Logo
Logo
×

Advertisement

সরকারের ৬ মাস

চ্যালেঞ্জের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

জনমনে উৎকণ্ঠা কাটলেও ফেরেনি স্বস্তি

Advertisement

Icon

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জনমনে উৎকণ্ঠা কাটলেও ফেরেনি স্বস্তি

Advertisement

বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের দুই বছর, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসের মেয়াদ শেষে গত ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার। তাদের সামনে শুরুতেই বড় পরীক্ষা ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি করা। এর মধ্যে জনগণের মনে আস্থা ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই ছিল চ্যালেঞ্জ। দায়িত্ব গ্রহণের পর ছয় মাস পার হলেও জননিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মিশ্র চিত্র। জনমনে আতঙ্ক না থাকলেও পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। শুধু তাই নয়; থানা, ফাঁড়ি বা রাস্তার চেকপোস্টে লাঞ্ছিত হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। এছাড়া বিগত সময়ের মতো বিচারহীনতার সংস্কৃতিও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে সন্দেহভাজন হিসাবে পিটিয়ে হত্যার প্রবণতা সরকারের অন্যতম মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের থানাগুলোতে ৯৯ হাজার ৯৯২ মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। দাঙ্গার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৩টি। হত্যার ঘটনায় এক হাজার ৭৯১ ও দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে ৪০৮টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়। এছাড়া ২৬৫টি ডাকাতি, ৯০৪ ছিনতাই, ৫১২ অপহরণ, চার হাজার ৮০৮ চুরি, এক হাজার ৫৯১ সিঁধেল চুরি এবং অন্যান্য ঘটনায় ৪১ হাজার ৯২৫টি মামলা হয়েছে।

সূত্র জানায়, সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলেও পুলিশ বাহিনীতে অভ্যন্তরীণ ভয়, অস্থিতিশীলতা ও কাজের স্থবিরতা তো কাটেনি। বরং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং অপরাধ দমনে গতিহীনতায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতাবোধ বিরাজ করছে। পুলিশের মূল কাজ যেখানে জননিরাপত্তা বিধান করা, সেখানে মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসই এখন বড় সংকটে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের মব ভায়োলেন্স (গণপিটুনি), রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার রেশ নতুন সরকারের আমলেও রয়ে গেছে। গত ছয় মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ এবং গ্যাং কালচারের জেরে বেশকিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে সামনে এসেছে। এর মধ্যে মে মাসে ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সি শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা সত্ত্বেও ঢাকা মহানগরীসহ বড় শহরগুলোতে ছিনতাই এবং চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। এ সময়ে অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জ ডিআইজি পদগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসবি (স্পেশাল ব্রাঞ্চ), সিআইডি এবং ডিবিতে রদবদল করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক করতে ভালো কাজের জন্য প্রণোদনা এবং পেশাগত গাফিলতির জন্য তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতৎপরতা রোধে সাইবার নিরাপত্তা আইন সংস্কার এবং ডিজিটাল মনিটরিং জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের ছয় মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এছাড়া ঝিনাইদহের কালীগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সংঘাতের জেরে একাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ছিল ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরাধ দমনে যাওয়া পুলিশের ওপর হামলা বা বাধার সম্মুখীন হওয়ার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে জনরোষ বা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের অতর্কিত হামলায় পুলিশ সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনায়ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুর ও চ্যালেঞ্জিং দিক ফুটে উঠেছে।

পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র জানায়, খুলনায় র‌্যাবের গাড়ি ভাঙচুর বা চট্টগ্রামে পুলিশের ওপর হামলায় বাহিনীতে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা সাধারণ টহল দিতে বা আসামি ধরতে ঝুঁকি নিতে ইতস্তত করছেন। ওই সূত্র জানায়, পুলিশের প্রতি জনগণের ইতিবাচক মনোভাব এখনো তৈরি হয়নি। এ কারণে দেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতা অব্যাহত রয়েছে। এতে গণপিটুনিতে প্রাণহানি বেড়েছে।

বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠনে বড় কোনো উদ্যোগ দেখা না গেলেও এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ ছিল সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা প্রয়োগ করে কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া এবং বিগত সরকারের সময় বিতর্কিত ভূমিকা পালনের অভিযোগে পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। গত ৯ মার্চ ৫ অতিরিক্ত; ৩ মে ১৬ ডিআইজি ও এক অতিরিক্ত ডিআইজি; ২২ এপ্রিল ১১ ডিআইজি ও ২ অতিরিক্ত ডিআইজি; ৫ জুলাই ১৪ ডিআইজি, ১৮ অতিরিক্ত ডিআইজি ও ১ এসপি এবং ২৩ জুলাই ৩ ডিআইজি, ১২ অতিরিক্ত ডিআইজি ও দুই এসপিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আরও বেশকিছু উচ্চপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতির জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে-জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা না করে অপরাধীদের সরাসরি আইনের আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে গত ১ মে থেকে মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশ, র‌্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা শুরু করা হয়। অপরাধপ্রবণ এলাকা, বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলা নগর, আদাবর, তেজগাঁও ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় বিশেষ ব্লক রেইড দিয়ে অপরাধীদের আটক করা হচ্ছে। কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড়ি অস্ত্রধারী চক্র ও মাদক সিন্ডিকেটের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। শিশু রামিসা হত্যাসহ সাভার, কুমিল্লা, বগুড়া ও ঢাকায় বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামিদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ বাহিনীতে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আধুনিক প্রযুক্তি, ডগ স্কোয়াড ও প্রশিক্ষণে সজ্জিত করার কাজ চলছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) ও সাবেক আইজিপি খোদা বকস চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের ত্যাগের পর দেশে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত হয়েছে। এ কারণে সরকারের ওপর জনগণের প্রত্যাশা বহুগুণ বেড়েছে, যা সামাল দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মামলা বা চার্জশিটের সংখ্যার দিকে নজর না দিয়ে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিচারব্যবস্থা যথাযথ ও ত্বরান্বিত হলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে এবং পরিস্থিতি শান্ত হবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শপথ নেওয়ার ছয় মাস কোথায় দাঁড়িয়ে সরকার

কোথায় দাঁড়িয়ে সরকার

কণ্টকাকীর্ণ পথে আশার আলো

কণ্টকাকীর্ণ পথে আশার আলো

১৭ বছরের ‘জঞ্জাল’ পাড়ি দিতে হিমশিম বিএনপি

১৭ বছরের ‘জঞ্জাল’ পাড়ি দিতে হিমশিম বিএনপি

তেল গ্যাস বিদ্যুতে তিক্ততা

তেল গ্যাস বিদ্যুতে তিক্ততা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম