যমকে জানান, তারা একসঙ্গে ৯ জন বেড়াতে এসেছিলেন কক্সবাজারে। তাদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন।
নিহত ১০ জনের আটজন জবি শিক্ষার্থীর স্বজন : ইনানীতে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে আটজনই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবদুল আহাদ সরকারের স্বজন বলে জানা গেছে। আহাদ জানান, তার পরিবারের ছয়জন এ ঘটনায় মারা গেছেন। বাকি দুজনও তাদের আত্মীয়। আহাদ জানান, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তার চার নারী কাজিন, এক পুরুষ কাজিন এবং এক কাজিনের পাঁচ বছর বয়সি সন্তান ফাইয়াজ আহমেদ। এছাড়া নাফিজ তেহামি ও লায়লা জাহান নাবিলাও তাদের আত্মীয়। তারা আহাদের মায়ের ফুপাতো বোনের পরিবারের সদস্য।
আহত ছয়জনকে ঢাকায় প্রেরণ : অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তাগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় পাঁচ শতাংশ পুড়ে গেছে। অন্য একজন পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আহত ব্যক্তিরা হলেন-মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শিহাব উদ্দিন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। উন্নত চিকিৎসার জন্য আহতদের ঢাকায় পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, তাদের ঢাকায় যাওয়ার বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করা হয়েছে।
ছাড়পত্র ছাড়াই চলছিল রিসোর্ট : অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতান আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় এবং ১১ জুন নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রিসোর্টটিতে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার পরও কীভাবে সেখানে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ও ব্যবসা চলছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা প্রশাসক মো. এ মান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত ছাড়া আগুনের কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, রিসোর্টটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না। অনুমোদন ছাড়া কীভাবে এটি গড়ে উঠেছে এবং ব্যবসা পরিচালনা করেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করা হবে।
মালিকপক্ষের খোঁজ নেই, ব্যবস্থাপক গ্রেফতার : অগ্নিকাণ্ডের পর টুপটুপ রিসোর্টের মালিক নিয়াজ মোর্শেদ ও অন্যতম মালিক তানভীরের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া সম্ভব হয়নি এবং কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। এদিকে এ ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের আগে সুমন দাবি করেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। তবে প্রকৃত কারণ তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ-সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। তিনি বলেন, এত পর্যটকের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা গাফিলতি পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র না থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও রিসোর্ট চালু রাখা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না-এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায়। তদন্তে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
